এক ব্যবসা একাধিক মালিকানা অধিক সম্ভাবনা, পার্টনারশীপ ব্যবসা মানেই খারাপ নয়।

স্টার্টআপ বা নতুন একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগের ক্ষেত্রে সহপ্রতিষ্ঠাতা নির্বাচন করা বা ব্যবসার জন্য একটা দল তৈরি করা খুব চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। অনেকেই সঠিক মানুষ নির্বাচন করতে গিয়ে ভুল করে ফেলেন। কয়েকজন বন্ধু মিলে হয়তো অপরিকল্পিতভাবে একটা ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেললেন। একসময় ব্যবসায় ধস নামল, মাঝখান থেকে নষ্ট হলো বন্ধুত্বটাও।

বন্ধুদের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান যে সব সময় ব্যর্থই হবে, তা তো নয়। বিল গেটস আর পল অ্যালেন মিলে যেমন তৈরি করেছেন বিশ্বের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান—মাইক্রোসফট। আর গুগল? দাঁড় করিয়েছিলেন দুই বন্ধু—ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন। কোনো বাছবিচার ছাড়াই বন্ধুবান্ধব সঙ্গে নিয়ে একটা ব্যবসা শুরু করে দেওয়া কতটুকু যৌক্তিক? একটি সফল ব্যবসা ও ব্যর্থ ব্যবসার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়।

ব্যবসার সহপ্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে এমন গুণাবলি থাকা জরুরি, যেন একজন যেই কাজে পারদর্শী নন, অন্যজন যেন সেখানে ভূমিকা রাখতে পারেন। ব্যাপারটা অনেকটা একটা ক্রিকেট দলের মতোই। কেউ ব্যাটিংয়ে ভালো, কেউ বোলিংয়ে। কেউ আক্রমণাত্মক, কেউ আবার ঠান্ডা মাথায় হাল ধরতে পারেন। প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে দক্ষ হতে হবে।

কেন সহপ্রতিষ্ঠাতা প্রয়োজন: কারও হয়তো বিনিয়োগ করার মতো প্রচুর টাকা আছে, কিন্তু নেটওয়ার্কিং নেই। কিন্তু স্টার্টআপ সফল করার জন্য তো নেটওয়ার্কের বিকল্প নেই। তখন এমন কাউকে সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রাখতে হয়, যাঁর অনেকের সঙ্গে খুব ভালো যোগাযোগ আছে। দলে একজন যদি কারিগরিভাবে খুব দক্ষ হন, তাহলে অন্য একজন যেন ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব, বিপণনের দিকগুলো খুব ভালো করে বোঝেন।

অনেকে মনে করতেই পারেন তাঁর স্টার্টআপ শুরু করার জন্য তিনি একাই যথেষ্ট, কোনো সহপ্রতিষ্ঠাতা দরকার নেই। আসলে দরকার আছে। কখনো দুইজন মিলে দল হয়ে যায়; কখনো বা চার-পাঁচজন লাগে।

কেন আপনার একজন সহপ্রতিষ্ঠাতা প্রয়োজন? ব্যক্তির সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। একাধিক মস্তিষ্ক একটি সমস্যা নিয়ে ভাবলে আরও ভালো সমাধান আসতে পারে। একাধিক মানুষের লক্ষ্য মিলে গেলে কাজ করা আরও সুবিধাজনক হতে পারে। সহপ্রতিষ্ঠাতাদের দক্ষতা আপনার জ্ঞানের পরিপূরক হবে। নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য সহপ্রতিষ্ঠাতা দরকার । একাধিক মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান এবং দক্ষতার সমন্বয় ঘটে। সম্পদ একীভূত হয় ( মানব ও অর্থসম্পদ) ।

অংশীদার নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়: কমপক্ষে এক বছর ধরে চেনা-জানা থাকলে ভালো, নিজের মূল শক্তির জায়গাটা শনাক্ত করতে হবে, যেন দলের মধ্যে একই দক্ষতার পুনরাবৃত্তি না হয়, প্রত্যেকের দায়িত্ব, অধিকার, কর্তব্য, কার অংশ কতটুকু এবং ব্যবসায় যুক্ত হওয়া বা ছেড়ে যাওয়ার নিয়মগুলো লিখিত আকারে থাকতে হবে।

ব্যবসায়িক অংশীদারের ভূমিকা: ব্যবসায়ে অংশীদারদের ভূমিকার কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল অবস্থায় খাপ খাওয়ানোর জন্য একজন অংশীদারকে একাধিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। তবে, সব সময় মূলত তাঁকে তিনটি কাজের জন্য বিশেষভাবে যোগ্য থাকা জরুরি। লেখক: নির্বাহী পরিচালক, ইনোভেশন, ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ সেন্টার এবং সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

একাধিক প্রতিষ্ঠাতা, সফল ব্যবসা
পাঠাও: বাংলাদেশে সফল ‘রাইড শেয়ারিং অ্যাপ’ পাঠাওয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হুসেইন এম ইলিয়াস, রাজশাহী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিফাত আদনান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেন্টলি ইউনিভার্সিটির ফাহিম সালেহ।

পাঠাওয়ের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিভিন্ন সময় তাঁদের নেপথ্যের গল্পটা বলেছেন। ফেসবুকের একটি সিক্রেট গ্রুপ থেকে শুরু হয়েছিল পাঠাওয়ের যাত্রা। যেটি আজ বাংলাদেশের অন্যতম সফল স্টার্টআপ। সহপ্রতিষ্ঠাতা সিফাত ও ফাহিম ছিলেন কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র। আর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুসেইন এম ইলিয়াস বিবিএ করেছেন।

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও মার্কেটিং ছিল তাঁর মেজর। এমবিএ করেছেন ব্যবস্থাপনা বিভাগে। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিকটি বলার উদ্দেশ্য হলো, ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি থেকে কীভাবে একাধিক ব্যক্তি এক হয়ে একটি দল গঠন করেন তা বোঝানো। পাঠাওয়ের দলের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

পাঠাওয়ের প্রধান নির্বাহীর ভাষায়, ‘যদি একটু বেশি সময় লাগেও, তবু সঠিক মানুষটি বেছে নিন।’ তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর সফলতার পেছনে পাঠাওয়ের শুরুর দিকের কারিগরদের বড় ভূমিকা ছিল।

এয়ার বিএনবি: অনলাইনে হোম শেয়ারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এয়ার বিএনবির গল্পের শুরু ২০০৭ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে পাড়ি জমিয়েছিলেন দুই বন্ধু ব্রায়ান চেসকি ও জো জেবিয়া। দুজনের পক্ষে পুরো একটা বাসার ভাড়া দেওয়ার মতো সক্ষমতা ছিল না। দুজন ভাবছিলেন, একটা রুম আরেকজনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিলে কেমন হয়? সেই থেকে শুরু। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন পুরোনো বন্ধু, নেথান ব্লেকারচিক।

ব্রায়ান আর জো ছিলেন চারুকলার ছাত্র। অন্যদিকে নেথান পড়ালেখা করেছেন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে। শিল্প আর বিজ্ঞানের জ্ঞান, দুটোর সমন্বয়ে তাঁরা বড় একটি ব্যবসা গড়ে তুলেছেন।

ব্যবসায়িক অংশীদারের যেসব গুণ থাকা দরকার: একজনের মধ্যেই যে সব গুণ থাকতে হবে তা নয়। একেকজনের মধ্যে একেক ধরনের দক্ষতা থাকলেই দলটা ভালো হয়, ব্যবসার চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সহজ হয়।

স্বপ্নদ্রষ্টা: প্রতিটি জিনিসের সাদা-কালো দুটি দিক থাকে। এই বিষয়গুলো সবাই বুঝতে পারেন না। বড় লক্ষ্য আর আইডিয়া থাকলে বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। ব্যবসার ক্ষেত্রে শুধু ‘আজ’ বুঝলে হবে না, ‘আগামীকাল’ কী হতে চলেছে, সেটাও বুঝতে হবে। গভীরভাবে যেকোনো কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে সার্বিক চিত্র বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। এ ধরনের মানুষ ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে দূরদৃষ্টির পরিচয় দেন যা সফলতার জন্য প্রয়োজন।

পরিকল্পনার দক্ষতা: পরিকল্পনা অনেকেই করতে পারেন। কিন্তু কারও কারও ভাবনা আকাশকুসুম হয়ে যায়। আবার কারও ভাবনা বেশ সুচারু, সাজানো হয়। ব্যবসার ক্ষেত্রে এটাই জরুরি। পরিকল্পনা করা থেকে শুরু করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ—পুরো বিষয়টিই চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা যদি অগোছালো হয়, তাহলে পুরো চক্রটাই ব্যর্থ হয়। তাই ব্যবসায়ে অংশীদার হিসেবে এমন একজনকে অবশ্যই দরকার যিনি গুছিয়ে ভাবনাগুলো সাজাতে পারেন, পরিকল্পনা করতে পারেন।

বাস্তবতা বিবেচনার দক্ষতা: প্রতিটি আইডিয়া বাস্তবতা বিবেচনায় কতটুকু যৌক্তিক সেটা বুঝতে পারা অনেক বেশি জরুরি। শুধু স্বপ্ন আর লক্ষ্য থাকলেই হবে না, এর সঙ্গে বাস্তব জ্ঞানকে মিলিয়ে এগোতে হবে। আপনি হয়তো এমন একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোতে শুরু করলেন, বাস্তবতা বিবেচনায় যেটা সম্ভব নয়। একজন দক্ষ অংশীদার তখন আপনাকে সঠিক পথ দেখাতে পারবেন।

পর্যবেক্ষক: ব্যবসার সার্বিক চিত্রটা বুঝতে হবে। স্টার্টআপ কিংবা চলমান প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা, যা-ই হোক না কেন, উভয়ের ক্ষেত্রেই ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতি কী এবং কোন সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে এটা কখন কোন দিকে মোড় নিতে পারে তা বোঝার মতো বিচক্ষণ হতে হবে।

ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা: বাধ্য হয়ে ঝুঁকি গ্রহণ করা নয়; বরং সময় বুঝে ঝুঁকি গ্রহণ করতে হলে যথেষ্ট সাহসী আর নিজ সিদ্ধান্তের প্রতি আত্মবিশ্বাসী হতে হয়। এ ধরনের মানুষের কৌশলগত চিন্তাভাবনা খুব কাজে লাগে। হয়তো আপনি ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। কিন্তু আপনার অংশীদারের সাহস আপনাকে অনুপ্রেরণা দিতে পারে।

যোগাযোগের দক্ষতা: ব্যবসার প্রয়োজনে আলাপ-আলোচনা করে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে সুসম্পর্ক তৈরি করতে পারেন, এমন লোক স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহযোগী হতে পারেন। অংশীদারদের প্রত্যেকেরই যে যোগাযোগের দক্ষতা থাকতে হবে, তা নয়। একে অপরের পরিপূরক হবেন।

প্রশ্ন করার দক্ষতা: ব্যবসা করার জন্য অন্যের জুতায় পা গলিয়ে নিজেকে দেখতে হয়, নিজের ভুল ত্রুটিগুলো খুঁজতে হয়। তাই সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সব সময় এমন একজনকে সঙ্গে রাখা দরকার, যাঁর কাজ হলো প্রশ্ন করা। এটা যদি না হয়? ওটা করে কী লাভ? কীভাবে হিসাবটা মিলবে? দলের কেউ যদি এমন সব প্রশ্ন ছুড়ে দেন, সেটা সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল হতে সহায়তা করে।

ধৈর্য ও একাগ্রতা: ব্যবসা করতে গেলে নানা রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। কখনো লাভ হবে, কখনো লোকসানে পড়তে হতে পারে। যে কোনো পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ঠান্ডা মাথায়। এ ক্ষেত্রে ধৈর্যশীলতা ও হার না মানার দক্ষতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সার্বিক জ্ঞান: নিজের প্রতিষ্ঠান, পণ্য, সেবা, গ্রাহক, প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক চিত্র সম্পর্কে সার্বিক ধারণা থাকতে হবে অংশীদারের। তথ্যসূত্র: প্রথমআলো।

SHARE