এলার্জি থেকে রক্ষা পেতে বিউটি ফার্মের প্রতিষ্ঠা

কত কিছুর জন্যই তো কত কিছু হয়। কিন্তু অ্যালার্জির হাত থেকে রক্ষা পেতে গিয়ে একটি বিউটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করে ফেলা, যেনতেন কথা নয় নিশ্চয়। শারীরিক নানা সমস্যার কারণে পেশা পরিবর্তন খুব সাধারণ ঘটনা। কিন্তু একটি বড় প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেওয়া, আর যা-ই হোক সাধারণ কিছু নয়। এ কাজটিই করেছিলেন সিঙ্গাপুরের সাবরিনা তান।

বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে পড়াশোনা করা সাবরিনা তান ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের একজন কর্মী। পেশাগত কারণেই তাঁকে অনেক ভ্রমণ করতে হতো। নিজ পেশাকে ভালোও বাসতেন তিনি। কিন্তু বাধ সাধল তাঁর অ্যালার্জির সমস্যা। তাঁর ত্বক ছিল খুব সংবেদনশীল। রঞ্জক পদার্থের সংস্পর্শে এলে বা ঘনঘন আবহাওয়া পরিবর্তন করলে তাঁর চর্মরোগ বেড়ে যেত। এটিও তিনি মেনে নিয়েছিলেন।

কিন্তু যখন তিনি তাঁর সন্তানদের মধ্যেও একই সমস্যা দেখলেন, তখন সিদ্ধান্ত নিলেন পেশা বদলের। কিন্তু কী করবেন? মনে মনে আদর্শ মানা স্টিভ জবসই তাঁকে পথ দেখালেন। ঝুঁকি নিলেন। নিজের চর্মরোগ তাঁকে এমন এক প্রতিষ্ঠান জন্ম দেওয়ার দিকে ঠেলে দিল, যা ত্বকের যত্নেই কাজ করবে। জন্ম হলো স্কিন ইনকরপোরেশনের। সিঙ্গাপুরভিত্তিক এ ব্র্যান্ড এখন এশিয়া ছাড়িয়ে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত।

বিবিসির সাপ্তাহিক আয়োজন ‘দ্য বস’-এ উঠে এসেছে এবার এই সাবরিনা তানের কথা, যিনি একই সঙ্গে স্কিন ইনকরপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। শুনতে সহজ মনে হলেও সাবরিনার জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি পেশায় যাত্রা করাটা সহজ ছিল না। অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল তাঁর সামনে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে স্কিনকেয়ার পেশায় স্থানান্তর শুধু নয়, সহকর্মীর দিক থেকেও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে।
আইবিএম, ওরাকলের মতো প্রযুক্তি কোম্পানিতে সাবরিনার অধিকাংশ সহকর্মী ছিল পুরুষ।

তিন ভাইয়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠা সাবরিনার ঘরেও ছিল পুরুষাধিক্য। আর তিনি যা প্রতিষ্ঠা করলেন, সেখানে নারীরাই প্রধান। ফলে শুরুতে তাঁকে এ ক্ষেত্রেও বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। সাবরিনার ভাষ্যে, ‘দলে অল্প কজন নারীর একজন হয়ে আমি অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই সব বদলে গেল। দেখলাম আমার চারপাশে শুধু নারী, যাদের কেউ কেউ লাজুক, কেউবা অপ্রস্তুত। যদিও তাঁদের সবাই ছিলেন এ কাজের জন্য দারুণভাবে যোগ্য। ফলে সমস্যা হয়নি। আমার লক্ষ্যই ছিল স্কিনকেয়ারের অ্যাপল প্রতিষ্ঠা করা।’

বর্তমানে ৪৫ বছর বয়সী সাবরিনা তান সিঙ্গাপুরেরই এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেছেন। পরে একটি প্রযুক্তি কোম্পানিতে যোগ দেন। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি দেখেন, কাজের স্বার্থেই তাঁকে অনেক ছোটাছুটি করতে হয়। এতে তাঁর ত্বকে থাকা অ্যালার্জির সমস্যা বেড়ে যায়। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহার করে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তিনি। এতে হতাশা কাজ করলেও পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবেননি। পরে নিজের সন্তানদের মধ্যেও একই ধরনের সমস্যা দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, ‘আর নয়’। এই ভাবনা থেকেই তিনি জাপান সফর করেন একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে পেতে।

একসময় সাবরিনা সব চষে ফেলেন। রসায়নবিদ থেকে বিজ্ঞানী, ওষুধের দোকান থেকে প্রসাধনীর দোকান সব চষে ফেলেন। তিনি মূলত ত্বকের যত্নের বিষয়টি ব্যক্তির আয়ত্তে নিয়ে আসতে আটঘাট বেঁধে নেমেছিলেন। এ ভাবনাই তাঁকে চালিত করে জাপানের সেই পরীক্ষাগার পর্যন্ত, যেখানে তিনি বোঝাতে সমর্থ হন যে, নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট প্রসাধন তৈরি করা কতটা জরুরি। তখন ২০০৭ সাল। তাঁর এ জাপান সফর বৃথা যায়নি। আশার আলো দেখেন তিনি। আর এ আশাই তাঁকে নিয়ে গেছে স্কিন ইনকরপোরেশন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে।

স্কিন ইনকরপোরেশন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাবরিনা তানের জীবনসঙ্গীও বেশ উৎসাহ দিয়েছেন। হয়ে উঠেছেন সহযোগী। তিনিও নিজের চাকরি ছেড়ে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেমে পড়েন। উদ্যোগ গ্রহণের এক বছরের মাথায় সিঙ্গাপুরে চালু হয় প্রথম দোকানটি। সে সময়ের লড়াই সম্পর্কে সাবরিনা বিবিসিকে বলেন, ‘দিনে কখনো কখনো মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমাতাম। এমন অনেক সময় মনে হয়েছে, ঠিক করছি তো!’

ক্রমেই এ দ্বিধা কেটে যায়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নতুন ব্র্যান্ডটি পরিচিতি পেতে শুরু করে। বছর ঘুরতেই সিঙ্গাপুরেই খোলেন আরও দুটি শাখা। সে সময় তাঁর পণ্যতালিকায় ছিল ক্রিম, উচ্চ প্রযুক্তির প্রসাধন সামগ্রী, সিরাম ইত্যাদি। কিন্তু স্বপ্নের দরজাটি খুলতে তখনো বাকি ছিল। ছয় বছরের মাথায় বৈশ্বিক প্রসাধন কোম্পানি সেফোরার সঙ্গে বিপণন চুক্তি হওয়ার পর ভাগ্য খুলে যায় তাঁর।

ফরাসি এ কোম্পানি তাঁর কোম্পানিকে বৈশ্বিক পরিসরে পরিচয় করিয়ে দেয়। এখন ব্যবসার পরিসর যেমন বেড়েছে, সঙ্গে বাড়ছে আগ্রহী বিনিয়োগকারীও। এখন পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকংয়ের বিনিয়োগকারী পেয়েছে স্কিন ইনকরপোরেশন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয়ের পরিমাণ কোটি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। তথ্যসূত্র: বিবিসি।

SHARE