1. uddoktarkhoje@gmail.com : uddoktarkhoje :

গরুর খামার গড়ে তুলে তাক লাগিয়ে দিয়েছে প্রতিবন্ধী রুহুল

নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গরুর খামার গড়ে তুলে তাক লাগিয়ে দিয়েছে প্রতিবন্ধী রুহুল। মাত্র দুই বছর আগে একটি গাভি দিয়ে শুরু করেছিলো সে। এরই মধ্যে সাফল্য দেখাতে পেরেছে সে। প্রতিদিন তার খামারে পাওয়া যাচ্ছে ২৫ লিটার দুধ। এরই মধ্যে ৪৪ হাজার টাকায় একটি পাঁচটি গরু বিক্রি করেছে।

এখন তার খামারে পাঁচটি গরু। তার এই কাজে একমাত্র সহযোগী তার স্ত্রী। কোনপ্রকার সরকারী-বেসরকারী সাহায্য সহযোগীতা ছাড়াই এখন তার গরুর খামার সম্প্রারিত করতে সক্ষম হয়েছে। রুহুল আমিনের বাড়ি মধুখালী উপজেলার মেগচামী ইউনিয়নের চর মেগচামী গ্রামে। ওই গ্রামের প্রবীণ কৃষক বিল্লাল হোসেন ও সামচুন্নাহারের জেষ্ঠ্য পুত্র।

জন্মের পর ছয়-সাত বছর বয়সে টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়। এরপর তার দু’পা পোলিও আক্রান্ত হয়। তারপর থেকে সে আর দাড়াতে পারেনি। তবে প্রতিবন্ধীতা তার চলার পথের প্রতিবন্ধক হতে পারেনি। অদম্য চেষ্টায় ঘুরে দাড়িয়েছে সে। রুহুল আমিন জানান, মাদ্রাসায় সামান্য পড়াশুনা করার পর একটি দোকান দিয়েছিলো সে। কিন্তু তাতে তেমন আয় রোজগার হতো না।

সাত বছর আগে ২০১১ সালে বিয়ে করেছিলো পাশের রাজবাড়ি জেলার জামালপুর ইউনিয়নের খামার মাগুড়া গ্রামের ঝর্ণা বেগমকে। সংসারের আয় রোজগার বাড়াতে সে নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে থাকে। স্ত্রীর পরামর্শে প্রথমে সে বাড়িতে একটি হাস-মুরগির খামার করে। তাতে তেমন সাফল্য না পেয়ে ঝুঁকেছিলো ছাগলের খামারের দিকে।

তাতেও তেমন লাভের মুখ দেখতে না পেয়ে দু’বছর আগে শুরু হয় তার গরুর খামারের পথচলা। কৃষি জমি বন্ধক রেখে বয়োবৃদ্ধ বাবা তার হাতে তুলে দিয়েছিলো ৮০ হাজার টাকা। সেই টাকার সাথে আরো কিছু টাকা জোগার করে ১লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে বাছুরসহ একটি ক্রস গাভী কিনে আনে রাজবাড়ির বালিয়াকান্দি উপজেলার নাড়–য়া গ্রামের একটি খামার হতে।

বাড়িতে ইট বিছানো সামান্য চালাতেই শুরু করেছিলো সেই গাভী ও বাছুরের প্রতিপালন। তার পরের বছর গাভী হতে একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গাভী বাছুর জন্ম নেয়। এভাবেই এগিয়ে চলতে থাকে তার খামারের পথচলা। এবছর তার সেই গাভীর পাশাপাশি দু’বছর আগে কেনা বাছুরের পেটেও জন্ম নেয় নতুন বাচ্চা। সবমিলিয়ে এখন তার খামারে গরু-বাছুরের সংখ্যা ৫টি।

এর মধ্যে দু’টি গাভী, দু’টি বকনা বাছুর ও একটি এড়ে বাছুর। রুহুল আমিন জানান, প্রতিটা গরুর প্রতিপালনে তার প্রতিদিন ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকা খরচ হয়। এর পাশাপাশি তাকে নানা সময়ে রোগ বালাই নিরসনে কিছু বাড়তি খরচ ব্যায় করতে হয়। পাশাপাশি এখন তিনি প্রতিদিন প্রায় ২৫ লিটার দুধ সংগ্রহ করতে পারেন। এসব দুধ বাজারে বিক্রি করে তার আয় হয় ১২শ’ টাকার মতো।

সবমিলিয়ে গরুর দুধ বিক্রি করে তার খামারের ও সংসারের খরচ মিটে যায়। আর বাছুর প্রতিপালন করে বাজারে বিক্রি করে এককালীন মোটা অংকের টাকা তাদের হাতে আসে। এরমধ্যে সে ৪৪ হাজার টাকা দিয়ে একটি এড়ে বাছুর বিক্রি করেছে। অবশ্য তারপর ৩৬ হাজার টাকা দিয়ে আরো একটি বকনা বাছুর সে কিনেছে। প্রায় ৭০ হাজার টাকা দিয়ে ইতিমধ্যে ১০টি গরু প্রতিপালনের উপযোগী একটি শেড নির্মাণ করেছে সে।

রুহুল আমিনের এই পথচলা মোটেও মসৃন ছিলো না। প্রতিদিন তাকে খেয়ে না খেয়ে গরু- বাছুরের জন্য খাবার সংগ্রহ করতে হয়েছে। পশুর টিকা ও চিকিৎসার জন্য নানা সমস্যাও পোহাতে হয়েছে। অবশ্য একাজে তাকে তার স্ত্রী ঝর্ণা বেগম দারুন সহায়তা করেছেন। মূলত: তারই সহায়তায় তিনি আজ তার খামটিকে এই পর্যন্ত আনতে সক্ষম হয়েছেন। রুহুল আমিন বলেন, আমি গরুর খাবার দিতে পারি না। শুধু ঘাস কাটতে পারি।

আর গরুর গোসল থেকে শুরু করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও খাবার দেয়ার কাজটা তার স্ত্রী ঝর্ণা বেগমই করেন। তার মানসিক প্রতিবন্ধী এক ছোট ভাইও গরুর ঘাস কাটার কাজে সহায়তা করে। রুহুল আমিনের গরুর খামারটি এখনো প্রাণী সম্পদ দফতরের রেজিষ্ট্রেশনভুক্ত হয়নি। তাই সরকারী কোন সহায়তা তিনি পাননা।

যেকোন সমস্যা মোকাবেলায় তাকে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই সমাধান করতে হয়। গরু-বাছুরের কোন রোগ হলে নিজের উদ্যোগেই ডাক্তার ও অন্যান্য ওষুধ, টিকা ও পরামর্শ সংগ্রহ করতে হয়। তবে তার আশা শিঘ্রই এ গরুর খামারটি প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের রেজিষ্ট্রেশন পাবে। প্রতিবন্ধী রুহুল আমিন তার গরুর খামারটির পরিসর বাড়াতে সরকারী সহায়তা আশা করছে।

তার ইচ্ছা, কৃষি ব্যাংক কিংবা কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে আপাতত দুই লাখ টাকার মতো ঋণ সহায়তা পেলে তিনি খামারের পরিসর বাড়াতে পারবেন। সংসারের স্বচ্ছলতার পাশাপাশি আত্ম কর্মসংস্থানে দৃষ্টান্ত গড়তে পারবেন তিনি। গরুর পাশাপাশি টারকি মুরগি প্রতিপালনেরও উদ্যোগ নিচ্ছেন তারা।

রুহুল আমিনের স্ত্রী ঝর্ণা বেগম বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে গরুর খামারটি এই পর্যন্ত আনতে পেরেছি। এখন সরকার যদি আমাদের খামারটি পরিদর্শন করে আর্থিক সহায়তা করে তবে আমরা খামারটি বাড়াতে পারবো। এব্যাপারে মধুখালী উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রিটিস কুমার দাস বলেন, খোঁজখবর নিয়ে দেখবো প্রয়োজনীয় সহায়তা করা যায় কিনা।

More News Of This Category