1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

চমৎকার সব ব্যবসার আইডিয়া যা সর্বাবস্থায় চলবে ও লাভজনক!

করোনাভাইরাস নিঃসন্দেহে ব্যবসার পক্ষে খারাপ। বন্ধ হয়ে গেছে অনেকের আয়-রোজগারের পথ। সম্ভবত গুটিকয়েক ব্যবসা চিরতরে পরিবর্তিত হতে চলেছে। কিন্তু করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতেও কিছু ব্যবসায় খুলেছে সম্ভাবনার দুয়ার। অনেক খাতের জন্য আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে এসেছে মহামারী এই ভাইরাস। চলুন দেখে নিই, করোনার দুর্যোগেও যেসব ব্যবসার বাজার ভালো।

করোনা-পরবর্তী সময়ের পরিবর্তন: করোনা বদলে দিয়েছে বিশ্ব পরিস্থিতি। চাকরি হারিয়ে অনেকে বেকার জীবনযাপন করছেন। কিন্তু কতদিন চলবে এমন পরিস্থিতি? এর উত্তর কারও জানা না থাকলেও হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউর মে-২০২০ সংখ্যা জানাচ্ছে, করোনাভাইরাস-পরবর্তী সময় বৈশ্বিক পেশায় বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আসবে। সেই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারলে পেশাজীবনে কোনো ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হবে না।

অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যতের কথা গুরুত্ব দিয়েই নিজেকে তৈরি করতে হবে, জলদি। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, সামনের দিনগুলোয় কর্মীদের কাজে ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা থাকবে। তবে একজন কর্মীকে দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী হতে হবে। কর্মীদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কৌশলী হয়ে উঠতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পেশায় আটকে না রেখে অনিশ্চয়তাকে বাস্তবতা ভেবে সেভাবে নিজেকে তৈরি করতে হবে দ্রুত।

পেশাগত জীবনে নানা সময় নানা কারণে পরিবর্তন আসতে পারে। করোনা-পরবর্তী সময় যদি কোনো পরিবর্তন আসে, তবে কোন কাজটি করতে হবে বা কী করা উচিত, তা আগে থেকে অনুধাবন করা শিখতে হবে। প্রয়োজনে অনলাইন থেকে তথ্য নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সামনে কী হচ্ছে, কী হবে, সে সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। সামান্য সময়ের জন্য হয়তোবা স্থবিরতা দেখা যেতে পারে। সে সময় পরবর্তী সময়ের জন্য নিজেকে তৈরি করতে হবে। কোনোভাবেই নৈতিক ও মানসিক অবস্থানকে দুর্বল করা চলবে না।

করোনাকালীন নিজেকে নতুন নতুন কাজে সংযুক্ত করার চেষ্টা করুন। অনলাইন নেটওয়ার্কিং সাইট লিংকডইনসহ অন্য পেশাজীবীদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিজের দক্ষতাগুলো প্রকাশ করুন। সামনের সময়ের জন্য নতুন কিছু শিখতে পারেন এখনই। এক জরিপে দেখা গেছে, ১৬ শতাংশ নিয়োগকর্তা কর্মীদের ভার্চুয়াল দক্ষতা যেমন- কম্পিউটারের ব্যবহার, ই-মেইল বা অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ পদ্ধতিগুলো পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। তাই ভবিষ্যতের পেশার ক্ষেত্রে প্রতিটি কর্মীকে অবশ্যই ইন্টারনেট ওয়ার্কিং সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে।

যেহেতু এখন একটি পরিবর্তিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা, এ সময় আপনার নেটওয়ার্কের যে সুপ্ত সংযোগগুলো আছে, যাদের সঙ্গে অনেক দিন যোগাযোগ নেই বা ভিন্ন কোনো পেশার ব্যক্তি আছেন, তাদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কগুলো পুনরায় সক্রিয় করুন। ফোন করতে পারেন, ই-মেইলে যোগাযোগ স্থাপন করুন।

আপনার বিপদের কথা, ঝুঁকির কথা সুযোগ বুঝে তাদের জানানোর চেষ্টা করুন। নিজেকে যতটা সম্ভব উন্মুক্তভাবে সেসব সংযোগ স্থাপন করে তাদের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি করুন। যে কোনো সংকটকালীন পরিস্থিতির পর নতুন সুযোগ, নতুন উদ্যোগের সম্ভাবনা তৈরি করে। সংকটকালের মধ্যেই আসলে পেশাজীবীদের মাঝে হতাশা তৈরি হয়। উদ্দেশ্যহীনতায় আমাদের মাঝে যেন হতাশা তৈরি না হয়, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।

পরিচ্ছন্নতা প্রতিষ্ঠান: কভিড-১৯ মহামারীতে রূপ নেওয়ার আগে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিকে কেউ গুরুত্বের সঙ্গে দেখত না। তবে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় পরিচ্ছন্নতায় তোড়জোড় বেড়েছে সবার মাঝে। আর তাতে দিন যত যাচ্ছে পরিচ্ছন্নকর্মী এবং পরিচ্ছন্ন সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কদর বাড়ছে। পরিচ্ছন্নকর্মীরা তাদের গ্রাহকদের বাসাবাড়িই শুধু নয়, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকেও করে তোলে জীবাণুমুক্ত।

উদাহরণস্বরূপ- অফিস বা বাসাবাড়ির স্কেলেটর, হ্যান্ডরেলিং, দরজার হ্যান্ডল, লিফট বোতাম এবং সুইচগুলো জীবাণুমুক্ত করা। চাকরি-সংক্রান্ত ওয়েবসাইটগুলোয় ইতিমধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেখা যাচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে ওয়েদারস্পুনস ও লেডব্রোকস ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কলম্বাস ক্লিনিং সলিউশন এবং ওহাই ক্লিনিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ‘করোনাভাইরাসের কারণে পরিচ্ছন্নতার চাহিদা সত্যিই ভীষণ বেড়ে গেছে।

চাহিদা মেটাতে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী হলেও এই ব্যবসার জন্য আশীর্বাদ।’ কলম্বাস ক্লিনিং সলিউশনের সহ-মালিক ক্রিস্টাল হুগে বলেন, ‘আমাদের জীবনে এর আগে কখনো এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। বিশেষ করে আমাদের ব্যবসায় তো একদমই নয়! বর্তমানে আমাদের কোম্পানিতে প্রচুর লোক কাজ করছে।’ ইউনস্টার স্টার ক্লিনিং সার্ভিস তাদের ব্যবসায় পরিধি এতটাই বাড়িয়েছে যে, তারা অনেক নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে।

অ্যাপ ও গেমস: করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করেছে। করোনা মহামারীতে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় শিশু-কিশোরদের থাকতে হচ্ছে গৃহবন্দী। এই শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ আর বিনোদনের জন্য বাবা-মাকে সাহায্য নিতে হয়েছে অ্যাপ ও গেমসের। তাতে করোনাকাল হয়ে ওঠে অনলাইন অ্যাপ ও গেমস ব্যবসায়ীদের জন্য পৌষমাস।

শিশুদের কোডিং শেখানো অনলাইন প্ল্যাটফরম ‘হোয়াইটহ্যাট জুনিয়র’। করোনাভাইরাস মহামারীতে পরিণত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে অনলাইনটি চালু হয়েছিল। আর লকডাউনের সময় তাদের প্রবৃদ্ধি রেকর্ডসংখ্যক বৃদ্ধি পায়। ‘হোয়াইটহ্যাট জুনিয়র’-এর প্রধান নির্বাহী করন বাজাজ বলেন, ‘স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় আমাদের ব্যবসা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ শিক্ষার্থী অ্যাপটি ব্যবহার করে।’

একইভাবে ‘স্কিল ফর স্কুল’ বা ‘শেয়ারজোন’-এর মতো অ্যাপের দর্শকও বৃদ্ধি পায় রকেটগতিতে। ‘শেয়ারজোন’-এর নিলস সায়েকার্ট বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগেও প্রতিদিন নতুন গ্রাহক বৃদ্ধি পেত ৩০০ থেকে ৫০০ জন। কিন্তু করোনাকালে তার পরিমাণ বৃদ্ধি পায় প্রায় পাঁচ থেকে ছয় গুণ হারে।’ ‘গুড গেমস’-এর স্টোর ম্যানেজার ক্রেগ মার্নি বলেন, ‘গেমস ও ধাঁধা বিক্রি হচ্ছে বেশ, বিশেষ করে সময়োপযোগী গেমস প্যান্ডেমিক।’ যতদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকবে ততদিন তাদের গ্রাহকও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করছেন অনেক গেমস নির্মিতা প্রতিষ্ঠান।

মেডিকেল ব্যবসা: করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সারা বিশ্বেই মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবসা এখন তুঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের দেশগুলোতে মাস্ক রপ্তানি করে একচেটিয়া ব্যবসা করছে চীন। বিশেষ কার্গো বিমানে চীন থেকে ফেস মাস্ক নিয়েছে ফ্রান্স। ইউরোপের দেশ ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালও চীন থেকে জরুরি মেডিকেল সামগ্রী আমদানি করেছে। অর্থাৎ করোনাকে ব্যবসার নতুন সুযোগ হিসেবে লুফে নিয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদক ও সরবরাহকারী দেশ চীন।

শুধু মাস্ক বা স্যানিটাইজারই নয়, বরং তারা চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই), মেডিকেল প্রোটেকটিভ গগলস, মেডিকেল প্রোটেকটিভ ফেস শিল্ড, মেডিকেল প্রোটেকটিভ স্যুট, মেডিকেল বুট কভার, ইনফিউশন পাম্প, ব্যাকপ্যাক ডিসইনফ্যাকট্যান্ট ¯েপ্রয়ার, হ্যান্ড-হেল্ড আইআর থার্মোমিটার, থার্মাল ইমেজিং টেম্পারেচার, করোনা টেস্টিং কিট ও কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেওয়ার মেশিন ভেন্টিলেটরও সারা বিশ্বে সরবরাহ করছে, মানে ব্যবসা করছে।

অনেকে মনে করেন, করোনার মহামারীকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে চীন বাণিজ্য করছে। অনেকে ধারণা করেন, করোনাভাইরাসকে পুঁজি করে চীন বিশ্বজুড়ে ব্যবসা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও এ দাবি করা হয়েছে যে, চীন থেকে ছড়িয়েছে করোনাভাইরাস। আর এ ভাইরাসকে পুঁজি করে চীন ব্যবসা শুরু করেছে।

পড়ার বই: অন্যান্য সময়ের চেয়ে করোনাকালে মানুষ বই কিনছে বেশি। লকডাউনে অনেকে বই পড়ে অলস সময় পার করছেন। আর কাল্পনিক কল্পকাহিনির বইগুলোর কদর ছিল সব সময়ই। বর্তমানেও মহামারীর কাল্পনিক বিবরণগুলোর বেশি চাহিদা। যুক্তরাজ্যে গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বইয়ের নাম ডিন কুনটজের দ্য আইস অব ডার্কনেস। চীনের উহানের এক ভাইরাসের বর্ণনা আছে বইটিতে। আরেকটি বই অনেক বেশি বিক্রি হচ্ছে, তা হলো আলবার্ট ক্যামাসের দ্য প্লেগ।

অনলাইন মুভি স্ট্রিমিং: করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে লোকজনকে ঘরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আর ঘরে বসে অলস সময় পার করার জন্য অনলাইন মুভি স্ট্রিমিং সাইটগুলো দিচ্ছে নানা অফার। পাশাপাশি সাইটগুলোকে দর্শকদের এনেছে মুভি আর সিরিজের সমাহার। এ সময় নেটফিক্স, জি ফাইভ, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও-র মতো অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং সেবা মানুষের সঙ্গী হয়ে উঠছে। তবে বিগত কয়েক সপ্তাহে অনলাইন স্ট্রিমিংগুলোর মধ্যে নেটফিক্সের শক্তিশালী অবস্থান দেখা গেছে।

ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র: করোনাকালে ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রের দিকে ঝুঁকছে অসংখ্য মানুষ। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেক ইলেকট্রনিক্স পণ্যের কোম্পানি গ্রাহকদের দিচ্ছে বিশেষ ছাড়! ঘরে খাবার সংগ্রহের জন্য ফ্রিজ কিনছে অনেক বেশি। গরমের কারণে বেড়েছে এয়ারকুলার বা এসির বেচাকেনাও। সেই সঙ্গে ঘরে বসে অনলাইনে কাজ করার জন্য ল্যাপটপও অর্ডার করছে অনলাইনে। এ ছাড়া বাসায় সোফায় কাজ করার পরিবর্তে মানুষের অফিসের বিভিন্ন সরঞ্জামও অর্ডার করছে অনলাইনে।

ইজিবাইক ও বাইসাইকেল: করোনাভাইরাস সংক্রমণের আতঙ্কে অনেকেই এখন গণপরিবহন এড়িয়ে চলেন। তবে যাতায়াতের বিকল্প হিসেবে একটি ব্যবস্থা তো রাখতেই হয়! আর সে জন্যই বেড়েছে ইজিবাইক ও বাইসাইকেলের বেচাকেনা। লন্ডনের সাইকেল স্টোরগুলো অন্যান্য সময়ের চেয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। বিক্রি বেড়েছে শতকরা ১৫ ভাগ। মানুষ গণপরিবহন এড়াতে নিজের সুবিধার জন্য সাইকেল ব্যবহার করছে আগের চেয়ে বেশি। সেই সঙ্গে বেড়েছে ব্যায়াম করার বাইকের সংখ্যাও।

ইনডোর-আউটডোর গেমস: লকডাউনে বেড়েছে ইনডোর-আউটডোর গেমসের বিকিকিনি। দাবা, লুডু, মনোপলি ইত্যাদির মতো ব্যাডমিন্টন, টেনিস ও টেবিল টেনিসও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গেমস সরবরাহকারী অ্যান্ডি বেরেসে ফোর্ড জানান, তার স্টকে যেসব টেবিল টেনিসের টেবিল ছিল তার সব বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমি গত সপ্তাহে ১২৪টি টেবিল বিক্রি করেছি, যা গেল বছর এ সময়ে ছিল মাত্র ১৫টা। তবে স্কুল-কলেজ বন্ধের পর অর্ডার নেওয়া বন্ধ হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্য-সুরক্ষাসামগ্রী: গত কয়েক মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাইরে যে পণ্যটির চাহিদা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে তা হচ্ছে সুরক্ষাসামগ্রী। মাস্ক, জীবাণুনাশক, স্যানেটারি ওয়াইপসের মতো পণ্যের চাহিদা এতটা বেড়ে গেছে যে, কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হওয়ার পরও সব দেশে এসব পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এসব পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলোর ব্যবসা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে। বিশ্বের অনেক দেশ করোনায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী রপ্তানি করে আসছে।

ডেলিভারি সার্ভিস

করোনাকালে অনলাইন কেনাকাটা অনেক বেড়ে যায়। লকডাউনের সময় যখন রেস্তোরাঁসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ, করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে যখন লোকের বাড়িতে সাহায্যকারীও আসছে না, সে সময় সকালের নাশতার রুটি, বিকালের নাশতার নানা আইটেমের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। যার ফলে খাদ্য এবং খুচরা পণ্য সরবরাহ (ডেলিভারি করা) পরিষেবা প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি সুবিধা লাভ করে।

ইতিমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান সংকটকালের চাহিদা পূরণে নতুন ডেলিভারি কর্মী নিয়োগ দেয়। করোনাকালে আমাজন প্রায় দেড় হাজার ডেলিভারি কর্মী নিয়োগ দেয়। তারা ডেলিভারি নেটওয়ার্ক ও প্রধান কার্যালয়ে পূর্ণকালীন কাজ করবে। আর গ্রাহকদের বাড়িতে পণ্য পৌঁছে দিতে ৯ হাজার ফ্রিল্যান্স কুরিয়ার নিয়োগ দেবে হার্মস।

গ্রুবুথ ও আলাবামার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো করোনাকালে নতুন সম্ভাবনা দেখছে। গ্রুবুথের ব্যবসায়িক উন্নয়ন পরিচালক ম্যাডলিন স্যান্ডলিন বলেন, ‘করোনাভাইরাস আমাদের ব্যবসার নতুন দিক উন্মোচন করেছে। ইতিমধ্যে আমরা ভোক্তার চাহিদা পূরণে নতুন ডেলিভারি কর্মী নিয়োগ দিয়েছি। শুধু তাই নয়, আমাদের অনলাইন প্ল্যাটফরমে আরও অনেক নতুন রেস্তোরাঁও যুক্ত হয়েছে।’

লরি ড্রাইভার: করোনাভাইরাসের কারণে মানুষ যখন গৃহবন্দী, তখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ে, কিন্তু সংক্রমণের ভয়ে কেউ বাড়ির বাইরে বের হতে চাইছিলেন না। ফলে প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য অনেকেই কুরিয়ার সার্ভিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ই-কমার্স সাইট, অনলাইন স্টোর বা ছোট উদ্যোক্তারা নিজস্ব কর্মী বা অ্যাপভিত্তিক পার্সেল পরিষেবার মাধ্যমে পণ্যসামগ্রী গ্রাহকদের দোরগোড়ায় সরবরাহ করছে। কুরিয়ার এবং পার্সেল পরিষেবাগুলো অন্যান্য ব্যবসার মতো মহামারীর কবলে পড়েনি। কারণ, এটি একমাত্র ব্যবসা যা বিশ্বজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন পণ্য সরবরাহ করার মূল চাবিকাঠি।

তাই করোনাকালেও বিশ্বজুড়ে কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যস্ততা ছিল বহুগুণ বেশি। অদ্ভুত শোনালেও করোনাকালে কুরিয়ার পণ্যবাহী বড় গাড়ি (এলজিভি) বা লরির চালকের চাহিদা বেড়ে গেছে, যুক্তরাজ্যের রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট কনফেডারেশনের (আরইসি) জরিপে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমাজনের গুদাম থেকে একেকটি বিক্রয় কেন্দ্রে প্রতিদিনই অতিরিক্ত পণ্য সড়কপথে পৌঁছে দেওয়া হয়। তাতে করে নতুন নতুন লরি কিংবা এর জন্য চালকের প্রয়োজন পড়ছেই!

প্রযুক্তি খাতে সম্ভাবনা: স্বাভাবিক জীবনযাপনেই আমরা ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। আর করোনা সংক্রমণের সময় অধিকাংশ মানুষই ঘরে থাকছেন, ঘরে থেকে কাজ করতে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। লকডাউনে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে বিশ্বের কোথাও কোথাও মানুষকে ফ্রি ইন্টারনেট সার্ভিসও দেওয়া হচ্ছে।

ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির সুবিধা এটিই যে, এসব কোনো সময় কিংবা দেশের সীমানা মানে না। ঠিক এ কারণেই করোনাকালে দেশি-বিদেশি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে ওয়েব ডেভেলপার, অনলাইন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ পদের চাহিদা বেড়ে গেছে অনেক। কারণ ই-কমার্স থেকে অটোমোবাইল- সব শিল্পকারখানা কিংবা ব্যবসায় বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

দিন দিন সেটি আরও বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট কনফেডারেশনের (আরইসি) প্রধান নির্বাহী নিল কারবেরি বলেন, ‘আমরা দেখছি আইটি প্রফেশনালস ও ডিজাইনারদের কাজের পরিধি বাড়ছে, যা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। তাতে অবশ্য পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ বেশ কিছুটা বাড়বে।’

টেলিমেডিসিন সেবা: মহামারীর সময় চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সংক্রমণভীতি। হাসপাতাল বা চিকিৎসকের চেম্বারে ঝুঁকি বেশি- এই বিবেচনায় রোগীদের অনেকেই এসব স্থানে যেতে চাচ্ছেন না। কিন্তু চিকিৎসা তো দরকার! তাই তো করোনাকালে চিকিৎসা ক্ষেত্রে টেলিমেডিসিনই ভরসা। চিকিৎসক রোগীর সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন, কখনো এক্স-রে বা পরীক্ষার সুপারিশ করছেন। রোগী পরীক্ষার ফলাফল ম্যাসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপে বা ই-মেইলে পাঠাচ্ছেন। চিকিৎসকও সেই মাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবস্থাপত্র পাঠাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মহামারীর সময় চিকিৎসার সেরা বিকল্প টেলিমেডিসিন। বিশ্বজুড়ে টেলিমেডিসিন সেবা ৫০ শতাংশ বেড়েছে।’ টেলিমেডিসিন সংস্থা আমওয়েল জানায়, ‘করোনাভাইরাসের কারণে চিকিৎসক ও রোগীরা টেলিমেডিসিন সেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। অন্যান্য সময় এই মাধ্যমে যে পরিমাণ রোগীদের সেবা দেওয়া হতো, করোনাকালে তার পরিমাণ পাঁচগুণ বেড়েছে।’ আমওলে গ্রাহক সলিউশনের সভাপতি মাইক বেয়ার্ড অরল্যান্ডো বলেন, ‘আমরা অনেক চিকিৎসক এবং রোগীকে টেলিমেডিসিনের আওতায় এনে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

ড্রাইভ-ইন মুভি থিয়েটার: করোনা আতঙ্কে বন্ধ রয়েছে বিশ্বের নামিদামি সব সিনেপ্লেক্স। যার ফলে এখন আর একসঙ্গে বসে দেখা হয় না সিনেমা। কিন্তু অ™ভুত হলেও সত্যি যে, সম্প্রতি করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময়ও সবচেয়ে বেশি সফল্য পাওয়া ছোট ব্যবসার মধ্যে অন্যতম ড্রাইভ-ইন সিনেমা থিয়েটার। তথাকথিত সিনেপ্লেক্স বা থিয়েটারগুলোয় সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা সম্ভব নয়।

আর করোনা সংক্রমণে কম নিরাপদ হওয়ায় সিনেমাপ্রেমীরা সহজেই ঝুঁকছেন ড্রাইভ-ইন সিনেমা থিয়েটারে। ড্রাইভ-ইন সিনেমা বা কনসার্টগুলো করোনার সময় অস্থায়ী বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ড্রাইভ-ইন থিয়েটারগুলোয় লোকজন তাদের নিজস্ব গাড়ি নিয়ে সিনেমা দেখতে আসেন। পরিবারের সঙ্গে গাড়িতে বসে সিনেমা উপভোগ করার জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ড্রাইভ-ইন সিনেমা থিয়েটার।

ক্যালিফোর্নিয়া, কানসাস, ওকলাহোমা এবং মিসৌরির ড্রাইভ-ইন মুভি থিয়েটারগুলোর মালিকরা লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসকে সম্প্রতি বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে তাদের ব্যবসা বেড়েছে। যদিও এটা স্পষ্ট নয় যে, ড্রাইভ-ইন থিয়েটারগুলো ঠিক কতদিন তাদের এই জনপ্রিয়তা ধরে রাখবে। সম্ভবত করোনাভাইরাস চলে যাওয়ার পর এই ব্যবসায় আবার ধস নামবে। তবুও করোনা সংকটময় মুহূর্তে ড্রাইভ-ইন মুভি থিয়েটারই একমাত্র স্থান যেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সিনেমা উপভোগ করা যায়।’

শরীরচর্চার সরঞ্জাম বেচাকেনা: করোনাভাইরাসের কারণে ঘরবন্দী জনজীবন। সেই সঙ্গে বন্ধ হয়ে আছে জিমনেশিয়ামগুলোও। তাই অনেকেই বাইরে না গেলেও ঘরে বসেই শরীরচর্চায় মনোযোগী হয়েছেন। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস সংকটের সময় ফিট থাকতে অনেকেই ঘরটি জিমে পরিণত করেছেন। অনেকে আবার বাসার ছাদকে বেছে নিয়েছেন জিমনেশিয়াম হিসেবে। আর তাতেই বিকিকিনি বেড়ে গেছে শরীরচর্চার সরঞ্জামাদির।

আধুনিক সরঞ্জাম ও উন্নত প্রযুক্তির কারণে ফ্লোডিং এসব সরঞ্জাম স্বল্প স্থান দখল করে বিধায় হোম জিমে ঝুঁকছে অনেকে। করোনাকালে শরীরচর্চার সরঞ্জামাদি বেচাকেনা করা ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায় সাফল্য দেখছেন। করোনায় শরীর ফিট রাখার জন্য গ্রাহকরা বেছে নিচ্ছেন হালকা ব্যায়াম উপযোগী সরঞ্জাম। যা মূলত ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবেই সর্বাধিক পরিচিত।

অনলাইনভিত্তিক শরীরচর্চা সরঞ্জাম সরবরাহকারীরা গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করছেন শরীর ফিট রাখার নানা সরঞ্জাম। তাদের মধ্যে অন্যতম এয়ারগাটা, ফাইট ক্যাম্প, মিরর ও টোনাল। অনলাইনভিত্তিক এই পরিষেবাগুলো গ্রাহকদের কাছে নতুন বা পুরনো সব ধরনের শরীরচর্চার সরঞ্জাম খুচরা এবং পাইকারি সরবরাহ করে থাকে। শুধু অনলাইন বিকিকিনিতেই নয়, ব্যায়াম অনুশীলন পণ্যের দোকানগুলোতেই যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি ভিড়। চাহিদার কারণে আনা হয়েছে নতুন নততুন সরঞ্জামও।

নিজস্ব বাগান পরিচর্যা: করোনাকালে অনেকেই সংক্রমণের ভয়ে প্রয়োজনীয় ফলমূল বা শাক-সবজির বাজারে যেতে অনীহা দেখাচ্ছেন। আর সে কারণে বিশ্বজুড়ে বাড়ির নিজস্ব বাগানটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমনিতেই লকডাউনে সারা দিন গৃহবন্দী সময় কাটাতে হয়। তাই অনেকেই নিজস্ব বাগান তৈরিতে মনোযোগী হচ্ছেন। মানুষজন তাদের বাগানে ফলমূল এবং শাক-সবজির চাষ করছেন। অনেকে আবার সেই বাগান পরিচর্যায় কর্মী নিয়োগ দিচ্ছেন।

স্বাভাবিকভাবেই গাছপালা ও ফলমূলের বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কদর বেড়েছে। উদ্যানপালনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব বীজ সরবরাহের পাশাপাশি কর্মী নিয়োগেও এগিয়ে গেছে কয়েক ধাপ। নিউইয়র্কের হাডসন ভ্যালি বীজ কোং জানায়, ‘করোনার কয়েক মাস অনলাইনভিত্তিক বীজ সরবরাহ অন্য সময়ের তুলনায় পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।’

হাডসন ভ্যালি বীজ কোং-এর বিক্রয় ব্যবস্থাপক জ্যাক বলেন, ‘বাগান তৈরিতে আগ্রহের সবচেয়ে বড় কারণটি হলো করোনার কারণে মানুষজন খাবারের দায়িত্বটা নিয়েছেন নিজেদের হাতে। যার ফলে বেশির ভাগ লোক প্রথমবারের মতো বাগান পরিচর্যা করছেন। সাধারণত শাক-সবজি বা ফলমূল ইত্যাদি বীজের প্রতি লোকের আগ্রহ কম থাকলেও সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা গেছে উদ্ভিজ্জ বীজ যেমন-আলু, ভুট্টা, মটরশুঁটি এবং স্কোয়াশের মতো উচ্চ-ক্যালোরি জাতীয় সবজির চাষের প্রতি।’ তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

More News Of This Category