গবাদিপশুর বানিজ্যিক খামারে লুকায়িত সম্ভাবনা

কোনো সুদূর অতীতে যে গাঙ্গেয় এ বদ্বীপ অঞ্চলে গরু নামে ডাগর চোখের প্রাণীটির সঙ্গে এ দেশের মানুষের নিবিড় বন্ধনের সূচনা হয়েছিল, তা আজ নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারে না। সম্ভবত নব্য প্রস্তরযুগে পশ্চিম এশিয়ায় এবং ভারতবর্ষে সিন্ধু সভ্যতায় প্রথম এ বন্ধনের সূচনা হয়। কৃষিভিত্তিক সভ্যতার উন্মেষের সঙ্গে প্রাণিজ সম্পদকে মানুষের প্রথম ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন।

সুপ্রাচীনকালে হিমালয়ের পাদদেশে পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র, মেঘনার পললে আর প্রাণদায়ী দক্ষিণা বায়ুবর্ষণে এ অঞ্চলে জীবনসমৃদ্ধ প্রতিবেশের সূচনা হয়েছিল। আমাদের বাংলাদেশ শুধু মানব–ঘনত্বে সমৃদ্ধতম দেশ নয়, গবাদিপশুর ঘনত্বেও বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশে গরুর ঘনত্ব প্রতি বর্গমাইলে ৪৩৬টি, যা এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ভারতের তুলনায় প্রায় পৌনে তিন গুণ বেশি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণিসম্পদ ছাগলের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অবদান ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ হলেও এ খাতে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পরিমাণ ২০ শতাংশ, যা এ ক্ষেত্রে নিয়োজিত জনবলের নিম্ন উত্পাদনশীলতা তথা অতি নিম্ন আয়ের পরিচায়ক।

বাংলাদেশে গার্হস্থ্য চাহিদা মেটানোনির্ভর গো–সম্পদ পালন থেকে বাণিজ্যিক ফার্মিং শুরু হয়েছিল ১৯৪০–এর দশকে বৃহত্তর পাবনা অঞ্চলে। সমবায় পদ্ধতিতে এ প্রচেষ্টা ১৯৬০–এর দশকে কিছুটা উন্নত হলেও বস্তুত স্বাধীনতার পরপরই ভারতের ‘আমুলে’র আদলে সমবায়ভিত্তিক ‘মিল্ক ভিটা’ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়।

বর্তমানে মিল্ক ভিটা ছাড়াও জাতীয় পর্যায়ে কয়েকটি বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানি গড়ে উঠেছে। এ সময় থেকে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে মূলত শাহিওয়াল ও পরবর্তী সময়ে হলেস্টেইন ফ্রিজিয়ানের সঙ্গে দেশজ জাতের সংকর করে ডেইরি গরুর জাত উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। দেশে প্রথমবারের মতো মাংসের জন্য উপযুক্ত জাত উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে ২০১০ সাল থেকে।

ব্রাহমাসহ নানা জাতের বিফ জাত দেশের বিভিন্ন খামারে দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশজ বিখ্যাত জাতগুলো হচ্ছে পাবনা, ফরিদপুর, দিনাজপুর গ্রে, মিরকাদিম ও রেড চিটাগাং ক্যাটল। তার মধ্যে আট অঙ্গ লালবিশিষ্ট রেড চিটাগাং ক্যাটল বিশুদ্ধ দেশজ জাত, যা সৌন্দর্য ও দ্রুত বংশবিস্তারের জন্য খ্যাত।

বাণিজ্যিকভাবে গো–সম্পদ পালনের জন্য অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে সুলভে গোখাদ্য পাওয়া। দেশে সাইলেজসহ বাণিজ্যিকভাবে সবুজ ঘাস উত্পাদন, ইউরিয়া মোলাসেস প্রযুক্তিসহ নানা ধরনের উন্নত খাদ্য তৈরির প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়েছে। সামুদ্রিক শৈবাল গোখাদ্যের একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া গরুর জেনোম ম্যাপিং ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সম্পন্ন হওয়ায় এ থেকে জাত উন্নয়নে কীভাবে উপকৃত হওয়া যায়, তা–ও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। আমাদের দেশে গোচারণভূমির অভাব রয়েছে। এ সত্ত্বেও যেসব অঞ্চলে ঘাস উত্পাদনের সুযোগ রয়েছে এবং খড়ের সহজলভ্যতা রয়েছে, সে রকম বেশ কিছু অঞ্চলে বিখ্যাত কিছু ক্লাস্টার গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে ভাগ্যকূলে, সিরাজগঞ্জ-পাবনায়, তালার জোয়েলা, চট্টগ্রামের আনোয়ারা-পটিয়ার ডেইরি ব্যবসাগুচ্ছ অন্যতম।

গরু মোটাতাজাকরণের জন্য বিখ্যাত ক্লাস্টারের অন্যতম হচ্ছে সিঙ্গাইর, ধামরাই, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া ও দিনাজপুর। দেশের বিখ্যাত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল চামড়া, মাংস ও দ্রুত বংশবিস্তারের জন্য সুখ্যাত। এ ছাড়া দুধের জন্য বিখ্যাত হচ্ছে যমুনাপারি ছাগল। দেশের বিভিন্ন খামারে বর্তমানে গুজরি, তোতাপুরি, সামি, বারবারি, সুজাত, হরিয়ানা, বিটাল, সিরোহি, শ্যানন, আজমেরি ও পাসমিনা জাতের ছাগল পালনও শুরু হয়েছে।

মেষের মধ্যে গাড়ল বা ছোট নাগপুরি মেষের পালন শুরু হয়েছে। দেশের মহিষ উপযুক্ত খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা পেলে বিশালাকৃতি ধারণ করে। দেশে বর্তমানে সীমিত আকারে মোজারেলা পনির, মাখন তৈরি শুরু হয়েছে, যা দুধের চাহিদা বাড়িয়ে এ শিল্পকে প্রণোদনা দেওয়ায় অবদান রাখছে।আমাদের দেশের ‘জাত-উন্নয়ন’–সংক্রান্ত প্রটোকলগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন আবশ্যক।

গোবর্জ্যকে এখন অন্যতম একটি প্রধান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশে এখন কেঁচো সার উত্পাদনের প্রধান উপাদান গোবর, যা শাকসবজি উত্পাদনের জন্য এবং মাটির জৈব উপাদান বৃদ্ধিতে অত্যন্ত সহায়ক। সাফল্যের সঙ্গে গোমূত্র চূর্ণ উত্পাদন করে তা ফসল উত্পাদনে ব্যবহার করে অত্যন্ত ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে।

দেশে প্রতিদিন ২১৬ মিলিয়ন লিটার গোমূত্র উত্পাদিত হয়, তা গাজন করে বছরে প্রায় দুই মিলিয়ন টন ইউরিয়া সার উত্পন্ন সম্ভব। উল্লেখ্য, দেশের এ ক্ষেত্রে চাহিদা প্রায় তিন মিলিয়ন টন। এ ছাড়া গাজনকৃত গোমূত্র ও বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদের সমন্বয়ে উন্নত মানের জৈব বালাইনাশক উত্পাদন সম্ভব।

গোবর্জ্য সম্পদে পরিণত করে বাণিজ্যিকভাবে এসব কর্মকাণ্ড দেশে এ খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি জমির জৈব উপাদান ও মিনারেল বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়ে খাদ্যের পুষ্টিমান অনেক বাড়িয়ে দেবে। উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে একটি নীরব কেঁচো সার উত্পাদনের বিপ্লব চলছে। এ ছাড়া এ বিষয়ে ব্যবসাগুচ্ছকে ফাও–এর নির্দেশনা মোতাবেক ‘পরিচ্ছন্ন ফার্মিং’সহ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা (কৃমিমুক্তকরণ এবং টিকা প্রদান) প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া সীমিত আকারে কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক গো–বিমা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দেশের গো–সম্পদ উন্নয়নে, বিশেষ করে মাংসের জন্য কোরবানি ঈদনির্ভর মৌসুমি গরু মোটাতাজাকরণের স্থলে এখন সারা বছর গরু মোটাতাজাকরণের শিল্প গড়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে মাংসের কাটে বৈচিত্র্য ঘটাতে হবে। মাংসজাত পণ্য তৈরিতে অনেক দেশে ২৯ রকমের কাটের প্রচলন দেখা যায়।

এতে সার্বিকভাবে কৃষক বেশি দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন। মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠবে এবং ভোক্তারা বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রাণিজ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার পাবে। অর্থাৎ এ বিষয়ে যথাসম্ভব গো–সম্পদের বর্জ্যসহ প্রতিটি অংশে সর্বোচ্চ সম্ভব মূল্য সংযোজন করতে হবে। আমাদের বাণিজ্যিক গো–সম্পদ ফার্মিংয়ের জন্য উত্পাদিত পণ্যের বিপণনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

এ জন্য সুলভে খাদ্য, পরিচ্ছন্ন ফার্মিং, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, শনাক্তকরণের সঙ্গে নিরাপদ ও পুষ্টিকর গো–পণ্য বিশ্বমানের ব্র্যান্ডিং করতে হবে। আশার কথা, পিকেএসএফ, ডিএলএস, ব্রি এ ব্যাপারে সক্রিয় রয়েছে। আমাদের দেশেই হতে পারে বিশ্বমানের গো–সম্পদ, যা দেশজ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হবে। এ জন্য দরকার শুধু বর্তমান অব্যাহত চাহিদা বজায় রাখা এবং কৃষকের প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অর্থায়নসেবা বাড়ানো। ফজলুল কাদের বাংলাদেশ পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক তথ্যসূত্র: প্রথমআলো।

SHARE