1. editor@islaminews.com : editorpost :
  2. jashimsarkar@gmail.com : jassemadmin :

কৃষকের পছন্দে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের অর্ধেক টাকা দেবে সরকার!

দেশের কৃষি ব্যবস্থায় যান্ত্রিকীকরণ প্রক্রিয়া অর্থনীতিতে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সেভাবে হয়নি। কারণ কৃষি যন্ত্রপাতির দাম অনেক, যা কৃষকের পক্ষে কেনা কষ্টসাধ্য। তাই প্রকল্পের আওতায় সারাদেশের কৃষকদের যন্ত্রপাতি দেবে সরকার। এজন্য তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।

ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, থ্রেসার, রিপার, কম্বাইন্ড হারভেস্টার কেনা হবে প্রকল্পের আওতায়। বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা বাদে দেশজুড়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পের আওতায় হাওর ও লবণাক্ত জেলায় ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হবে। অন্য জেলায় দেওয়া হবে ৫০ শতাংশ ভর্তুকি। কৃষক যেসব যন্ত্র পছন্দ করবে সেগুলোই দেওয়া হবে।

জোর করে কৃষি যন্ত্রপাতি চাপিয়ে দেওয়া হবে না। কৃষক গ্রুপের সদস্যরাই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। যাতে কেউ এই সুবিধা নিয়ে অন্যজনের কাছে কৃষিযন্ত্র বিক্রি করে না দিতে পারে সেজন্য কৃষি কার্ড রয়েছে এমন কৃষকেরাই কেবল ভর্তুকি পাবেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, একটি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ২৮ লাখ টাকা দাম হলে কৃষক দেবে ১৪ লাখ টাকা বাকি ১৪ লাখ টাকা সরকার পরিশোধ করবে। স্থানীয় কৃষি অফিসের মাধ্যমে কৃষকের নাম ঠিক করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় ৫০ হাজার কম্বাইন্ড হারভেস্টার দেওয়া হবে কৃষকদের। কম্বাইন্ড হারভেস্টারের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে ধান কাটা, মাড়াই, পরিষ্কার ও প্যাকেটজাত করা যায়। এর সঠিক ব্যবহারে একর প্রতি কৃষি উৎপাদন খরচ ৫ হাজার টাকা থেকে মাত্র দেড় হাজার টাকায় নামিয়ে আনা যায়। একটা কম্বাইন্ড হারভেস্টারের মাধ্যমে ৫০ থেকে ১০০ বিঘা জমিতে ধান কাটা ও মাড়াই করা সম্ভব।

ভুট্টা মাড়াইয়ের জন্য ১৫ হাজার মেইজ শেলার কেনা হবে। ধান রোপনের জন্য রাইস ট্রান্সপ্লাটরসহ আলু উত্তোলনের যন্ত্রপাতি ভর্তুকি মূল্যে পাবে কৃষকেরা। কৃষিতে যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি, ফসল সংগ্রহত্তোর অপচয় হ্রাস, শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য পেতে পারেন কৃষক।

তবে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা, সাধারণ কৃষকদের মধ্যে যন্ত্র ব্যবহারের প্রসারতা বৃদ্ধি না পাওয়া এবং ফসল চাষে যন্ত্রের ব্যবহারের সুবিধা সম্পর্কে প্রচারণা কম থাকাসহ নানা কারণে এখনও আধুনিক যন্ত্রনির্ভর হতে পারেনি কৃষি খাত। এজন্য ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার।

প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। প্রথমে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পের ব্যয় ২০০ কোটি টাকা কমিয়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রকল্পটি সংশোধন হয়ে পরিকল্পনা কমিশনে আসলে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি জুলাই ২০২০-২০২৫ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) প্রশান্ত কুমার চক্রবর্তী বলেন, কৃষি যন্ত্রপাতি কেনার প্রকল্প নিয়ে একবার সভা হয়েছে। ব্যয় কমানোসহ কিছু সংশোধনী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে আমাদের হাতে আসলে একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে। সরকারের উন্নয়ন বাজেটের আওতায় এটি বাস্তবায়ন করা হবে। সারাদেশের কৃষকদের ভর্তুকি মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি দেওয়া হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন মেয়াদে ‘খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি-দ্বিতীয় পর্যায়’ প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ছিল ৩৩৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। যন্ত্রপাতি ব্যবহারে শস্য সংগ্রহত্তোর অপচয় সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ কমেছে। তবে ২০১৯ সালের জুন মাসে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ফসল উৎপাদনের প্রস্তুতিপর্ব, কাটার আগে পরিচর্যা, কাটার সময় ও কাটার পরে ফসলের বেশি ক্ষতি হয়। কৃষি কাজের এসব স্তরে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের নিশ্চয়তার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। উৎপাদন ও শ্রম খরচ কমবে কৃষি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে।

ধান বীজ বোনার জন্য রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টারের প্রয়োজন দুই লাখ। এছাড়া ধান কাটার যন্ত্র রিপারের চাহিদা এক লাখ হলেও দেশে এ যন্ত্র রয়েছে পাঁচ হাজার। ধান বোনার জন্য পিটিও সিডার আছে মাত্র আড়াই হাজার। দেশে এ যন্ত্রের চাহিদা রয়েছে এক লাখ। প্রকল্পের আওতায় চাহিদা পূরণ করা হবে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইউ) ফার্ম পাওয়ার অ্যান্ড মেশিনারি বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জমি চাষে এখন প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি যান্ত্রিকীকরণের ছোঁয়া লাগলেও পিছিয়ে রয়েছে ট্রান্সপ্লান্টিং ও হারভেস্টিং। মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ জমিতে ট্রান্সপ্লান্টিং করতে ব্যবহার করা হচ্ছে যন্ত্রের। অন্যদিকে, মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ জমিতে হারভেস্টিং করতে ব্যবহার করা হচ্ছে যন্ত্রের। যন্ত্রের ব্যবহার না থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে কৃষক।

সূত্র জানায়, কৃষকের খরচ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে ট্রান্সপ্লান্টার ও হারভেস্টার মেশিন। ৪ সারিবিশিষ্ট রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের এক মেশিনেই ঘণ্টায় ২ দশমিক ৫ বিঘা জমিতে চারা রোপণ করা যায়। অন্যদিকে, জিপিএস প্রযুক্তি সুবিধা সম্পন্ন হারভেস্টার দিয়ে একই সঙ্গে প্রতি ঘণ্টায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ একর জমির ধান কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও বস্তাবন্দি করা যায়। হারভেস্টারের মাধ্যমে খরচের পরিমাণ ৭০-৮০ শতাংশ, সময় ৭০-৮২ শতাংশ বাঁচানো সম্ভব। কৃষির সব সম্ভাবনা কাজে লাগাতেই প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) শাহ মোহাম্মদ আকরামূল হক বলেন, সারাদেশে কৃষি যন্ত্রপাতি সম্প্রসারণ করার জন্য বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে সব থেকে বড় প্রকল্প। এটা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কৃষি অনেক উন্নত হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ছোঁয়া দেশব্যাপী ছড়িয়ে যাবে।

More News Of This Category