ঘরে ঘরে গ্যাস বোমা

চট্টগ্রামসহ সারাদেশে সিলিন্ডার গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। আহত হয়েছেন অনেক মানুষ। কেবল সিলিন্ডার গ্যাস নয়, প্রাকৃতিক গ্যাসের লাইন বিস্ফোরণের ঘটনাতেও হতাহত বাড়ছে। গেলো দু’মাসে শুধু চট্টগ্রামেই গ্যাস লাইন ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মারা গেছে ৫ জন।

এক সময় রান্নাঘরে লাকড়ী ও কেরোসিনের চুলার ব্যবহার থাকলেও আধুনিক এ যুগে রান্নাঘরে গ্যাসের চুলার ব্যবহার বেড়েছে। লাইনের গ্যাস ব্যবহারের পাশাপাশি সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে সমানতালে। কেবল শহর নয় গ্রামগঞ্জেও এখন গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার বেড়েছে। এলপি গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের তথ্যমতে, সারাদেশে বছরে ৪ লাখ টন এলপি গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

নতুন করে চুলা জ্বালাতে কেবল একটি কাঠি নষ্ট হবে বলে অধিকাংশ গৃহিনী সারারাত গ্যাসের লাইন জ্বেলে রাখেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের অসচেতনা থেকেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা হয়েছে অসংখ্য। কিন্তু অধিকাংশ ব্যবহারকারী এখনো এ ব্যাপারে সচেতন না। এদিকে, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না অনেকেই। একইসঙ্গে, এ সিলিন্ডার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত খুচরা ব্যবসায়ীরাও বেশিরভাগ অনভিজ্ঞ।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় গ্যাসসংক্রান্ত যত দুর্ঘটনা ঘটেছে বেশিরভাগই অসচেতনতার অভাবে হয়েছে। আর একেকটি দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় অমূল্য প্রাণ। গ্যাস ব্যবহারে একটু সচেতন হলেই প্রাণহানীর মতো দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর দেওয়ান বাজারের একটি ভবনে গ্যাস লাইনের বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে মারা যান এসএসসি পরীক্ষার্থী তনিমা আফরিন ইপ্তি এবং তার দাদি ছমুদা খাতুন। এ ঘটনায় আহত হন আরো দু’জন। তদন্তে বেরিয়ে আসে রাতে চুলা জ্বালিয়ে বন্ধ করা হয়নি। শীতের গভীর রাতে পানি গরম করতে ওঠেন ইপ্তি। দরজা জানালা বন্ধ থাকায় দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালাতেই পুরো ঘরে আগুন লেগে যায়। বিস্ফোরণে ঘরের দরজা জানালাসহ ভবনের দেয়ালও উড়ে যায়।

১৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী বড়ুয়া গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মারা যান শাশুড়ী উষা বড়ুয়া এবং ছেলের বউ শান্তা বড়ুয়া। অসতর্কতার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে। ২৫ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার লালবাগে একটি মিষ্টির দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আহত হন ৯ জন। এর মধ্যে ৭ জনের অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক। ২৬ ফেব্রুয়ারি মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানার বারিয়াখালীতে রান্নঘরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হন আনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি।

৫ মার্চ চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানার বন্দরটিলা এলাকায় গ্যাস লাইনের বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ হন পোশাক শ্রমিক মোহাম্মদ রাজু ও তার এক বছরের ঐশি। মোহাম্মদ রাজু বেঁচে গেলেও মারা যায় শিশু ঐশি। সব ঘটনার তদন্তে বেরিয়ে আসে অসতর্কতাই এসব দূর্ঘটনার মূল কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ব্যবহার অনুপযোগী গ্যাস সিলিন্ডারও এজন্য দায়ী।

গ্যাস সিলিন্ডার বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি সংস্থা এলপি গ্যাস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার ফজলুর রহমান খান আরটিভি অনলাইনকে জানান, দেশে বছরে সিলিন্ডারে ৪ লাখ টন গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ২০ হাজার টন গ্যাস কেবল এলপি গ্যাস লিমিটেড সরবরাহ করে। বাকি চাহিদা পূরণ করে প্রাইভেট কোম্পানি বসুন্ধরা, টিকে, ওমায়রা, এসএসএলসহ বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানি।

ইউরোপ, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভারত, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আনা সিলিন্ডারগুলোর গায়ে মেয়াদ লেখা থাকে ১৫ বছর। দুর্ঘটনা এড়াতে ব্যবহারকারীরা মেয়াদ দেখে সিলিন্ডার ব্যবহার করতে পারেন। চট্টগ্রাম বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারি পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, খুচরা ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা ও ব্যবহারকারীদের সচেতনতার অভাবেই মরণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, অনেক অসাধু ব্যবসায়ী সাড়ে ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার থেকে গ্যাস চুরি করে।

এক্ষেত্রে সিলিন্ডারের নব ঢিলা হয়। নব ঢিলা হওয়া গ্যাস সিলিন্ডার গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা হয়। গ্রাহক অসচেতনভাবে এ সিলিন্ডার ব্যবহার করতে গেলে দুর্ঘটনার শিকার হন। নব ঢিলা কিংবা সিলিন্ডার থেকে গ্যাস লিক হলে ওই জায়গায় বরফ জমে যায় জানিয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে ব্যবহারকারী সচেতন হলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

দুর্ঘটনা এড়ানোর পরামর্শ হিসেবে তোফাজ্জল হোসেন আরো বলেন, লাইনের গ্যাস ও সিলিন্ডার গ্যাসের চুলা জ্বালানোর আগেই রান্নাঘরের দরজা জানালা অবশ্যই খুলে দিতে হবে। বাইরে থেকে আসার সঙ্গে সঙ্গে চুলা না জ্বালিয়ে ঘরের দরজা জানালা খুলে দিতে হবে। রান্না শেষে চুলা বন্ধ করা হয়েছে কিনা তা ভাল করে দেখতে হবে। লাইনে কিংবা সিলিন্ডারে গ্যাস লিক করছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। তাহলেই এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। তথ্যসূত্র: আরটিভি অনলাইন।

SHARE