1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

এগিয়ে যাচ্ছে দেশের প্লাষ্টিক শিল্প ব্যবসা

ষাটের দশকে প্লাস্টিক শিল্প খুব ক্ষুদ্র পরিসরে যাত্রা শুরু করলেও কালের পরিক্রমায় উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় আজকে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত হিসেবে নিজের অবস্থান বেশ পোক্ত করে নিয়েছে এ খাতটি। ষাটের দশকে খেলনা, চুড়ি, ছবির ফ্রেম তৈরির মধ্যেই প্লাস্টিক শিল্প সীমাবদ্ধ ছিল। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু কারখানা প্লাস্টিকের এসব জিনিসপত্র তৈরি করত।

সত্তরের দশকে প্লাস্টিক শিল্পে অটোমেটিক মেশিন স্থাপন করা হয়। গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসপত্র বিশেষ করে জগ, মগ, প্লেট, বোতল, বাটি ইত্যাদি তৈরি হতে থাকে। আশির দশকে প্লাস্টিক শিল্পে সংযোজিত হয় প্লাস্টিকের ব্যাগ তৈরি। এজন্য ফ্লিম বোয়িং মেশিন স্থাপিত হয় প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরির কারখানায়। তবে প্লাস্টিক শিল্পের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধিত হয় নব্বইয়ের দশকে।

মুক্তবাজার অর্থনীতির ডামাডোলে প্লাস্টিক শিল্প খুঁজে নেয় তার আপন পথ। উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি শুরু হয়। একবিংশ শতাব্দীতে এই শিল্পের ব্যাপ্তি ঘটেছে বহুগুণ। চেয়ার, টেবিল, পানির ট্যাঙ্ক, দরজা থেকে শুরু করে আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে ব্যবহৃত প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। উৎপাদন ও রফতানি বৃদ্ধি পেয়ে আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত।

পলিমার কথন: প্লাস্টিক শিল্পখাতের প্রধান উপাদান পলিমার দানা। পলিমারের দানা আমাদের আমদানি করতে হয়। দেশে পলিমার উৎপাদনের কোন কারখানা না থাকায় আমদানিই ভরসা। প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় পলিমার আমদানির পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। আশির দশকে যেখানে বার্ষিক দশ হাজার টনের মতো পলিমার আমদানি করতে হতো সেখানে এখন প্রায় দুই লাখ নব্বই হাজার টনের মতো পলিমার আমদানি করতে হয়।

প্লাস্টিক প্লাস্টিক আর প্লাস্টিক: একটা সময় প্লাস্টিক দিয়ে শুধু খেলনা, চুড়ি আর ছবির ফ্রেম তৈরি করা হলেও এখন আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের তৈরি পণ্য ব্যবহৃত হচ্ছে। গৃহস্থালির সরঞ্জাম (জগ, মগ, প্লেট, বালতি ইত্যাদি), গার্মেন্টস শিল্পে (প্যাকেজিং মেটেরিয়াল, ব্যাগ, হ্যাঙ্গার ইত্যাদি),

আসবাবপত্র (চেয়ার, টেবিল ইত্যাদি), স্বাস্থ্য সেবা (টুথ ব্রাশ, সোপকেস, ব্লাড ব্যাগ, স্যালাইন ব্যাগ ইত্যাদি), নির্মাণ শিল্প (পাইপ, দরজা, টয়লেট ফ্লাশ ইত্যাদি), ইলেকট্রনিক্স (তার, সুইচ, রেগুলেটর ইত্যাদি), কৃষি ও শিল্পসহ আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। কাঠ, লোহা, স্টিলের অনেক জায়গাই দিন দিন দখল করে নিচ্ছে প্লাস্টিক।

কতটুকু হচ্ছে প্লাস্টিক ব্যবহার: দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার অনেক বৃদ্ধি পেলেও তা এখন পর্যন্ত কাক্সিক্ষত মাত্রায় নয়। এদেশে প্লাস্টিকের মাথাপিছু ব্যবহার প্রায় পাঁচ কেজি যেখানে বিশ্বে গড়ে প্লাস্টিকের ব্যবহার বিশ কেজির মতো। মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারতে আট কেজি, চীনে একত্রিশ কেজি, ব্রাজিলে বাইশ কেজি আর আমেরিকায় একাত্তর কেজি।

বিশ্বে প্লাস্টিকের গড় ব্যবহারের হিসাব দেখে এখনই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। নব্বইয়ের দশকে যেখানে মাত্র পনেরো হাজার টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হতো সেখানে আজ সাড়ে সাত লাখ টন প্লাস্টিক ব্যবহৃত হচ্ছে। এই উপাত্ত আমাদের আশান্বিত করতে পারে।

উৎপাদক প্রতিষ্ঠান: বাংলাদেশে তিন হাজারের বেশি প্লাস্টিক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের মধ্যে আটানব্বই ভাগই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। বেশিরভাগই গৃহস্থালির টুকিটাকি প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। কিছু বড় আকারের শিল্প উৎপাদক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের উৎপাদিত পণ্য দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।

অর্থনীতির চাকা ঘোরাচ্ছে প্লাস্টিক: প্লাস্টিক শিল্প আমাদের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের মোট জিডিপির প্রায় এক শতাংশের অবদান প্লাস্টিক শিল্পের। এ খাতের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় এক হাজার মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই খাতটি আমাদের রফতানি আয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিবছরই ক্রমান্বয়ে রফতানি আয় বাড়ছে।

বিশেষ করে সরাসরি প্লাস্টিক পণ্য। ২০০৩-০৪ অর্থবছরে যেখানে সরাসরি প্লাস্টিক পণ্য রফতানি আয় ছিল ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঠিক তার দশ বছর পর অর্থাৎ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরাসরি প্লাস্টিক পণ্য রফতানিতে আয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৮৫.৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এবং প্রত্যাশা করা হচ্ছে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সরাসরি প্লাস্টিক পণ্য রফতানি করে আয় হবে ৯০.২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এ খাতে মোট রফতানি আয় কিন্তু এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। প্রতিবছর কমসে কম ৩২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে রফতানি আয় হচ্ছে। প্রতিবছরই প্লাস্টিক শিল্পের প্রবৃদ্ধি ঘটছে। প্রায় বিশ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ বাজারের পরিমাণ আর রফতানি আয় যা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই প্লাস্টিক খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাঁচ লক্ষাধিক লোকের জীবিকা। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এগিয়ে যাওয়ায় যে প্রতিবন্ধকতা: এদেশে পলিমার উৎপাদনের কোন প্রতিষ্ঠান নেই। আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। তবে একে শিল্প বিশেষজ্ঞরা অসুবিধা হিসেবে দেখছেন না। বরং সস্তা শ্রম আর পর্যাপ্ত রিসাইকেলিং প্রতিষ্ঠান এ দেশের প্লাস্টিক শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এ খাতের অন্যতম প্রতিবন্ধক।

দক্ষ কর্মী, ছাঁচ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতকরণ, গুণগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা, কারিগরি পরামর্শক সহায়তা, যন্ত্রপাতির যথাযথ ব্যবহার, প্লাস্টিক বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এ শিল্পখাতে দুর্বলতা লক্ষণীয়। তাছাড়া মূলধনের অভাবের বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য। এসএমই ঋণের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনেক ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়। এছাড়া পরিবেশগত বিষয়ে প্লাস্টিক শিল্পের নেতিবাচক ইমেজ এই শিল্পের প্রসারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।

শেষ কথা: প্লাস্টিক শিল্প আমাদের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এই খাতের প্রসারের মাধ্যমে রফতানি আয়কে যেমন আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব সেই সঙ্গে আরও অধিক লোকের কর্মসংস্থানও সম্ভব। এজন্য চাই সরকারের উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্লাস্টিক শিল্পোদ্যোক্তাদের এসএমই ঋণের মাধ্যমে মূলধনের যোগান, প্লাস্টিক পণ্যের পরিবেশগত স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণসহ যে সমস্যাগুলো বিদ্যমান রয়েছে তা দূর করার যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হলে এ শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে সেই সঙ্গে বাড়বে রফতানি আয়। এগিয়ে যাবে দেশ। তৈরি হবে শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত। তথ্যসূত্র: দি প্রমিনেন্টে।

More News Of This Category