আপনি কেমন অহংকারী নাকি বিনয়ী?

প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে, বেশি বড় হইও না, ঝড়ে ভেঙ্গে যাবে বেশি ছোট হইও না ছাগলে খেয়ে ফেলবে। কোন গাছকে উদ্দেশ করে বলা প্রবাদটি দিয়ে মূলত মানুষের সামাজিক অবস্থানকে বুঝানো হয়। সমাজে আর একটি কথারও প্রচলন আছে। অহঙ্কারী হইও না পতন হবে। আবার বেশি বিনয়ী হইও না, তাহলে কেউ দাম দেবে না। এই দুটো কথা কিন্তু একটার সঙ্গে অন্যটি সাংঘর্ষিক।

আমাদের চারপাশের যে মানুষগুলো বেশি অহঙ্কার করে তাদের আমরা যেমন পছন্দ করি না, তেমনি যারা আবার বেশি বিনয়ী তাদেরকেও হিসেবে ধরতে চাই না। তাই বলে কি একেবারেই অহংকার করা যাবে না। আবার বিনয়ী হওয়া যাবে না? এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে আমরা কোনটা হব, বা কোনটা হওয়া দরকার।

আপনার চারপাশের মানুষ, আপনার সমাজ আপনাকে কিভাবে দেখছে। তার থেকেও জরুরী বিষয় হলো আপনি মানুষের মাঝে নিজেকে কিভাবে উপস্থাপন করছেন, সে বিষয়ে পুরোপুরি অবগত আছেন কিনা।

উপরের আলোচনা থেকে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, কি বিষয় লিখতে চাচ্ছি। পুরো লেখাটি পড়ে জেনে নিন, সমাজ আপনার অহঙ্কার। বিনয়কে কিভাবে দেখছে। অথবা অহঙ্কার বিনয়কে কিভাবে সবার সামনে তুলে ধরতে হয়। প্রথমে বিনয়ী বা ভাল দিক নিয়ে বলছি। বিনয়ী হওয়া অবশ্যই ভাল দিক।

বিনয়ী মানুষকে সবাই পছন্দ করে। ভালবাসে, সমাজের মডেল মনে করে। এই কথাগুলো কিন্তু সত্য। তবে আরও একটি সত্য কথা হলো বিনয়ী লোকেরা অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হয়। মানুষজন তাদের বেশি গুরুত্ব দিতে চায় না। বেশি বিনয়ী লোকেরা নিজেদের নিজেরাই গুরুত্বহীন মনে করে থাকে। কারও সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়। সে কতটা বিনয়ী মানুষ।

একজন বিনয়ী লোককে যদি তার কাজের প্রশংসা করা হয়। তাহলে সে তা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করবে। কিন্তু বেশি বিনয়ী লোককে যখন তার কাজের প্রশংসা করবেন, তখন সে তার কৃতিত্ব অন্যদের দেয়ার চেষ্টা করবে। বলবে, আমি আর কি করলাম। সব তো এরাই করল (সহকারীরা)। বিনয়ী এবং অতি বেশি বিনয়ীর ক্ষেত্রে যা দেখা যায়।

বিনয়ী লোক তার কাজের প্রাপ্তটা বিনয়ের সঙ্গেই বুঝে নেয়। কিন্তু অতিবেশি বিনয়ী মানুষগুলো নিজের কৃতিত্বকে অস্বীকার করে, অন্যদের কৃতিত্ব দেয়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বেশি বিনয়ী লোকদেরই একটা সময় পস্তাতে হয়। তাই বেশি বিনয়ী দেখাতে গিয়ে নিজের আত্মসম্মানকে ছোট করবেন না। কারণ, আপনি নিজেকে নিজেই যদি সম্মান না করেন, অন্যেরা কেমনে করবে। অতঃপর, বিনয়ী হোন নিজের সম্মান বজায় রেখে।

এবার অহঙ্কারের বিষয়ে আসা যাক। অহঙ্কার নিয়ে কথা বলার আগে জেনে নিতে হবে, কোনটাকে অহঙ্কার বলে। কেউ যখন কোন কাজ করে বড় সাফল্য অর্জন করে কিংবা কেউ তার থেকে সাহায্য নিয়ে সফল হয়, তখন তার ভিতর এক ধরনের ভাললাগা অনুভূতি কাজ করে। নিজেকে অন্যদের থেকে একটু আলাদা মনে হয়।

এই ভাললাগার অনুভূতিই হলো অহঙ্কার। বিষয় হলো, এই অহঙ্কারের অনুভূতি থেকে কি হয়। অহঙ্কার কি ভাল, নাকি খুবই খারাপ। অহঙ্কার দুই রকমের হয়। একটি হলো কোন কাজের সাফল্য পাওয়ার পর ভিতরে ভাললাগা কাজ করে, নিজের ভিতর একটু অহঙ্কার কাজ করে। তবে এই অহঙ্কার সাময়িক থাকে।

এই অহঙ্কার কেউ প্রকাশও করে না। আর একটি হলো, কোন কাজে সফল হয়ে সবাইকে তা বলে বেড়ানো, নিজের থেকেই অহঙ্কার করে তা অন্যকে জানানো। সমাজে সমস্যার সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় অহঙ্কারীকে নিয়ে। কোন মানুষ যখন অনেক অহঙ্কারী হয়, তখন তার ভিতর কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। সে সব সময় সবার থেকে সম্মান আশা করে। কারও উপদেশ শোনে, শুধু শোনাতে চায়। সবাইকে ছোট করে দেখে, বেশি বেশি খবরদারি করে, অব সময় জোর গলায় কথা বলে ইত্যাদি।

এ ধরনের অহঙ্কারী ব্যক্তিকে আমরা সবসময়ই আশপাশে দেখতে পাই। মূলত এই ধরনের অহঙ্কার হলো এক ধরনের মানসিক রোগ। যে কারণে সে সত্যকে এড়িয়ে চলে, নিজের যোগ্যতার থেকে বেশি সম্মান আশা করে। কোন ভুল কাজ করলেও অহঙ্কারকে ঠিক রাখতে ভুল স্বীকার করে না। এমন অহঙ্কারীকে কেউ পছন্দ করে না।

তবে অহঙ্কারকে নিজের সাফল্যের উৎসাহ হিসেবে দেখতে পারেন। কাজে সফলতা অন্যকে জানাতেই পারেন। আপনার সাফল্য অন্যে জানলে, আপনার আরও উৎসাহ বাড়বে। মন্ট্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেনিয়েল স্লাইসারের মতে, ‘আপনি আপনার সাফল্য নিয়ে অহঙ্কার না করলে আমি তা জানব কিভাবে।’ অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লেডা বাসমেডিসের মতে, ‘অহঙ্কার হলো সমাজ গড়ার উপাদান। অহঙ্কারের কারণেই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা হয়েছে। একজন অন্যজনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা কাজ করেছে।

এখন কথা হলো, বিনয়ী হওয়া যাবে না। অহঙ্কারী, হওয়া যাবে না। তাহলে হবেন কোনটা। এ বিষয়ে ভাল পরামর্শ হলো মধ্যম পন্থা অবলম্বন করুন। আপনি বিনয়ী হোন, তবে নিজের আত্মসম্মান ঠিক রেখে। অহঙ্কারের বেলায়ও তাই, নিজের সাফল্যের কথা সবার কাছে তুলে ধরুন। তবে, তা যেন বাড়াবাড়ির পর্যায় না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।

নিজে সম্মান পেতে অন্যকেও সম্মান দিন। কারণ অন্যের সম্মান পেতে চাইলে অন্যকে সম্মান করাও আপনার দায়িত্ব। তাই, বিনয়ী, অহঙ্কার নিয়ে সংঘর্ষে না গিয়ে নিজেকে প্রয়োজনমতো সবার সামনে উপস্থাপন করুন, অন্যকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠুন। লেখক: এম শহীদুল ইসলাম। তথ্যসূত্র: জনকন্ঠ।

SHARE