1. editor@islaminews.com : editorpost :
  2. jashimsarkar@gmail.com : jassemadmin :

কর্মীদের সঙ্গে আচরণে সৎ হওয়াটা জরুরি!

ব্রায়ান অ্যাকটনের একটি গল্প শুনুন। যে ফেসবুকের কাছে চাকরি চেয়েও একসময় শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয়েছিল তাকে, সেই ফেসবুকের কাছে ২০১৪ সালে তিনি হোয়াটসঅ্যাপ বিক্রি করেন ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এর পরের কথা শুধুই ইতিহাস। ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময় তখন। একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার দ্বারে দ্বারে চাকরি খুঁজছিলেন। অথচ তার ঝুলিতে আছে ইয়াহু ও অ্যাপল কম্পিউটারসহ ডজনখানেক নামি কোম্পানিতে চাকরির অভিজ্ঞতা।

সামনে যাদের হাতে অনলাইনের রাজত্ব যাবে এমন দুটি কোম্পানি টুইটার আর ফেসবুকেও ঢুঁ মারলেন। কাজের কাজ কিছুই হলো না। কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছেই নিজেকে যোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে পারলেন না তিনি। উপায়ান্তর না পেয়ে একটা টিম বানালেন ইয়াহু আলম এবং জান কুমকে নিয়ে। বানালেন ক্লাউডভিত্তিক মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন-হোয়াটসঅ্যাপ।

বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের মতে, নিজের দক্ষতা ও দুর্বলতা জেনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিষয়টি জানা থাকলে ব্যক্তি বুঝতে পারবেন, তিনি কোন বিষয়টিতে ভালো করবেন। মনে রাখবেন কাজ করলেই আপনি নিজেকে চিনতে পারবেন। একমাত্র কাজের মাধ্যমে আপনার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা ধরতে পারবেন। প্রতিদিন নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করাটাই আপনার আসল লক্ষ্য। লক্ষ্য রাখবেন আপনার দক্ষতার দিক যেন দুর্বল না হয়ে পড়ে।

যেকোনো কাজ আপনি যদি মন দিয়ে সৎভাবে করেন দেখবেন এর ফল আসবেই। নিজেকে নির্ভরযোগ্য ও অপরিহার্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যেন আপনাকে কাজ দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। ভুল করে কখনোই অস্বীকার করতে যাবেন না। কারণ আপনি যতই তা করবেন ততই লোকে ভুল প্রমাণিত করতে এগিয়ে আসবেন। নিজেকে সঠিক প্রমাণের জন্য তর্ক করবেন না। বরং নিজেকে বোঝানোর উদ্দেশ্যে তর্ক করুন।’

শুধু টাকার জন্য কোনো কাজে জড়িত হলে একসময় সেই কাজের আগ্রহ হারিয়ে যায়। এ কারণে সফলরা শুধু উপার্জনের কথা বিবেচনা করে পেশা নির্ধারণ করেন না। নিজের কাজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা। কাজের জায়গায় নিজেকে প্রফেশনাল হিসেবে গড়ে তোলা। কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান হওয়া, ডেডিকেটেড হওয়া একটা মানবিক গুণ। সময়ের সাথে সাথে এখন কাজের ধারায়ও পরিবর্তন আসে।

কাজকে যতই ভালোবাসি না কেন, ব্যক্তিগত জীবনের সাথে পেশাদার জীবনের দূরত্ব অবশ্যই রক্ষা করে চলা। যে কাজটি করব সেই কাজ এবং কোম্পানির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াটাও জরুরি। যে কাজই করি না কেন, সেই কাজের প্রতি যদি ভালোবাসা থাকে তাহলে কাজটার যত্নও থাকবে। ঠিক যেভাবে আমরা সংসারের দেখাশোনা করি, পরিবারের কাজ করি, সেই একই যত্ন নিয়ে কাজ করলে সাফল্য আসবেই। কোনো কাজ করতে গিয়ে ভয় পেয়ে পিছিয়ে এলে চলবে না।

বরং ভয় পাওয়ার পরও তা যেকোনো মূল্যে করতে হবে। নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে। কখনোই অন্যদের ঘিরে নিজের কোনো কিছুর পরিকল্পনা সাজানো ঠিক হবে না। সব সময় রুটিনমাফিক কাজ করা, প্রয়োজনে অভিজ্ঞ সহকর্মীর পরামর্শ নেওয়া। একটি ভালো পরামর্শের চেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী আর কিছুই হতে পারে না। সঠিক সময়ে সঠিক শব্দটি শোনার মাধ্যমে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা অপরিহার্য। কাজের ক্ষেত্রে সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখলে চাকরিতে সুস্থ পরিবেশ বজায় থাকে, যা ক্যারিয়ার লাইফে উত্তরোত্তর সাফল্য ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।

সাফল্য লাভের জন্য আধুনিক এ করপোরেট কালচারের যুগে গ্রাহকসুলভ আচরণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। ‘হাউ টু থিংক লাইক দি ওয়ার্ল্ডস গ্রেটেস্ট নিউ মিডিয়া মগলস’র লেখক মার্সিয়া লেটন টার্নার বলেন, ‘আপনার কর্মীরাই আপনার ব্যবসার প্রতিবিম্ব। আপনি যদি চান যে আপনার কর্মীরা আপনার জন্য কাজ করে গর্বিত বোধ করুক, তাহলে তাদের সঙ্গে সেভাবেই আচরণ করতে হবে।

কর্মীরা যদি অফিস বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত এবং আন্তরিক বোধ না করে, তার প্রভাব অন্যদের মধ্যেও, বিশেষ করে কাস্টমারদের মধ্যেও জাগবে। এটা কখনোই কাম্য হতে পারে না।’ ব্যবসা কিংবা অফিস সবক্ষেত্রেই এমন আচরণ প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মীর জন্য সাফল্য বয়ে আনে। করপোরেট কালচারের মতো ব্যবসাতেও গ্রাহকদের সঙ্গে আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার সহকর্মীর সঙ্গে নিজের আচরণবিধির ওপর ক্যারিয়ার বা ব্যবসায় সহায়তা করবে।

অন্যকে অন্ধভাবে অনুসরণ করার আগে তা ভালোভাবে বুঝে নেওয়ায় সাফল্যের পথ অবধারিত হয়। সফল ব্যক্তিরা প্রথম চেষ্টাতেই সফল হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু তারা এ ব্যর্থতায় হতাশ হন না। বরং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আর এতে করে প্রশস্ত হয় তাদের সফলতার পথ। কোনো অর্জনে কখনো অহংকারী হয়ে ওঠা সুফল আনে না। অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে নিজেকে তিরস্কার করলে তা বদলে যাবে না।

অতীতে কেন ভালো হলো না, তা নিয়ে যতই মাথা ঘামানো হোক না কেন, তাতে তা বদলে যাবে না। জীবনে সফল হতে হলে কিছু জিনিস অন্য সবার থেকে একটু আলাদাভাবে ভাবতে হয়। যেকোনো কাজেই করা হোক না কেন, সে কাজে সফল হওয়া, ভালো সুনামের সঙ্গে সেই কাজ করা এই চাহিদাগুলো সবার মনে থাকে। সাফল্যের পথ কারো জন্যই সহজ নয়। পিচ্ছিল এ পথে চলতে গিয়ে লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর এ কারণে সফল ব্যক্তিরা সর্বদাই তাদের পথের দিকে মনোযোগী থাকেন। নিজেদের সব কর্মকান্ড তারা নিয়োগ করেন লক্ষ্যের পেছনে।

আমরা যেই পেশায় থাকি না কেন, কর্মক্ষেত্রে সফলতা আমাদের সবারই কাম্য। মনে রাখতে হবে একা একা বড় হওয়া খুবই কঠিন। যারা একা সফলতার শীর্ষে পৌঁছে যেতে চান তারা প্রায়ই কিছু পথ পেরিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অন্যপক্ষে একসঙ্গে কাজ করলে মানসিক চাপ কারো একার ওপর পড়ে না। বিনিয়োগ বড় হয়, কাজ ভাগ করে নেওয়া যায়। টিমওয়ার্কের ক্ষেত্রে কর্মীদের মধ্যে কৃতজ্ঞতা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।

কর্মক্ষেত্রে সফলতার বিষয়ে বিশ্বখ্যাত ফোর্ড মোটর কোম্পানির গ্লোবাল কনজ্যুমার ট্রেন্ড বিশেষজ্ঞ শেরিল কনেলি একবার গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘একটা সময় ছিল যখন পদবি, বাসস্থানের আকার আর গাড়ি দেখে বিবেচনা করা হতো একজন ব্যক্তি কতটা সফল।’ ক্যারিয়ারে এই সফলতা কিন্তু সহজে ধরা দেয় না। সফল হতে হলে চাই মেধা, মননশীলতা, কাজের প্রতি আন্তরিকতা।

চাকরি নতুন হোক বা পুরোনো এই বিষয়গুলো মেনে চলা খুবই প্রয়োজনীয়। টিমের সহকর্মীদের কাজ ভালো হলে অবশ্যই প্রশংসা করা। ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া। যোগ্যতা অনুযায়ী পুরস্কৃত করা। যদি টিমে স্বজনপ্রীতি বা বিশেষ কারো প্রতি ভালোবাসার চর্চা করা হয়, তাহলে সেটি অন্যদের কাজ করার আগ্রহকে নষ্ট করে। টিম পরিচালনায় সফল হতে গেলে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও গন্তব্য থাকা প্রয়োজন।

কী করতে চাইছি এবং কেন করতে চাইছি, সেটি জানা থাকলে সামনে এগুনো সহজ হতে পারে। আর লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করতেও সহজ হবে। কোন কাজটি করছেন, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। কাজের মধ্যে নিজের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধান করতে হবে। যেকোনো কাজ সঠিক সময়ে শুরু করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে। কর্মীরা যত কাছে থাকবে, তত তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে, দলকে একত্র রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।

কর্মীদের সঙ্গে আচরণে সৎ হওয়াটাই জরুরি। বিশ্বস্ততা না থাকলে টিমওয়ার্ক কখনো সফল হয় না, দীর্ঘস্থায়ী হয় না। টিম মেম্বারদের কাছে পরিচ্ছন্নভাবে কোম্পানির কাজ তুলে ধরা। তাদের বোঝানো, এটি তাদের সবার কোম্পানি। এর গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্ব সবার। মিটিংয়ে সবাইকে মতামত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া।

কোম্পানির করপোরেট ভ্যালু যেন তারা ভালোভাবে বোঝেন, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। কর্মক্ষেত্র যেমনই হোক না কেন, সেখানে সবাই সফল হতে চান। আর এ সফলতার দেখা পেতে সবাই বেশ হিসাব-নিকাশ করে সামনে পা ফেলেন। তবে এখানেও বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন যে হতে হয় না, তা নয়। আর এসব কিছু অতিক্রম করে যেতে পারলে তবেই সফল হওয়া সম্ভব। লেখক: বিশ্লেষক ও কলামিস্ট তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

More News Of This Category