1. editor@islaminews.com : editorpost :
  2. jashimsarkar@gmail.com : jassemadmin :

অধিক লাভজনক ক্লাউড কিচেন ব্যবসা শুরু করবেন যেভাবে!

ভারতের জোম্যাটো, স্যুইগির মতো বাংলাদেশেও ফুডপান্ডা, হাংরি নাকি, উবার ইটস, পাঠাও, সহজের মতো অ্যাপের কল্যাণে এখন ঘরে বা অফিসে বসেই প্রিয় রেস্টুরেন্টের প্রিয় খাবার আনা যায়। বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খাওয়ার এই নতুন প্রবণতার যুগে একই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার ধরনও।

অনেক রেস্টুরেন্ট আছে যেগুলোর আছে শুধু রান্নাঘর আর স্টোররুম। স্টাফ বলতে শুধু রাঁধুনী ও তার সহযোগী। বসে খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। কারণ এসব রেস্টুরেন্টের অর্ডার আসে অনলাইনে। গ্রাহককে খাবার পৌঁছে দেয় ফুডপান্ডা বা উবার ইটসের মতো ফুড অ্যাগ্রিগেটররা। এর ফলে এখন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা হয়ে গেছে অনেকটাই সহজ ও ঝামেলামুক্ত।

এতে প্রাথমিক পুঁজিও লাগছে অনেক কম। মূলত এ ধরনের রেস্টুরেন্টেরেই পোশাকি নাম ‘ক্লাউড কিচেন’। ভারতে এ ব্যবসা খুব প্রসার পাচ্ছে। যারা এরকম রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করার কথা ভাবছেন তাদের জন্য নিচে কিছু ধারণা দেয়া হলো-

ক্লাউড কিচেন নিয়ে আরো কথা: সরল করে বলতে গেলে, ক্লাউড কিচেন হলো এমন একটা রেস্টুরেন্ট ব্যবসা মডেল যে রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়ার জায়গা নেই। হতে পারে ভাড়া ফ্ল্যাটেই একটি ঘরে রান্নাঘর। ক্রেতা আছেন ধারেকাছেই। বাসা বা অফিস থেকে অনলাইনে তিনি অর্ডার করবেন। রান্নাঘর থেকে সেই খাবার পৌঁছে যাবে সোজা তার দুয়ারে। এ ধরনের রেস্টুরেন্টের নিজস্ব ডেলিভারি ব্যবস্থা থাকতে পারে, আবার ফুডপান্ডার মতো ফুড অ্যাগ্রিগেটরও সে দায়িত্বটা নিতে পারে।

কেন ক্লাউড কিচেন: যে কোনো ব্যবসাতে প্রধান বাধা পুঁজি। বড় অংকের পুঁজি লাগলে ঝুঁকি নেয়ার সাহস করেন খুব কম মানুষই। কিন্তু ক্লাউড কিচেন মডেলে খুব কম টাকায় ব্যবসা শুরু করা যায়। নিজে ভালো রান্না জানলে কাজটা আরো সহজ হয়। আপনার দরকার শুধু রান্নাঘরের জন্য জায়গা খোঁজা ও ভাড়া নেয়া। বসবাসের ফ্ল্যাটেও করা যায়, তবে সেক্ষেত্রে লাইসেন্স পাওয়া কঠিন হবে।

ক্লাউড কিচেনে আরো সুবিধা হলো, সম্পূর্ণ রেস্টুরেন্ট সাজানো এবং রক্ষণাবেক্ষণে প্রচুর খরচ হয়, এ খরচের পুরোটাই বেঁচে যাবে। তাছাড়া খাবার পরিবেশনের ঝামেলা নেই, সুতরাং কর্মী সংখ্যা অনেক কম হবে, ফলে বেতন-ভাতা মাসে মোটা অংকে ব্যয় থেকে বেঁচে যাবেন।

ক্লাউড কিচেন খোলা আগে যেসব বিবেচনা করতে হবে: আর দশটা ব্যবসার মতো এ ব্যবসায় নামার আগেও পুরো পরিকল্পনা করে নিতে হবে। ব্যবসায় পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলে ছোট আকারে শুরু করাই ভালো। ব্যবসা শুরু করার পদক্ষেপগুলো হতে পারে:

১. কী ধরনের খাবার বেচবেন: আগে ঠিক করুন, কোন ধরনের খাবার বেচতে চান। এ নিয়ে বাজার জরিপ করেও দেখতে পারেন। বিশেষ করে বিভিন্ন করপোরেট অফিস, কমিউনিটিতে কোন ধরনের খাবার বেশি অর্ডার করা হয় খোঁ নিয়ে দেখুন। এরপর সিদ্ধান্ত নিন শুধু ফাস্টফুড, নাকি চাইনিজ, থাই, ইতালিয়ান অথবা ভারতীয়, বা দুপুরের খাবার হিসেবে ভাত, বিরিয়ানি, ঠিক কোন ধরনের খাবার আপনার রেস্টুরেন্টে বিক্রি হবে।

শুরুতেই একাধিক মেন্যু না করে একটি বা দুটি খাবার বেছে নিন। সেটি হতে পারে ভাত বা মিক্সড সালাদ। প্রাথমিক মেন্যু ঠিক করুন। পরে গ্রাহকদের চাহিদা বুঝে মেন্যুতে নতুন খাবার যোগ করতে পারেন। আপনি কোন এলাকায় খাবার ব্যবসা করতে চান সেটির ওপর মেন্যু এবং দাম নির্ভর করবে। এটি অফিস পাড়া নাকি আবাসিক এলাকা সেটি বিবেচনায় নিয়ে মেন্যু ও দাম ঠিক করুন।

২. রান্নাঘর ভাড়া: রান্নাঘর ভাড়া করতে হবে আপনার টার্গেট এরিয়ার কাছাকাছি। যাতে সহজে ও দ্রুত সরবরাহ করা যায়। তাছাড়া জায়গাটি যেন পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর হয় সেটিকে খুব গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ খাবারের মানই আপনার একমাত্র পরিচয়। আর পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিলে খাবার ব্যবসা কখনোই দাঁড়াবে না। অল্প খরচে ভালো জায়গা নির্বাচন করুন।

৩. রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স: রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করতে হলে কয়েকটি লাইসেন্স করতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, স্যানিটারি লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, কৃষি উপকরণ সনদ, বিএসটিআই সনদ, প্রেমিসেস লাইসেন্স, কারখানা সনদ, ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন এবং রেস্তোরাঁ পরিচালনার লাইসেন্স নিতে হয়। অনেক দেশেই বিভিন্ন এজেন্সি দায়িত্ব নিয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় লাইসেন্স করিয়ে দেয়। বাংলাদেশে অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এমন কিছু নেই। তবে দালাল আছে!

৪. অনলাইন অর্ডার নেয়ার ব্যবস্থা: খাবারে অর্ডার নেয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু পুরোপুরি ইন্টারনেটে ওপর নির্ভর করতে হবে সেহেতু অর্ডার নেয়ার প্লাটফর্ম তৈরি এ ব্যবসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। ফুডপান্ডার মতো ফুড ডেলিভারি অ্যাপগুলো অর্ডার প্রতি কিছু কমিশন নেয়। তাছাড়া নথিভুক্তির সময়ও এককালীন টাকা নেয় তারা। তবে এর পাশাপাশি নিজের ওয়েবসাইট এবং অ্যাপও থাকতে পারে।

যেখানে গ্রাহক সরাসরি অর্ডার করবেন। আবার ফুড অ্যাগ্রিগেটররাও অর্ডার করতে পারে। সেই সঙ্গে অনলাইন অর্থ পরিশোধের জন্য ভালো মানের পয়েন্ট অব সেল সিস্টেম (পিওএস) থাকা জরুরি। তবে নিজেই অর্ডার নেয়া ও সরবরাহের দায়িত্ব নিলেখরচ ও ঝামেলা দুটোই বাড়বে। তাই প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র ফুড ডেলিভারি কোম্পানির ওপর নির্ভর করাই ভালো।

৫. রান্নাঘর ও প্যাকেজিং সরঞ্জাম: একটি রেস্টুরেন্টের রান্নাঘরে কী কী লাগে সেটি সম্পর্কে নিজের স্পষ্ট ধারণা না থাকলে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নিন। খুব ভেবেচিন্তের রান্নাঘরের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় সরঞ্জাম কিনুন। চিমনি, ফ্রিজার এবং উনুন এগুলোতে বেশি বিনিয়োগ করুন। কারণ এসব দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে হবে।

কাঁচামাল কোন বাজার থেকে কিনলে সুবিধা হবে সে বিষয়ে খোঁজ নিন। পাইকারী বাজার থেকে কেনার চেষ্টা করুন তাতে সাশ্রয় হবে। নিয়মিত এক দোকান থেকে নিলেও ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। এতে প্রয়োজনের সময় পণ্যের ডেলিভারি দ্রুত পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে, পাশাপাশি মানও ভালো পেতে পারেন। তাছাড়া ভালো সম্পর্ক ও নিয়মিত খদ্দের হিসেবে দোকানদার দামে কিছুটা ছাড়ও দিতে পারেন।

এই ধরনের রেস্টুরেন্টের ব্যবসায় প্যাকেজিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ খাবার দূরে সরবরাহ করতে হয়। অনেক সময় অফিসে বা অন্য কোনও জায়গা থেকে যারা খাবার অর্ডার করেন সেখানে প্লেট চামচ ইত্যাদি নাও থাকতে পারে। তাদের কথা মাথায় রেখে বিশেষ প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা করলে ভালো। তাছাড়া এমনভাবে প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে খাবার সহজে নষ্ট না হয় ও গরম থাকে।আর প্যাকেজিংয়ে ব্যতিক্রমী স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আনতে পারলে বা খানিকটা অভিনবত্ব থাকলে সহজে ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।

৬. রাঁধুনী ও অন্যান্য কর্মী নিয়োগ: দক্ষ ও বিশ্বস্ত রাঁধুনী ছাড়া রেস্টুরেন্ট ব্যবসা লোকসান নিশ্চিত। রাঁধুনীর ওপরই নির্ভর করবে রেস্টুরেন্টের ব্রান্ডিং। অন্তত দুজন শেফ, দুজন সহযোগী ও একজন পরিচ্ছন্নকর্মী নিয়োগ দেয়া গেলে ভালোভাবে রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করতে পারবেন। একটি হটলাইন রাখতে হবে। আর ফোনকল রিসিভ করার জন্য সার্বক্ষণিক কাউকে থাকতেই হবে। সেটি লোক রেখেও করতে পারেন, আবার এ কাজটি নিজেও করা যেতে পারে। নিয়মিত আয় ব্যয়ের হিসাবের খাতাটিও নিজের হাতে রাখাই ভালো।

৭. পরিচ্ছন্নতা: খাবার প্রস্তুত ও প্যাকেজিংয়ে স্বাস্থ্যবিধি (হাইজিন) মেনে চলা অপরিহার্য। কর্মীদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নিজে উপস্থিত থেকে এটি নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া রান্নাঘরের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে রান্নাঘরের কর্মীদের পোশাক নির্দিষ্ট করে দেয়া যেতে পারে। আপনার রেস্টুরেন্টের খাবার খেয়ে কেউ অসুস্থ হলে ব্যবসা লাটে উঠবে।

৮. অর্ডারের হিসাব রাখা: বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে যখন ক্রমাগত অর্ডার আসতে থাকবে তখন সূক্ষ্ণ ও সতর্কতার সঙ্গে হিসাব রাখা জরুরি। প্রতিটি অর্ডার সময়মতো ডেলিভারি দেয়া নিশ্চিত করতে হবে। একজনের অর্ডার যেন কোনোভাবেই আরেকজনের কাছে না যায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

কোনো কারণে ভুল হয়ে গেলে অবশ্যই দ্বিধাহীনভাবে দুঃখ প্রকাশ করে গ্রাহককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এটি আন্তরিকতার পরিচয়, যা আপনার রেস্টুরেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। বেশি অর্ডার সামলানোর জন্য বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন। তবে শুরুর দিকে অতো চাপ থাকবে না। তখন খাতায় লিখেই চালিয়ে নিতে পারবেন।

৯. মার্কেটিং ও প্রচারণা: রেস্টুরেন্ট ব্যবসার মূলমন্ত্র মানসম্পন্ন মজাদার খাবার। মানুষ পছন্দ করলে মুখে মুখে অনেকখানি প্রচার হয়ে যায়। একজন খেয়ে ভালো লাগলে তার পরিচিতকে বলে। এভাবে স্বয়ংক্রিয় মার্কেটিং হয়। তবে ব্যবসা যেহেতু অনলাইনে সেহেতু ভার্চুয়াল প্লাটফর্মেও প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য একটি ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে।

আপনি চাইলে ইউটিউবে একটি চ্যানেল খুলেও প্রচারণা চালাতে পারেন। পাশাপাশি সেখান থেকেও আয় করার সুযোগ আছে। খাবার মেন্যু দিয়ে ফেসবুকে বুস্ট করুন। দ্রুত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে। ওয়েবসাইটে বিভিন্ন খাবারের ছবি ও রেসিপি তুলে ধরতে পারেন। রেস্টুরেন্টের রিভিউ এবং খাবারের ছবি শেয়ার করার জন্য ক্রেতাকে উৎসাহ তিন। মাঝে মধ্যে বিশেষ উপলক্ষ্যে বা কোনো উপলক্ষ্য ছাড়াও ছাড়ের ব্যবস্থা রাখতে পারেন। রিভিউ ও শেয়ারের জন্য এ ধরনের ছাড়ের অফার থাকতে পারে।

যতো বেশি সংখ্যক ফুড ডেলিভারি অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন ততো ভালো। এতে অনলাইনের আপনার উপস্থিতি বাড়বে। ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে গুগল ম্যাপে আপনার অবস্থান দেখিয়ে দিন। গ্রাহক যতো সহজে আপনার রেস্টুরেন্ট অনলাইনে খুঁজে পাবে ততো বেশি অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা।

More News Of This Category