1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

গাভী পালনে বদল!

‘হঠাৎ করে ছেলেটি মায়ের বুকের দুধ পাচ্ছিল না। ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ি। স্ত্রী শিউলী উপায়ন্তর না পেয়ে একটি গাভী কেনার জন্য বায়না ধরে। কিন্তু গাভী কিনতে হলেও তো অনেক টাকার প্রয়োজন। যেখানে নিজেরা ঠিক মতো ভাত খেতে পারি না সেখানে এত টাকা যোগাড় করব কিভাবে। স্ত্রীর দাবি পূরণ করতে একটি এনজিও থেকে ১৫ হাজার ঋণ নেই এবং প্রতিবেশীর কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা ধার নিয়ে একটি দেশি দুধের গাভী কিনি। এরপর থেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু আমাদের। এখন আমি পরিবার নিয়ে আছি দুধে-ভাতে।’

রফিকুল ইসলাম যখন কষ্টের দিনগুলোর কথা বলছিলেন, এসময় স্ত্রী শিউলী আক্তারও তার কষ্টের টুকরো স্মৃতি মাঝে-মধ্যেই আওড়াচ্ছিলেন।কয়েক বছর আগেও এমন হয়েছে যে, দিন কেটেছে না খেয়ে। অর্থাৎ মানবেতর দিন কাটছিল ওদের। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই বিয়ে করান বাবা-মা।। বিয়ের কয়েক বছর যেতেই পরিবার থেকে আলাদা করে দেন।

পাট কাঠির বেড়া দেওয়া দুই চালার টিনের ঘরে শুরু হয় স্বামী-স্ত্রীর আলাদা সংসার। দু’ মুঠো ভাত জোটাতে শুরু হয় কামলা দেওয়া। এর মাঝেই জন্ম নেয় ফুটফুটে একটি পুত্র সন্তান। কষ্ট বেড়ে যায় আরো। আর এই কষ্টের মধ্যেই স্বাচ্ছন্দে বাঁচার উপায় খুঁজে পান রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার ইকরচর গ্রামের রফিকুল ইসলাম।

একজন সফল দুগ্ধ খামারি হিসেবে এরই মাঝে তার নাম এখন সবার জানা। রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘না খেয়ে থাকার কষ্ট কতটা ভয়ংকর তা আমি উপলব্ধি করেছি। স্ত্রীর উৎসাহকে কাজে লাগিয়ে আজ আমি স্বাবলম্বী। এরই মাঝে আমি প্রায় ৩০টি গরু বিক্রি করেছি। যার আনুমানিক মূল্য ২৫ লক্ষ টাকা। বর্তমানে আমার ৬টি গাভী থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬০-৭০ লিটার দুধ পাচ্ছি।

যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে৩ হাজার টাকা। খামারে বর্তমানে ৬টি ফ্রিজিয়ান গাভী এবং ৫টি বাছুর রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘গরুগুলোর খাবার এবং অন্যান্য খরচ বাবদ প্রতিদিন আনুমানিক আড়াই হাজার টাকার মত খরচ হয়। বাকি টাকা সঞ্চয় হিসেবে থেকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সাড়ে ৩ বিঘা জমি কিনে সেখানে নেপিয়ার ঘাস চাষ করছি’

শিউলী আক্তার বলেন, ‘স্বামীর সংসারে আসার পর থেকেই ৮টি বছর অনেক কষ্ট করেছি। আল্লাহ আমাদের দিকে মুখ ফিরে তাকিয়েছেন। এখন আমি আমার দুই পুত্র ও স্বামীকে নিয়ে বেশ সুখেই আছি। বড় ছেলে মো: তরিকুল ইসলাম (শিমুল) বালিয়াকান্দি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছোট ছেলে তৌহিদুল ইসলাম (সিজান) বেতাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ছে। এখন একটাই স্বপ্ন সন্তান দু’টোকে মানুষ করা।’

শিউলী আক্তার বলেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখতাম, বিশ্বাস করতাম-একদিন আমাদের সংসারে অভাব থাকবে না। আজ সে স্বপ্ন ও বিশ্বাস হাতের মুঠায় ধরা দিয়েছে। আমাদের খামারে এখন ৬ টি ফ্রিজিয়ান জাতের গাভী ও ৫টি বাছুর রয়েছে। এছাড়াও ১০টি বিদেশি ছাগল রয়েছে। পাশাপাশি হাঁস-মুরগীও পালন করছি। এগুলো দেখাশোনা আমরা নিজেরাই করি। এরই মাঝে একজন সফল নারীর স্বীকৃতি হিসেবে আমাকে জয়িতা নারীর পদক দিয়েছে সরকার।’

উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসের ক্রেডিট সুপারভাইজার এসএম মো: খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘সফল এই খামারি তার খামার আরও সম্প্রসারণে যুব উন্নয়নে ঋণের আবেদন করেছেন। আমি সরেজমিনে খামারটি পরিদর্শন করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে রফিক ও শিউলী দম্পতি দেশের বেকারদের কাছে রোল মডেল হতে পারে।’

বালিয়াকান্দি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: মো: মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘শিউলী আক্তার অনেক পরিশ্রমী। আমি তাদের বাড়িতে অনেকবার গিয়েছি। তার সফলতায় আমি মুগ্ধ। আমার দপ্তর থেকে যতটা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায় আমি দিয়ে থাকি। এ ধরনের সফলতা দেখে এলাকার অনেকেই এগিয়ে আসবে এবং নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’

তথ্যসুত্র: ইন্টারনেট।

More News Of This Category