1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

কাজের অভাবে সন্তান বিক্রি করে অন্য সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে হচ্ছে

যুদ্ধের পর নিজের গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে পাড়ি দিতে বাধ্য হন মোহাম্মদ খান। আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের প্রদেশ সার-ই-পোলে থাকতেন তিনি। একটু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এক বছর আগে পাড়ি জমান অন্য প্রদেশ বালখে। সেখানে আরেক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েন তিনি।

মোহাম্মদ খানের স্ত্রী অসুস্থ, কিছুদিন আগে সন্তান জন্ম দিয়েছেন তিনি। বালখে এসে মোহাম্মদ খানও কোনো কাজ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আর এই অবস্থায় সাত সন্তানের মুখে কীভাবে খাবার তুলে দেবেন, সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি। সন্তানদের বাঁচাতে গত জানুয়ারিতে কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিতে হয় খানকে।

তাঁদের ৪০ দিন বয়সী ছোট্ট সন্তানকে ৭০ হাজার আফগান মুদ্রার বিনিময়ে প্রতিবেশীর কাছে বিক্রি করে দেন। অন্য সন্তানদের বাঁচাতেই এ কাজ করতে বাধ্য হন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি আমার এক ছেলেকে ৭০ হাজার আফগান মুদ্রায় বিক্রি করেছি, যাতে আমার অন্য সন্তানদের অনাহারে মরতে না হয়।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আফগানিস্তানে বর্তমানে অর্ধেকের বেশি মানুষের বয়স ১৫ বছরের নিচে। ১৭ বছর ধরে চলা যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কষ্টের মুখে পড়েছে শিশুরা। ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে ৯২৭টি শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এখানে এতিম শিশুদের সংখ্যা ও রাস্তায় জোরপূর্বক কাজ করানো শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা যেন নিত্যদিনের। আফগানিস্তানে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের প্রতিনিধি এডেল খদর বলেন, ‘আমি মনে করি, যতটুকু আশার অস্তিত্ব ছিল, সেটাও আর নেই।’

আফগানিস্তানের পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে আসচিয়ানা নামে একটি দাতব্য সংস্থা। তারা বলছে, তালেবানরা আরও এলাকা দখল করে নেওয়ায় আফগান শিশুদের ওপর ঝুঁকি বাড়ছে। আসচিয়ানার পরিচালক মোহাম্মদ ইউসেফ বলেন, এই সংস্থা এখন আগের মতো শিশুদের সাহায্য করতে পারছে না। কারণ, দাতাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘শিশুরা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না, এ জন্যই তারা আফগানিস্তানে বেশি উপেক্ষিত হচ্ছে। তাদের কোনো ক্ষমতা নেই।’

আসচিয়ানাতে বসে ছবি আঁকতে দেখা যায় ১২ বছরের জাবিউল্লাহ মুজাহেদকে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে ছবি আঁকছে সে। বড় হয়ে নামকরা চিত্রশিল্পী হতে চায়। এতটুকু দেখলে যে চিত্র ফুটে ওঠে বাস্তব তার উল্টো। কাবুলের রাস্তায় মানুষের জুতা কালি করার কাজ করে জাবিউল্লাহ। প্রতিদিন ১০০ আফগান মুদ্রা আয় করতে বহু পরিশ্রম করতে হয় তাকে। ছবি আঁকা শেখা আর এই কাজের মধ্যে তৈরি করে নিতে হয় সময়ের ভারসাম্য।

চার বছর আগে তালেবান আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন জাবিউল্লাহর বাবা। ছয় ভাইবোনসহ মাকে সাহায্য করার জন্যই নিরন্তর খাটছে জাবিউল্লাহ। তবে যা আয় হয়, তা পরিবারের ভার বহনের জন্য যথেষ্ট না। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব শঙ্কিত সে। জাবিউল্লাহ বলে, ‘আমি কাজ না করলে আমার মা, ভাই ও বোনেদের না খেয়ে থাকতে হবে। আমার খুব চিন্তা হয়, যদি কোনো দিন শান্তি আসে, আমার ভবিষ্যতে কী হবে।’

২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযান শুরুর আগ পর্যন্ত তালেবান সরকারের পাঁচ বছরের শাসনে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করা আফগানিস্তানের পশ্চিমা–সমর্থিত সরকার ও তার মিত্রদের অন্যতম মূল লক্ষ্য ছিল। তবে ১৭ বছর ধরে চলা যুদ্ধে পরিস্থিতির দৃশ্যত তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। সহিংসতা ও রক্তপাত দৈনিক ঘটনা।

ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ৩৭ লাখ শিশু স্কুলে যেতে পারছে না। অথচ তাদের এখন স্কুলে যাওয়ারই বয়স। নিরাপত্তার অবনতি, দারিদ্র্য ও অভিবাসনের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

আফগানিস্তানে ইউনিসেফের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান অ্যালিসন পারকার বলেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর ধরে যুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশটি। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৬০ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, যাদের অর্ধেকেরও বেশি শিশু। ৩০ লাখ শিশু পড়াশোনার বাইরে রয়েছে, যার ৬০ শতাংশই মেয়ে। শিশুরা মারাত্মকভাবে অপুষ্টির স্বীকার।

দেশটিতে প্রায় পাঁচ লাখ শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। বাল্যবিবাহের হার ৩৫ শতাংশ, টিকাদান কর্মসূচির আওতায় পড়ে গড়ে মাত্র ৪৬ শতাংশ শিশু, কোনো কোনো জায়গায় তা ৮ শতাংশ। এ অবস্থার আরও অবনতি হচ্ছে। শিশুরা খাদ্য জোগাড়ের জন্য নিজেদের পড়াশোনা, খেলাধুলার অধিকার—সবকিছু বাদ দিচ্ছে।

অ্যালিসন পারকার বলেন, এমন গল্প আছে যে চার বছরের এক শিশুর কাছে তার বাবা ঘরের বাইরে যাওয়ার আগে জানতে চান, তোমার জন্য কী আনব? শিশুটি কোনো খেলনা বা খাবার জিনিস চায় না। ভয়ে ভয়ে বলে, ‘কেবল তুমি ফিরে এসো—এটাই চাই, বাবা।’ বর্তমানে এমন পরিস্থিতি আফগানিস্তানে।

১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সর্বশেষ সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। ১০ বছর ধরে চলা সোভিয়েত–আফগান যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন গৃহযুদ্ধে জড়ায় দেশটি। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত চলা ওই যুদ্ধে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে শিশুরা। যৌন নির্যাতন, শিশু পাচারের মতো ঘটনা ব্যাপক বিস্তার পায়। তবে সেই সময়ের চেয়েও এখন পরিস্থিতি খারাপ বলে মনে করেন বেসরকারি সংস্থা ইয়ুথ হেলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ওয়াইএইচডিও) প্রজেক্ট ম্যানেজার ইয়াসিন মোহাম্মাদি।

ইয়াসিন মোহাম্মাদি বলেন, গ্রামীণ এলাকা থেকে কিশোরেরা কাবুল ও হেরাতের মতো শহরে আসে পরিবারের হাল ধরতে। দেখা যায়, নিয়োগকারীদের হাতে যৌন নির্যাতনের স্বীকার হয় তারা, পরে অন্য নির্যাতনকারীদের কাছে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হয়। পুরুষ দ্বারা ছেলেশিশুদের এই যৌন নির্যাতনের বিষয়টি মাত্র এক বছর হয়েছে নিষিদ্ধ হয়েছে।

আফগান সরকারের শিশুবিষয়ক পরিচালক নাজিব আখলাকিও মনে করেন, শিশুদের অবস্থা বর্তমানে খুবই নাজুক। উন্নতির অগ্রগতি খুবই ধীরে। শিশুদের সাহায্যের জন্য জাতীয় ও দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করছেন তিনি। তবে এটাও সময়সাপেক্ষ বলে জানান।

দাতব্য সংস্থাগুলো আশা করছে, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী সরে যাওয়ার পরে হয়তো কিছুটা শান্তি আসবে এখানে। তবে তাঁরা এটাও আশঙ্কা করছেন যে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত যে কট্টর ইসলামপন্থী আইন ছিল, তা হয়তো আবার ফিরে আসবে। নতুন আফগান সরকারে তালেবানদের কী ভূমিকা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি।

আফগান চাইল্ড ফেডারেশন অ্যান্ড কেয়ার অর্গানাইজেশন অরফানেজের নির্বাহী পরিচালক পাশতানা রাসল বলেন, ‘তালেবানরা কখনো শিশুদের সমর্থন করেনি, কখনো মানুষকে সমর্থন দেয়নি। আমার ভয় হচ্ছে হয়তো এখনকার চেয়ে আরও খারাপ দিন আসছে।’

আট বছর বয়সে বাবাকে হারান রাসল। তালেবানরা তাঁকে হত্যা করে। রাসল আশঙ্কা করছেন, এখন যে এতিমখানাটা তিনি চালাচ্ছেন, তা হয়তো তালেবান–নিয়ন্ত্রিত সরকারের হাতে চলে যেতে পারে। এই এতিমখানায় মেয়ে শিশুদের শক্ত করে গড়ে তোলা হচ্ছে। রাসল বলেন, ‘আমরা চাই মেয়েদের অবস্থার উন্নতি হোক। তারা চিকিৎসক হোক, শিক্ষক হোক। তবে এটা নিশ্চিত যে তালেবান ও মৌলবাদীরা তা চায় না।’

আসলে ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযান শুরুর আগ পর্যন্ত আফগানিস্তান কখনোই এতটা অনিরাপদ ছিল না। যেমনটা এখন হয়েছে। ১৭ বছর আগে তালেবান শাসনের অবসানের আগ পর্যন্ত আফগানিস্তানের বেশির ভাগ স্থান তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তালেবান শাসনের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের যুদ্ধ ইতিমধ্যে মার্কিন ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। যদিও সম্প্রতি ১৭ বছর পর আফগান ছেড়ে দেওয়ার আগ্রহও জানিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

২০০১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তালেবান জঙ্গিরা আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে আসছে। গত তিন বছরে তালেবান বিদ্রোহীরা তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। দেশটির একটি বড় অংশ এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। ২০১৭ সালের এক জরিপে দেখা যায় আফগানিস্তানের ৬৬ শতাংশ এলাকায় তালেবান যোদ্ধাদের সরাসরি উপস্থিতি রয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন ও ন্যাটো–সমর্থিত আফগান সরকারও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। তথ্যসূত্র: প্রথমআলো।

More News Of This Category