1. editor@islaminews.com : editorpost :
  2. jashimsarkar@gmail.com : jassemadmin :
সফলতার গল্প :

রপ্তানী হচ্ছে কামারশালায় তৈরী কৃষি পন্য

বগুড়ার ফাউন্ড্রি কারখানায় দেশীয় কারিগরদের তৈরি সেচপাম্প ও হালকা প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বছরে প্রায় ৫০ হাজার সেচপাম্প ও অন্যান্য কৃষি যন্ত্রাংশ ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানে যাচ্ছে। প্রতিটি পাম্পের রপ্তানিমূল্য গড়ে ১৮ মার্কিন ডলার। টাকার অঙ্কে সেচপাম্প রপ্তানি থেকে আয়ের পরিমাণ বছরে প্রায় ৮ কোটি টাকা।

রপ্তানির শীর্ষে রয়েছে মিলটন ইঞ্জিনিয়ারিং, রনি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস, মাইশা এন্টারপ্রাইজ এবং আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস। উদ্যোক্তারা জানান, বগুড়ায় বর্তমানে ছোট-বড় প্রায় এক হাজার শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। বগুড়ায় স্থাপিত কারখানাগুলোর মধ্যে ৫০০টি কৃষি যন্ত্রাংশ, ৪৫০টি হালকা প্রকৌশল এবং ৪২টি ফাউন্ড্রিশিল্প রয়েছে।

প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এসব কারখানার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় দেড় লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। দেশের অভ্যন্তরে কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদার সিংহভাগ পূরণ হচ্ছে বগুড়ার এসব শিল্পকারখানা থেকে। কারখানাগুলো ঘিরে শহরের গোহাইল সড়ক ও স্টেশন সড়কে গড়ে উঠেছে কৃষি যন্ত্রাংশ ব্যবসার এক বড় বাজার।

যেভাবে তৈরি হয়: কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাটির নিচ থেকে পানি তোলার সেচপাম্প তৈরির অন্যতম কাঁচামাল পুরোনো ভাঙারি লোহা, জাহাজভাঙার লোহা, পিগ আয়রন, সিলিকন, হার্ড কোক ও ফার্নেস অয়েল। ঢালাই কারখানাগুলোতে পুরোনো লোহা ফার্নেসের মধ্যে ঢেলে দিয়ে ২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় গলানোর পর লোহা ও ফাউন্ড্রির সমন্বয়ে তৈরি হয় পানির পাম্প। পুরোনো লোহা বাদে অন্যান্য কাঁচামাল আসে ভারত, চীন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে।

বগুড়ার কৃষি যন্ত্রাংশ উদ্ভাবন এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পের শুরুটা চল্লিশের দশকে, কামারশালায় সারাইয়ের কাজে জড়িত কয়েকজন কারিগরের হাত ধরে। কোনো সুদূর চিন্তা থেকে নয়, বরং যন্ত্রাংশের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে কামারশালায় লোহা পিটিয়ে বিকল যন্ত্র সারাতেন তাঁরা। এভাবে লোহা পিটিয়ে যন্ত্রাংশ তৈরি করতে গিয়ে একের পর এক কৃষি ও হালকা যন্ত্রাংশ উদ্ভাবন করেন তাঁরা।

বগুড়ায় যে কারিগরদের হাত ধরে কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি ও উদ্ভাবন শুরু হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন শহরের কাটনার পাড়ার প্রয়াত কারিগর ধলু মিয়া, হক মেটাল ওয়ার্কশপের সামছুল হুদা, এস ইসলাম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের আনিছুর রহমান, গোহাইল সড়কের হবিবর রহমান প্রমুখ।শহরে তখনো বিদ্যুৎ না আসায় ধলু কারিগর উদ্ভাবন করেন হস্তচালিত লেদ। ১৯৭৮ সালে কাঠের কাঠামো দিয়ে প্রথম পানির সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প উদ্ভাবন করা হয়।

নব্বই দশক থেকে ধলু কারিগরের ছেলে মো. আমির হোসেন হালকা প্রকৌশল শিল্প থেকে উদ্ভাবন করেন চিকন সেমাই ও নুডলস তৈরি, ইট ও পাথর ভাঙা, মাছ ও মুরগির খাদ্য তৈরি, ধান, আখ, গম ও ভুট্টা ভাঙা ও মাড়াই, প্লাস্টিক পাইপ তৈরি, পামতেল তৈরি, পাটের ছাল ছাড়ানো, বিনোদন পার্কের রাইড, বীজ বপন যন্ত্র, খোয়া-সিমেন্ট-বালু মেশানো, বিস্কুট বানানো, আলু উত্তোলন, শুকনা ভুট্টাগাছ থেকে গোখাদ্য তৈরির অটো মেশিনসহ অর্ধশতাধিক যন্ত্র।

মো. আমির হোসেন জানান, সে সময় পাকিস্তানি ও জার্মানির তৈরি ধান ভাঙানোর যন্ত্র ব্যবহৃত হতো। ওই সব যন্ত্র বিকল হলে তা মেরামতের জন্য যেতে হতো কলকাতার যজ্ঞেশ্বর কোম্পানিতে। ধান ভাঙানোর যন্ত্র বিকল হলে কলকাতা ও ঢাকা থেকে আসতেন কারিগরেরা। তাঁরা বিকল যন্ত্রের ছোট ছোট যন্ত্রাংশ বানিয়ে নিতে আসতেন কামারশালায়। কামারেরা কারিগরদের নির্দেশমতো পিটিয়ে যন্ত্রাংশ সারাই করে দিতেন।

মূলত ষাটের দশকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে সেচযন্ত্র আসে। এসব সেচযন্ত্র বিকল হলে তা সারানো হতো কামারশালায়। সত্তর দশক থেকে কামারশালায় সেচযন্ত্রের ছোট ছোট যন্ত্রাংশ তৈরি শুরু হয়। এ সময় কয়েকজন কারিগরের হাত ধরে উদ্ভাবন হতে থাকে একের পর এক নানা কৃষি যন্ত্রাংশ। আশির দশকে এসে কৃষি যন্ত্রাংশের পাশাপাশি উদ্ভাবন হতে থাকে হালকা প্রকৌশল শিল্প।

পাম্পের বিদেশযাত্রা: বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সম্পাদক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মিলটন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজিজার রহমান বলেন, ১৯৯৫ সালে ভারতে নিচ থেকে পানি ওপরে তোলার সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প রপ্তানির মধ্য দিয়ে বিদেশের বাজারে প্রবেশ করে বগুড়ার কৃষিশিল্প।

এরপর ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানে টিউবওয়েল রপ্তানি হয় কয়েক বছর ধরে। এরপর নানা জটিলতায় সেন্টিফিউগাল পাম্প ও টিউবওয়েল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় এক দশক পর ২০১২ সালে আবার তা শুরু হয়। আজিজার রহমান বলেন, নানা সংকটে এই শিল্প টিকিয়ে রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাংকে তারল্যসংকটের কারণে এই শিল্পে ঋণ মিলছে না।

ফাউন্ড্রিশিল্পের অন্যতম কাঁচামাল পিগ আয়রন, সিলিকন, হার্ড কোক, কার্বন ব্লক, ফায়ার ব্রিকস, ম্যাঙ্গানিজ, ট্যালকম পাউডার, গ্রাফাইট পাউডার আমদানির ক্ষেত্রে আগে ৪ শতাংশ আগাম মূল্য সংযোজন কর (এটিভি) মওকুফ ছিল। এবারের বাজেটে ৪ শতাংশ এটিভির সঙ্গে আরও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর যোগ করা হয়েছে।

ফলে এদিকে কাঁচামাল আমদানি খরচ বাড়লেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে পণ্যের দাম খুব বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট আরোপ করা হলেও কৃষিপণ্য আমদানিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে। এটা দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করবে। তথ্যসূত্র: প্রথমআলো।

More News Of This Category