1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

উদ্যোক্তা জীবনের শুরুর দিকে পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় সমস্যায় পড়েছিলাম!

প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে চলছে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন। এতে সব দিক দিয়ে মানুষ টেকনোলজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রযুক্তি ছাড়া কারো চলছেই না। নারী-পুরুষ অনেকেই ফেসবুককে কাজে লাগিয়ে জড়িয়ে পড়ছে অনলাইন ব্যবসায়। অনলাইন শপিংয়ে গেলেই নজরে পড়ে মেয়েদের বাহারি রকমের পণ্য। আজ আমরা তেমনি একজন উদ্যোক্তার গল্প জানবো, যিনি দেশীয় চামড়াশিল্প ব্যবহার করে মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদের পণ্য নিয়েও কাজ করছেন।

সোহাগ শান্ত, হালের নতুন উদ্যোক্তা। জন্ম ও বেড়ে ওঠা নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত বেগমগঞ্জ থানাধীন তালিবপুর গ্রামে। প্রাথমিক থেকে এসএসসি পর্যন্ত তার গ্রামেই কেটেছে। উচ্চমাধ্যমিক থেকে স্নাতক পযর্ন্ত চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজে পড়াশোনা করেছেন। সোহাগ বর্তমানে প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা, পুরান ঢাকাতে থাকছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে গড়ে তুলেছেন অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘আবাবিল লেদার টেক’।

আমার বাবা ও বড় ভাই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। যদিও উনারা কেউই লেদার শিল্পের সাথে জড়িত নয়। ব্যবসায়িক পরিবারে বড় হওয়ার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল সফল ব্যবসায়ী হবো। স্নাতক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর এক বন্ধুর সহযোগিতায় আরব আমিরাতের দুবাইয়ে একটা চাকরি হয়ে যায়। কিন্তু উদ্যোক্তা মন চাকরিতে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারেনি। সেখানে কিছু দিন চাকরি করার পর সেখানেই ছোট আকারে ব্যবসা শুরু করি।

নিজের দেশে এসে কিছু করবো এটাই আমার মনের ভেতর সবসময় তাড়া করতো। তাই সুযোগ বুঝে প্রবাসজীবন ছেড়ে দেশে চলে আসি। এটাও মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম, যেই উদ্যোগই নেই না কেন, সেটা হবে দেশীয় পণ্য নিয়ে। সেই কারণেই ২০১৮ সালে নিজের দেশে আমার স্বপ্নের উদ্যোগ ‘আবাবিল লেদার’ নিয়ে কাজ শুরু করি।

বাছাইকৃত চামড়া সংগ্রহ করে দক্ষ কারিগর দিয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সব পণ্য তৈরি করি। আমরা ফিনিশড চামড়া রপ্তানির পাশাপাশি দেশীয় চামড়া দিয়ে সব ধরনের পণ্য প্রস্তুত করি। যেমন- লেডিস সাইড ব্যাগ, হ্যান্ড পার্স, স্কুল ব্যাগ, মোবাইল পার্স, পাটি ব্যাগ, লেডিস জুতা, কাস্টমাইজ গিফট আইটেমসহ যেকোনো ধরনের লেদার আইটেম তৈরি করি।

আবার পাশাপাশি পুরুষের জন্যও তৈরি করি- লেদার জ্যাকেট, সুজ, লোফার, বেল্ট, ওয়ালেট, লং পার্স, কার্ড হোল্ডার, কি রিং, সব ধরনের করপোরেট গিফট আইটেম, অফিস ব্যাগ, ল্যাপটপ ব্যাগ, ট্র্যাভেল ব্যাগ, পাসপোর্ট কাভার উল্লেখ্য। বলা বাহুল্য যে, পরিবার পরিজন ছেড়ে যারা প্রবাসে থাকেন, তাদের মন সবসময় দেশে আসার জন্য অস্থির থাকে।

আমি মধ্য প্রাচ্যের দেশ ইউনাইটেড আরব আমিরাতে কাটিয়েছি কয়েক বছর। দুবাইয়ের বিভিন্নি শপিংমলে ঘুরে ঘুরে যখন শপিং করতাম, তখন দেখতাম, সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের তৈরি সব ধরনের পণ্যই পাওয়া যায়। কিন্তু মেড ইন বাংলাদেশ লেখা পণ্য খুব একটা চোখে পড়ত না। ভাগ্যক্রমে মেড ইন বাংলাদেশ লেখা পণ্য পেয়ে গেলে মন আনন্দে নেচে উঠতো।

আহ! দেশি পণ্য, স্বদেশি ঘ্রাণ। আসলে সত্য বলতে আমার লেদার শিল্পের উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে দেশের প্রতি ভালোবাসাও অন্যতম একটা কারণ। সবসময় ভাবতাম ব্যবসা করে নিজের দেশের টাকা দেশেই রাখবো এবং বাইরের দেশের টাকা দেশে আনবো। দেশে ফেরার পর লক্ষ করলাম আমাদের দেশে যারাই অনলাইনে বিজনেস করছেন বা নতুন করে উদ্যোক্তা হচ্ছেন, তাদের বিশাল একটা অংশ চায়না, ইন্ডিয়া বা অন্য কোনো দেশ থেকে পণ্য এনে সেটা অনলাইনে সেল দিচ্ছেন।

কিন্তু সে তু্লনায় দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করা উদ্যোক্তার সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আমি আমার উদ্যোগের শুরু থেকেই অনলাইনকে প্রাধান্য দিয়ে আসছি। কারণ, অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে আমি আমার পণ্যকে খুব সহজে সারাপৃথিবীর মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারছি। এখন যদিও অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও আমার কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি মনে করি উদ্যোক্তা হতে গেলে সবার আগে পরিবার থেকে বাঁধা আসে। অনেকে দেশের পেক্ষাপটে উদ্যোক্তা হওয়াটাকে অনেক ঝুঁকিপুর্ণ মনে করে। লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করাটাকেই বেশির ভাগ পরিবার নিরাপদ মনে করে। আমার জানামতে, আমাদের দেশের জাতীয় বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তা তৈরির স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদি কোনো কোর্স নেই। আমার উদ্যোক্তা হওয়ার পথে আরেকটা প্রধান যে বাঁধা ছিল সেটা হলো, শুরুতে আমার উদ্যোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল না। তাই শুরুতে কিছু ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছি।

আমার উদ্যোক্তা জীবনের শুরুর দিকে পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় একটা বাঁধাতে পড়েছিলাম। কারণ, ব্যাংক ঋণসহ অন্যান্য ঋণ পেতে যাবতীয় ডকুমেন্টেশন সংগ্রহ করা সহজ নয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র তৈরিতেও নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। স্বল্প পুঁজি নিয়ে দরিদ্র পরিবারের যেসব শিক্ষিত তরুণরা ভালো উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাদের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই সফল হয় না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক অবস্থা ও ঝুঁকি।

আমি একজন সফল উদ্যোক্তা এটা আমি এখনই বলতে নারাজ। আমি এখনো শিখছি ও স্বপ্নের পেছনে লেগে আছি। আমার উদ্যোক্তা জীবনের শুরুতে পরিবার থেকে সহোযোগিতা পেয়েছি। পরিবারের বাইরে যাদের থেকে আমি বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছি, তাদের মধ্যে একজন মানুষের নাম না বললেই নয়, আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষ ই-ক্যাবের (ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ‘সার্চ ইংলিশ’ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জনাব রাজিব আহমেদ স্যার। একটা উদ্যোগ শুরু করার পর সেটাকে কীভাবে সফলভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তার সবকিছুই রাজিব আহমেদ স্যারের কাছ থেকে শিখেছি ও এখনো শিখছি।

আমার উদ্যোগের শুরুতে আশেপাশের অনেক মানুষ বলেছিল, লেদারপণ্য অনেক স্লো আইটেম, এটা নিয়ে আগালে ভালো করতে পারবেন না তেমন। তারপরেও আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। ফলে, আমি করোনার সময়েও শুধু উই (উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স) ফেসবুক গ্রুপকে ব্যবহার করে তিন লাখ টাকার লেদার পণ্য খুচরা বিক্রি করেছি। উই কোনো বাই-সেল গ্রুপ না হলেও আমার পারসোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে ও এটা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের।

উই আমাদের দেশীয় পণ্যের প্রচারে বিশাল ভূমিকা রাখছে। উই গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা নাসিমা আক্তার নিশা আপা ও জনাব রাজিব আহমেদ স্যার দেশীয় পণ্য নিয়ে অনেক দিন থেকে লেখালেখি করে আসছেন। ফলে, দেশের বিলুপ্তপ্রায় অনেক পণ্য নতুন করে অনেক উদ্যোক্তা অনলাইনের মাধ্যমে আমাদের সামনে নিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত হয়েছেন

আমার স্বপ্ন বাংলাদেশের দ্বিতীয় এই রপ্তানি খাত আমার ‘আবাবিল লেদার’-এর মাধ্যমে দেশে ও দেশের বাইরের বাজারে আরও ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করবে। চামড়াজাত নানা পণ্যের পাশাপাশি চামড়ার জুতা নিয়ে আলাদা করে আমার ‘স্মাইল ফুট ওয়্যার’ও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। তথ্যসূত্র: রাইজিং বিডি।

More News Of This Category