চাকুরীর ইন্টারভিউয়ে ধরণ বুঝে রীতি নীতি!

পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জীবনবৃত্তান্ত পাঠিয়েছিলেন আখতার হোসেন। একসময় সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকও পড়ে। নিয়োগকর্তাদের কয়েকজনের একটি কমিটির মুখোমুখি হতে হবে, এমনটাই ভেবেছিলেন আখতার। কিন্তু বিধি বাম! গিয়ে দেখেন, চাকরির জন্য আবেদনকারী সবাইকে একসঙ্গে বসিয়ে চলছে যাচাই-বাছাই। আর তাতে ঘাবড়ে গিয়েই গুবলেট পাকান আখতার।

চাকরির সাক্ষাৎকার বা ইন্টারভিউ শুনলেই চোখে ভাসে, কয়েকজনের প্রশ্নবাণের মুখে পড়েছেন একজন চাকরিপ্রার্থী। কিন্তু সাক্ষাৎকারেরও আছে রকমফের। একেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন বুঝে একেক পদ্ধতিতে সাক্ষাৎকার নিয়ে থাকে। কখনো হয়তো প্রত্যেক আবেদনকারীকে ডাকা হয় আলাদাভাবে। আবার কখনো ওপরের পদ্ধতিতে সব আবেদনকারীর মধ্যে তুলনা করে নির্বাচন করা হয় যোগ্য প্রার্থীকে।

সাক্ষাৎকারের জন্য ডাক পাওয়ার অর্থ হচ্ছে, আপনার জীবনবৃত্তান্ত নিয়োগকর্তাদের নজর কেড়েছে। এবার সাক্ষাৎকারে নিজেকে প্রমাণ করার পালা। সাক্ষাৎকারে অল্প সময়ের আলাপচারিতায় আবেদনকারীকে বাজিয়ে দেখেন নিয়োগকর্তারা। সুতরাং এতে সফল হতে ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সাক্ষাৎকার একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। একদিক থেকে যোগ্য ব্যক্তি যাচাইয়ের চেষ্টায় থাকেন নিয়োগকর্তারা। অন্যদিকে ওই প্রতিষ্ঠান ক্যারিয়ারে কী অবদান রাখতে পারবে, সেই ভাবনা থাকে চাকরিপ্রার্থীদেরও। এবার জেনে নেওয়া যাক, সাক্ষাৎকার কত প্রকার ও কী কী।

এক এক্কে এক
এ ধরনের সাক্ষাৎকারে প্রত্যেক আবেদনকারীর আলাদা আলাদা সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়। টেবিলের ওপাশে থাকে প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ এবং সরাসরি পদ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কোনো শীর্ষ কর্তাব্যক্তি। প্রত্যেক আবেদনকারীর আলাদা সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর নিয়োগকর্তারা নিজেরা বসে তা বিচার-বিশ্লেষণ করেন। সাধারণত নিয়োগপ্রক্রিয়ার একেবারে শুরু বা চূড়ান্ত পর্যায়ে এ ধরনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হতে পারে।

প্যানেল সাক্ষাৎকার
এমন সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে নির্বাচকমণ্ডলীতে থাকেন কমপক্ষে তিনজন সদস্য। তাঁরা একে একে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একেক নিয়োগকর্তা একেক বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। প্যানেলে এমন কেউও থাকতে পারেন, যিনি হয়তো কোনো প্রশ্ন না করে, আপনার ব্যাপারে নোট নিতে পারেন। তবে যখন যিনি প্রশ্ন করবেন, তাঁর চোখে চোখ রেখে উত্তর দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। এতে একদিকে যেমন প্রশ্নকর্তার প্রতি আপনার পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়, অন্যদিকে এটি আপনার আত্মবিশ্বাসকেও ফুটিয়ে তুলবে। এক নিয়োগকর্তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময়, তাতে প্যানেলের অন্য সদস্যদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও এড়িয়ে যাবেন না। এ ক্ষেত্রে আপনার অভিব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার
অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে নিয়োগকর্তা ও চাকরিপ্রার্থী দুই পক্ষেরই পরস্পরের সম্পর্কে বেশি তথ্য জানার সুযোগ থাকে। এ ধরনের সাক্ষাৎকারে চাকরিপ্রার্থীর প্রশ্ন করার সুযোগ বেশি থাকে। তবে অনানুষ্ঠানিক হলেও এই সাক্ষাৎকারের জন্যও নিতে হয় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি। সাধারণত নিয়োগপ্রক্রিয়ার শেষ ধাপে এ ধরনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়ে থাকে। কখনো কখনো সব আবেদনকারীকে নিয়ে একসঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সুতরাং অন্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলবেন, সেটি মাথায় রাখা জরুরি।

একসঙ্গে সবাই
সাক্ষাৎকারের এ ধরনটি গ্রুপ ইন্টারভিউ নামে বেশি পরিচিত। এ ক্ষেত্রে সব আবেদনকারীদের নিয়ে বসেন নিয়োগকর্তারা। তাঁরা দেখতে চান একে-অন্যের আলাপচারিতা। কখনো নির্দিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য দিতেও বলা হয়। এভাবেই তুলনামূলক বিচারে বেছে নেওয়া হয় যোগ্য ব্যক্তিকে। সুতরাং অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বা কথাবার্তায় পারঙ্গম হতে হবে। এ ছাড়া প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থীকে আলাদাভাবেও প্রশ্ন করা হতে পারে। তাই প্রস্তুতি নিতে হবে সব মিলিয়েই।

সাক্ষাৎকার যখন টেলিফোনে বা ভিডিওতে
টেলিফোনে বা ভিডিওতে সাক্ষাৎকার দেওয়া নিয়োগকর্তা ও চাকরিপ্রার্থী-উভয়ের জন্যই সাশ্রয়ী। সাধারণত নিয়োগ প্রক্রিয়ার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে টেলিফোনে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। যোগ্য প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরির জন্যই এ ব্যবস্থা। টেলিফোন সাক্ষাৎকারে কারও মুখের অভিব্যক্তি বোঝা সম্ভব নয়। সুতরাং আপনাকে অবশ্যই স্পষ্টভাবে কথা বলতে হবে এবং শুধু কণ্ঠস্বর দিয়েই চাকরি ও নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আপনার আগ্রহ বোঝাতে হবে। টেলিফোনে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় অপেক্ষাকৃত নীরব স্থান বেছে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।

অন্যদিকে ভিডিও কনফারেন্স, বিশেষ করে স্কাইপের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার নেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। সাধারণত দেশ থেকে বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে হয় এভাবে। এ ধরনের সাক্ষাৎকার শুরুর আগেই আপনার কম্পিউটারের অন্যান্য অ্যাপ বন্ধ করে নেবেন। দেখে নেবেন, ইন্টারনেটের সংযোগ ঠিক আছে কি না। অন্য সব সাক্ষাৎকারের মতো, এখানেও আপনার শরীরী ভাষা ও অভিব্যক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সাক্ষাৎকার চলার সময় কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না যেন। তাকাবেন ক্যামেরার দিকে। তা না হলে দেখা যাবে, নিয়োগকর্তা তাকিয়ে আছেন আপনার দিকে, আর আপনি অন্য দিকে!

তথ্যসূত্র: ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরা ও ইউনিভার্সিটি অব লিডস-এর ক্যারিয়ার বিষয়ক নির্দেশনা
সংগৃহীত: প্রথমআলো ডটকম।

SHARE