1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

অলস জীবনকে ‘না’ বলুন।

‘অনেক ক্লান্ত, আলসেমি লাগছে। আজকে বের হবো না রে’। বন্ধুরা ঘুরতে যেতে বললে কী এই কথা আপনার মুখ থেকে আপনাতেই বের হয়ে আসে? অথবা বন্ধুর ট্রিটের মতো লোভনীয় অফারও ফিরিয়ে দেন এই একই যুক্তিতে? নাকি সারারাত ঘুমানোর পরেও মনে হয় যে আবার ঘুমানো দরকার, ক্লান্ত লাগছে? সেই ক্ষেত্রে সময় হয়েছে শুধু বিশ্রামের উপর ভরসা না করে সচেতন হওয়ার। অলস জীবনকে ‘না’ বলুন।

আমাদের শরীরে অবসাদ বা ক্লান্তির প্রকাশ ঘটে বিভিন্নভাবে। যেমনঃ মনোযোগের অভাব, রগচটা ভাব, নিরাশা, স্মৃতিভ্রম, কর্মক্ষমতা হ্রাস, ধীর প্রতিক্রিয়াকাল ইত্যাদি। আবার অনেক সময়ই ক্লান্তি থেকে সূচনা ঘটে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার। হতে পারে স্থুলতা, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্ণতা, ডায়াবেটিস এমনকি ঘটতে পারে বিভিন্ন দূর্ঘটনা।

ক্লান্তি দূর করতে আমরা চা, কফি, চিনি, এনার্জি ড্রিংক, ভিটামিন ও আরো অনেক কিছুই খেয়ে থাকি। কিন্তু দেখা যায় এতোকিছু করেও হয়তো কোনো লাভ হয় না। হয়ত পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও ঘুম থেকে উঠামাত্রই শরীরে জেঁকে বসে ক্লান্তি। ধারাবাহিক এসব সমস্যায় বার বার চা-কফি না, আমাদের দরকার ক্লান্তির কারণ জানা। শুধু যে শারীরিক পরিশ্রমেই আমরা ক্লান্ত হই, তা কিন্তু না, মানসিক কারণও হতে পারে আমাদের অবসাদের কারণ। আসুন জেনে নেই ক্লান্তি বা অবসাদের কিছু সম্ভাব্য কারণ থেকে মুক্তির উপায়।

আপনি মানসিক ও আত্মিক দিক দিয়ে ঠিক নেই: হয়তো আপনি অসুখী, অসন্তুষ্ট, চিন্তিত কিংবা জীবন নিয়ে উদাসীন। অথবা হতে পারে আপনি এমন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পরেছেন যা আপনি চাননি, বা এমন কোনো চাকরি করছেন যা আপনার মোটেই ভালো লাগছে না কিংবা এমন কোনো পরিস্থিতিতে আছেন, যা আপনার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে।

তাহলে, এখনই সময় অসন্তোষের পাহাড় বড় না করে একটু সময় নেয়া। শান্ত হয়ে একটু ভাবা। ভাবুন এমন এক সময়ের কথা যখন সবকিছু ঠিক ছিলো, আপনি খুশি ছিলেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎফুল্ল ছিলেন। তখন কী আপনার এমন ক্লান্ত লাগতো? ঠিক একইভাবে এমন এক সময়ের কথা ভাবুন, যখন আপনি এমন কোনো সম্পর্ক বা চাকরিতে ছিলেন যা আপনার সমস্ত এনার্জি শুঁষে নিচ্ছিলো, মনে করে দেখুন সেই সময় আপনি যতই বিশ্রাম নিয়ে থাকেন না কেন, আপনার ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হতো, সারাদিন ক্লান্তবোধ হতো।

আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন কিছু আছে যা করতে আমরা উৎফুল্ল বোধ করি আবার এমন কাজও আছে যার নাম শোনামাত্র অবসাদ চেপে বসে, এটা স্বাভাবিক। হয়তো, আপনি দ্রুত আগাতে পছন্দ করেন কিন্তু বাস্তবে আপনাকে সকল খুঁটিনাটি বিষয়ে খবর রাখতে হচ্ছে, কিংবা হয়তো আপনি বৈচিত্র্য পছন্দ করেন কিন্তু আপনার জীবন ৯টা-৫টার জীবনে বাঁধা।

স্কুলে যাওয়া বাচ্চাদের দেখলেই বিষয়টা বুঝা যায়। স্কুলের দিন বাচ্চাদের আলসেমি আর ছুটির দিনে চঞ্চলতার কী আকাশ-পাতাল পার্থক্য, নিশ্চয়ই দেখেছেন! খুঁজে বের করুন আপনার ক্লান্তির মূল কারণ। করতে শুরু করুন যা আপনি পছন্দ করেন, যা আপনাকে আনন্দ দেয়। মানসিক ও আত্মিক শান্তিই এনে দিবে আপনার জীবনে ভারসাম্য, মুক্ত করবে অবসাদ থেকে।

আপনি শারীরিকভাবে চাপে আছেন: অনেকক্ষেত্রেই আমরা অনেক কিছু করে থাকি, যা আমাদের শরীরের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। যেমন হয়তো, আমাদের আর্থিক প্রয়োজন তাই আমরা অফিসে ওভারটাইমে জয়েন করলাম কিন্তু এটা যে আসলে আমাদের শরীরের সাধ্যের বাইরে সেই বিষয়টা সম্পূর্ন অবহেলা করলাম। ফলশ্রুতিতে দুই-একদিন শরীর মেনে নিলেও ধীরে ধীরে সে বিদ্রোহ করে বসলো। দেখা যায় যে, তখন ওভার টাইম ছেড়ে দিলেও শিডিউল কাজেই শরীরে অবসাদ চলে আসে।

নিজের শরীরের যত্ন নেয়া অত্যন্ত জরুরী। কারণ, বাদ্য আমরা যতই ভালো বাজাই না কেন, বাদ্যে যদি ত্রুটি থাকে সুর তো বেসুরো হবেই! এসব ক্ষেত্রে ছোট কোনো ছুটি নিয়ে পরিবারের সাথে হালকা ঘুরে আসলে বা সময় কাটালে ভালো লাগে। এছাড়াও বডি ম্যাসাজ, হিজামা, ইয়োগা, কোয়ান্টাম এসবও ভালো উপকার দেয় ক্লান্তি দূর করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে।

আপনি যথেস্ট পরিমাণে বা সঠিকভাবে খাচ্ছেন না: আমরা কতটুকু কী খাবার খাচ্ছি তার উপর আমাদের এনার্জি নির্ভর করে। নিউট্রিশনিস্টদের মতে, বেশীরভাগ মানুষ মনে করে মিষ্টি, চিনি জাতীর খাবার, চিপস, চকলেট এসব আমাদের এনার্জি বাড়ায়। কিন্তু মূলত এসব খাবারই আপনাকে দুপুরের ভাতঘুম এর প্রধান কারণ। এনার্জি কমানো এবং অলসতার পেছনে দায়ী এসব খাবার।

শুধু কী খাচ্ছি সেটা না, কি পরিমাণ খাচ্ছি এই ব্যাপারটাও খেয়াল রাখা দরকার। কোনো বেলার খাবারেই অবহেলা করা যাবে না। সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলো তাই সকালে না খেয়ে দুপুরে বেশি করে খেয়ে নিলাম, এটা কোন বুদ্ধিমানের কথা নয়। খেতে হবে প্রতি বেলাতেই এবং আমিষ, শর্করা, ভিটামিন সব মিলিয়েই খেতে হবে। বাসার ভাত-তরকারি থেকে পাস্তা, পিজ্জা অনেক আকর্ষণীয় হলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ফাস্ট ফুড বা রাস্তার পাশের খাবারের উপর নির্ভরতা শুধু অবসাদ নয়, ডেকে আনবে অনেক রোগও।

আপনার ঘুমে ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে: হয়তো আপনি ভাবছেন আপনি ঘুমাচ্ছেন, কিন্তু আসলেই কি তাই? ঘুমটা কি আসলেই পরিপূর্ণ হচ্ছে? ঘুমটা কি আসলে নিশ্চিন্তে হচ্ছে? আপনি বুঝতে না পারলেও বারবার ঘুম ভাঙা, ঘুমানোর আগে মোবাইল-ল্যাপটপ বা কোন ইলেকট্রনিক্সের ব্যবহার, শক্ত বিছানা কিংবা বালিশ, আলোকিত রুম এসব ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। আর তাই পরিপূর্ণ ঘুমে যে এনার্জি শরীরে জমা হয়ার কথা তা হয় না, ফলে সমস্ত দিন যায় অবসাদগ্রস্থ।

তাই আমাদের উচিত ঘুমানোর অন্তত একঘন্টা আগে ইলেকট্রনিক্সের কাজ শেষ করা, পছন্দ অনুযায়ী বালিশ বা বিছানা ব্যবহার করা, রুমে কম আলোর ব্যবস্থা করা। এসব পদক্ষেপ আমাদের বিরামহীন ঘুম নিশ্চিত করবে এবং পাশাপাশি পরবর্তীতে একটি ক্লান্তিহীন দিনের সূচনা করবে।

কোন কারণে আপনি চিন্তিত কিংবা ডিপ্রেশনে আছেন: মাত্রাতিরিক্ত চিন্তা আমাদের দেহে করটিসোল হরমোন রিলিজ করে যা আমাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। এছাড়াও অতিরিক্ত চিন্তা আমাদের এনার্জি খরচ করে। ঠিক যেমন, মোবাইলের কোনো অ্যাপ যদি সারাক্ষণই ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে তাহলে যেমন অধিক ব্যাটারি খরচ করে তেমনি মাথায় চিন্তার ভূত থাকলে ঘুম ঠিক মতো হয় না, খাবার খাওয়ার ইচ্ছা মরে যায়, কিংবা খেলেও তা ঠিকভাবে শরীরের প্রয়োজনে কাজে লাগে না।

ঠিক তেমনি, হতাশা বা ডিপ্রেশন থেকে সৃষ্টি হয় উদ্বেগ যা থেকে পরবর্তীতে ইনসমনিয়া, মাথা ব্যথা, ক্লান্তিভাবের সূচনা হয়। আর প্রতিটা কাজেই এর প্রভাব পরে। ধরুন, আমরা ১০০ ইউনিট এনার্জি নিয়ে দিন শুরু করলাম। এর মধ্যে ৫০ ইউনিট যদি চিন্তাতেই কিংবা ডিপ্রেশনেই ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে স্বভাবতই আমরা সময়ের আগে ক্লান্ত হব। চিন্তা কমাতে মেডিটেশন ও ইয়োগা খুব কার্যকরী ফল দেয়। আর কম চিন্তা মানে কম ক্লান্তি এবং কম ক্লান্তি মানে তরতাজা জীবন।

আপনি পরিমিত ব্যায়াম করছেন না: আমরা অনেকেই মনে করি ব্যালেন্সড ডায়েট মেনে চললে ব্যায়ামের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। শারীরিক চর্চা সুস্থতার একটি আবশ্যিক বিষয় । ইউনিভার্সিটি অফ জরজিয়ার এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ধারাবাহিক অবসাদগ্রস্থ ব্যক্তিরা সপ্তাহে মাত্র তিনদিন বিশ মিনিট করে ব্যায়াম করে মাত্র ছয় সপ্তাহে অবসাদ বা ক্লান্তি থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। জানি যে, ক্লান্তিতে ব্যায়াম বা শারীরিক চর্চা শব্দটাই এক বিভীষিকাময় নাম।

কিন্তু শারীরিক চর্চা আমাদের হৃদপিন্ড ও ফুসফুসে কার্যক্ষমতা বাড়ায়, শরীরে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে অক্সিজেন নিশ্চিত কর যা আমাদের দেহে পুষ্টির যোগান দেয়, শক্তি বাড়ায় ও ক্লান্তি কমায়। তাই পরেরবার, সময় থাকলে রিকশায় না উঠে হেটে যান, লিফটের বদলে সিড়ি ব্যবহার করুন এবং সম্ভব হলে সকাল বা বিকালে নিয়মিত কিছু সময় নিজের শরীরের পিছনে খরচ করুন।

আপনি পানিশূণ্যতায় ভুগছেন: মানবদেহের ৫০-৬০ ভাগই পানি। এমনকি শরীরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেমন মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস গঠিত হয় ৭০% পানি দিয়ে। অর্থ্যাৎ, নূন্যতম পানিশূন্যতাও তৈরী করবে অনেকখানি এনার্জির ঘাটতি। দেখা গেছে যে, ২% পানির ঘাটতিতেই আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে। সাধারণত আমাদের দেহে যে পানির অভাব হচ্ছে তা বুঝতেই আমাদের অনেক সময় লেগে যায়। কেননা, তপ্ত রোদে আমাদের যে পানি পিপাসা পায়, এসি রুমে বসে থাকলে তা আমাদের পায় না, কিন্তু তাই বলে কি এসি রুমে শরীরে পানির প্রয়োজন কম?

গ্রেট ব্রিটেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতি পাঁচ জনে একজনের ক্লান্তি ও অবসাদের কারণ সঠিক পরিমাণে পানি না খাওয়া, যার ফলশ্রুতি পানিশূণ্যতা। আর শুধু অবসাদই না, পানিশূন্যতায় হতে পারে নানা রোগ। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির উচিত দিনে অন্তত ২ লিটার পানি পান করা। আর তাই, আগামীকাল সকালের চা এর আগে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিন ও ঘুমানোর আগে এক গ্লাস পানি খেয়ে ঘুমান।

শারীরিক সমস্যাও হতে পারে আপনার ক্লান্তির কারণ: আপনি যদি উপরের কোনো কারণের সাথেই নিজের কারণ মিলাতে না পারেন, তাহলে হয়তো সময় হয়েছে একজন ডাক্তারের পরামর্শের। বিভিন্ন রোগ বা শারীরিক সমস্যা থেকে দেহে ক্লান্তি বা অবসাদের আধিক্য দেখা যেতে পারে।এনিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা দ্রুত ক্লান্তির অন্যতম কারণ, বিশেষ করে মহিলাদের।

রক্তের স্বল্পতা অর্থ্যাৎ আয়রণ স্বল্পতা আর আয়রণ দেহে শক্তি যোগাতে আবশ্যিক। এছাড়া থাইরয়েডের সমস্যায় যেমন, হাইপোথাইরয়েডে দেহে ক্লান্তি আসতে পারে। খাবারে ভিটামনের অভাব শিশু ও বাচ্চাদের অবসাদের অন্যতম প্রধান কারণ। মূত্রনালীর ইনফেকশনের পারিপার্শ্বিক প্রভাব হিসেবেও অনেক সময় অবসাদ লক্ষ্য করা যায়। ডায়াবেটিসে অতিরিক্ত সুগার আমাদের দেহে শোষিত না হয়ে রক্তে থেকে যায়, যা ক্লান্তি সৃষ্টি করে। আবার সুগার কমে যাওয়ার অর্থ দেহে যথেষ্ঠ পুষ্টির অভাব এবং এই কারণেও শরীরে অবসাদ জেঁকে বসে।

পরিশেষে বলব যে, ধারাবাহিক ক্লান্তি কখনোই অবহেলার বিষয় নয়। আজ নয় কাল ঠিক হয়ে যাবে ভেবে বসে থাকা ভুল সিদ্ধান্ত। কারণ, নিজে থেকেই ক্লান্তি দূর হলে তা ধারাবাহিক কখনোই হতো না। খাবারের পরিবর্তন, শারীরিক চর্চা করা নাকি মানসিক কোনো সিদ্ধান্ত? তা বের করতে হবে আপনাকেই। এখনই একটু সময় নিন। কিছু সময় খরচ করে বের করুন আপনার কী দরকার। আপনার এই কিছু সময় ব্যয়ে বেঁচে যাবে ভবিষ্যতের অঢেল সময়। তথ্যসূত্র: স্পাইক স্টোরি ডটকম।

More News Of This Category