1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

ঋণ করে গাড়ি কেনা, বাড়ি কেনা

অনেক লোকই ব্যাংক বা অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ করে গাড়ি-বাড়ি কেনেন। তবে ঋণের বোঝাটা বহন করা শেষ পর্যন্ত অতি ভারী মনে হয়। যতই ঋণ পরিশোধ করুক না কেন ঋণ যেন শেষ হতে চায় না। শুধু ঋণের কিস্তি শোধ করতে হয় বলে ঋণগ্রহীতাদের অন্য ব্যয়গুলোয় কাটছাঁট করতে হয়।

অবশ্য অনেকে ঋণ করে শুধু দেখানোর জন্য। তাদের অপ্রদর্শিত ও অব্যাখ্যাকৃত অনেক অর্থ আছে। তারা ওইসব অর্থকে সামনে আনতে চান না। ফলে তারা দেখাতে চান তাদের বাড়ি-গাড়ি কেনা তো ঋণের টাকায়ই। আমাদের পদ্ধতিতেও একটা ত্রুটি আছে, সেটা হলো বাড়ি ভাড়া থেকে সুদ বাবদ দেয় অর্থকে বাদ দিয়ে আয়কর হিসাব করা হয়।

ফলে অনেকে নিজের অর্থে বাড়ি না কিনে ঋণের অর্থে বাড়ি কিনতে আগ্রহী হয়। আর নিজের অর্থ ব্যাংকের স্থায়ী আমানত হিসেবে রেখে নিজেও সুদ নিচ্ছে। ঋণ করে বাড়ি কিনলে ট্যাক্সের ক্ষেত্রে সুবিধা আছে, এ রীতি অনেক পুরনো। আমার মনে হয়, আয়কর আইনের এ ধারা এখন বাতিল করা উচিত।

কারণ এ ধারার ফলে সৎ লোকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যাহোক, ঋণের এ ট্যাক্স কনসেশনের অর্থনীতি ছাড়া আর কী অর্থনীতি আছে। আছে তো বটে, তবে প্রশ্ন হলো কোন পক্ষের জন্য, যে ঋণ বেচছে তার জন্য, না যে ঋণ কিনছে তার জন্য। ঋণ বিক্রেতাদের জন্য তো অবশ্যই অর্থনীতি বা লাভ আছে। কারণ তাদের কাজই হলো ঋণ বেচা।

সেজন্য ঋণ বিক্রেতা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অতি আকর্ষণীয় অনেক বিজ্ঞাপন দেয়। বলতে থাকে আপনি বাড়ি কিনুন। অর্থায়নের ব্যাপারটা তাদের ওপর ছেড়ে দিন। উপযুক্ত ক্রেতা পেলে ঋণ বিক্রেতা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু ছাড় দিয়ে হলেও ঋণকে ক্রেতার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে।

চুক্তি সইয়ের সঙ্গে লিখে দিচ্ছে এত কিস্তিতে এত টাকা শোধ করতে হবে। ঋণের মূল্য কী? অর্থাৎ ঋণ বিক্রি করলে ব্যাংক কী পায়? আমরা সবাই জানি সুদ। মাসের-বছরের ভিত্তিতে সুদ হিসাব করা হয়। আবার ওই সুদ চক্রবৃদ্ধির আকারে বাড়তে পারে। তবে যারা ঋণ কেনেন, তারাতো অবশ্যই ঋণের বাজারটা যাচাই-বাছাই করেন। যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সুবিধাজনক শর্তে ঋণ বিক্রি করে, সাধারণত সেই প্রতিষ্ঠান বেশি গ্রাহক টানতে পারে।

এখানে মুখ্য কথা হলো ঋণের মূল্য বা সুদ দিয়ে ক্রেতা পোষাতে পারেন কিনা। অর্থনীতির বা অঙ্ক শাস্ত্রের সহজ হিসাব হলো ঋণ করে যে অর্থটা বাড়ি কেনায় খাটানো হচ্ছে, বাড়ির ভাড়া বা আয় থেকে সুদ পরিশোধ করে কিছু অর্থ থেকে গেছে সেই ঋণ অবশ্যই ক্রেতার পক্ষে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের বাড়ি কেনার বাজার এবং ঋণের বাজারের দিকে নজর দিলে অতি সহজেই বোঝা যাবে ভাড়া থেকে ঋণের মূল্য বা সুদ পরিশোধ করা মোটেই সম্ভব নয়।

সুদের হিসাবের অনেক মারপ্যাঁচ আছে। সুদের ওপর সুদ হিসাব হলে দেনার অঙ্কটা অনেক বড় হবে। আবার পরিশোধ করা অর্থকে প্রথমে দেয় মূল ঋণের বিপরীতে সমন্বয় করলে দেনার অঙ্কটা অনেক কম হবে। তবে ব্যাংকিং নীতি হলো পরিশোধের অর্থ আগে প্রাপ্য সুদের বিপরীতে সমন্বয় হবে। পরে অতিরিক্ত পরিশোধিত অর্থ আসলের সঙ্গে সমন্বয় হবে।

অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণপত্র প্রসেসিংয়ের নামে অধিক সার্ভিস চার্জও আদায় করে। কী কী সার্ভিস চার্জ আদায় করবে, সেটা গ্রাহককেই জেনে নিতে হবে। ঋণ বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো স্ব-উদ্যোগে নাও জানাতে পারে। যারা বড় ঋণ নেন, তারা বড় ব্যবসাও করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড় ঋণের ক্রেতারা সুদ ও সার্ভিস চার্জ পরিশোধের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা পায়।

সুদের ভিত্তিতে ঋণ করতে গেলে গ্রাহককে ভাবতে হবে, সে যে কাজে ঋণ ব্যবহার করবে, সে কাজ থেকে তার ক্যাশ ফ্লো কেমন হবে। বাড়ি ও গাড়িতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ক্যাশ ফ্লো নগণ্য। তবে যারা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে গাড়ি বা ট্রান্সপোর্ট কেনেন, তাদের হিসাব আলাদা। ব্যক্তিরও ক্যাশ ফ্লোর একটা ব্যাপার আছে। অনেকে বড় বেতনের চাকরি করেন এবং তাদের স্বাভাবিক ব্যয় মেটানোর পরও ভালো অর্থ উদ্বৃত্ত থাকে।

তারা উচ্চ সুদে ঋণ করে গাড়ি-বাড়ি কিনলে কঠিন অর্থনীতির হিসাবটা না করলেও চলে। কিন্তু বিপদে পড়ে তারা, যারা শুধু পারিবারিক অনুরোধে গাড়ি-বাড়ি ক্রয় করতে উদ্যোগী হন, ঋণ বিক্রেতারা অতি উত্সাহী হয়ে ঋণ বিক্রি করে তাদের স্থিতিপত্রকে সমৃদ্ধ দেখাবে। কিন্তু যিনি ঋণটা কিনলেন, তার স্থিতিপত্র কেমন দেখাবে একবার ভাবুন।

সৎ লোকদের সুদের হারের বিষয়ে বারবার ভাবতে হয়। লটারিতে টাকা পেয়ে ব্যয় করা আর অতি কষ্টে রোজগার করা এক জিনিস নয়। দুর্নীতিবাজরা অনেক অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করে। তাদের ব্যয় দেখে সৎ লোকদের হকচকিত হওয়ার কিছুই নেই। সততা এ গুণটি নিজেই একটা বড় সম্পদ। পরিশ্রম করার ইচ্ছা বা করতে পারাও একটা বড় সম্পদ।

শিক্ষা বা জ্ঞানও অনেক বড় সম্পদ। আর্থিক সম্পদকেই যারা একমাত্র সম্পদ হিসেবে গণ্য করেন, তাদের জ্ঞানের অভাব আছে। ভালো স্বাস্থ্য ভালো মন হলো অন্য অনন্য সম্পদ। এসবের সঙ্গে আর্থিক সম্পদ বা গাড়ি-বাড়ির আদৌ কোনো তুলনা চলে? সুদের নির্যাতন অনেক বড় নির্যাতন। কেউ নির্যাতন মনে না করলেও অন্তত বোঝাটাতো মনে করতে পারেন।

সেজন্য আমি পারতে কাউকে ঋণ করতে বলি না। আজকের ঋণ কালকের জন্য এমন বোঝা হয়ে দাঁড়াবে যে, শেষ পর্যন্ত যে স্বপ্নটা আসতে পারত, সেটাও তিরোহিত হয়ে পড়বে। বাড়িতে-জমিতে বিনিয়োগ করা শুধু সম্পদ ধারণ নয়, এগুলোকে বিনিয়োগের জন্য প্রতিযোগী সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

পশ্চিমের ধনী লোকদের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে শেয়ার-স্টক-ইকুইটির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি-স্বর্ণ-অগ্রিম কন্ট্রাক্টস এসবও আছে। কিন্তু ওই সব দেশে বাড়ি-জমির একটা সেকেন্ডারি মার্কেট আছে, যে মার্কেট ক্রেতা-বিক্রেতাকে হরদম একে অন্যের কাছে নিয়ে আসছে। আমাদের অর্থনীতিতে বাড়ি-জমির বাজার অতটা স্বচ্ছ নয়। এখানে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সরাসরি দরকষাকষিতে যেতে হয়।

এক্ষেত্রে কোনো ব্রোকার-এজেন্সির ভূমিকা নেই বললেই চলে। ফলে বাজারটা স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নয়। আবার বাড়ি-জমির ক্ষেত্রে অনেক দলিলপত্র ক্রেতাকেই সংরক্ষণ করতে হয়, যেটা করা আজকের অনেক লোকের পক্ষেই ঝামেলা বলে মনে হবে। ফলে বড় বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে লাভ করার উদ্দেশ্যে এ খাতে আসতে চান না।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গাড়ি ক্ষেত্রে না হলেও বাড়ি-ফ্ল্যাট-জমি কেনা-বেচায় ঠকাঠকির একটা ব্যাপার আছে বটে। ফলে গ্রাহকরা বেশি মূল্য দিয়ে হলেও বিক্রয়যোগ্য কোনো রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কাছে দৌড়ায়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুদের হার অনেক বেশি। যে হারে ঋণ কেনা হয়, তাতে ঋণ দ্বিগুণ হতে বড়জোর লাগবে তিন বছর।

গ্রাহককে ভাবতে হবে তিন বছরে তার আয় দ্বিগুণ হবে কিনা। অন্য অনেক দেশে সুদের হার আমাদের এক-তৃতীয়াংশের মতো। আমাদের সুদের হার বেশি হওয়ায় বাড়ি কিনলেও রিটার্নকে হিসাব করতে হয় উচ্চ হারে। সর্বত্রই বেশি মুনাফা করার যে আকাঙ্ক্ষা দেখা যায় তারও অন্যতম কারণ হলো উচ্চ সুদ।

অর্থনীতিতে একটার মূল্য বেশি হলে অন্য মূল্যগুলোকেও বেশি হতে হয়। সুদ হলো অনেক মূল্যের মধ্যে একটি মূল্য। তাই অর্থনীতিতে যদি কোনো দিন সুদহার কমে, তাহলে আশা করা যায় অন্য মূল্যগুলোও কমবে। সুদহার কত হবে, তা মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির একটা বিষয়।

আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রাস্ফীতি দমনের নামে এক ধরনের মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, যে নীতিই সুদকে উপরে ঠেলে দিয়েছে। সুতরাং এখন কেউ বাড়ি-ফ্ল্যাট ইত্যাদি কিনলেও দেখতে হয় সুদ পরিশোধের দায়টা কী হবে।

এই যে রিয়েল এস্টেট খাতে বিগত তিন বছর ব্যবসা মন্দ যাচ্ছে, সেজন্য উচ্চ সুদহারও দায়ী। উচ্চ সুদহার বিনিয়োগ ব্যয় সর্বত্রই বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এর আরেকটি ফল হলো অর্থনীতিতে প্রকৃত অর্থে মূল্যস্ফীতির উচ্চ হার বজায় থাকা। কিন্তু এ সত্যটি বাংলাদেশ মানতে নারাজ। লেখক: অর্থনীতিবিদ তথ্যসূত্র: বনিক বার্তা।

More News Of This Category