চাঙা প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবসা!

বছরের শেষে এসে চাঙা হয়ে উঠেছে ছাপাখানার ব্যবসা। কাগজ, কালি ও নকশাকারের দোকানেও ভিড় লেগেছে। নতুন বই, ক্যালেন্ডার ও ডায়েরির পাশাপাশি নির্বাচন এ ব্যবসার পালে নতুন হাওয়া যোগ করেছে। নতুন বছর উপলক্ষে নিয়মিত কাজ আর নির্বাচনী প্রচারসামগ্রী ছাপানোর চাপ—সব মিলিয়ে প্রেসপাড়াখ্যাত রাজধানীর ফকিরাপুল-আরামবাগ এখন বেশ জমজমাট। শুধু এ এলাকা নয়, এ মৌসুমে সারা দেশের ছাপাখানায় ভিড় লেগে আছে।

রাজধানীর ফকিরাপুল-আরামবাগের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছাপাখানা, কাগজ ও কালির দোকান। নটর ডেম কলেজের পাশের গলি দিয়ে ঢুকলেই মিলবে ছাপাখানার শব্দ। গলির দুই পাশের দোকানেও গ্রাহকের ভিড়। পুরো এলাকাটি এখন বেজায় কর্মব্যস্ত। সকালে এলাকার অলিগলি ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

নতুন বছর ও বড়দিন সামনে রেখে সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানই ক্যালেন্ডার, শুভেচ্ছা কার্ড ও ডায়েরি ছাপানোর কার্যাদেশ দিচ্ছে সেখানে। অনেক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে ছাপিয়েও নিয়েছে। এর ফলে দেশীয় মুদ্রণশিল্পে একধরনের চাঙাভাবও এসেছে।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির হিসাবে, রাজধানী ও এর আশপাশে প্রায় ১ হাজার ৩০০ ছাপাখানা আছে। রাজধানীর পল্টন, নীলক্ষেত, সূত্রাপুর, গুলিস্তান, ওয়ারী, নারিন্দা ও বাংলাবাজারেও রয়েছে ছাপাখানা। এদের বেশির ভাগই সমিতির সদস্য। এর বাইরে প্রতিটি জেলাতেই রয়েছে ছাপাখানা।

মুদ্রণ শিল্প সমিতির হিসাবে, ছোট–বড় মিলিয়ে সারা দেশে প্রায় ৭ হাজার ছাপাখানা রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ও এর আশপাশের ১ হাজার ৩০০ ছাপাখানায় বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কাগজ, কালি ও নকশার ব্যবসাও। তবে কাগজ ও কালির দাম ওঠা–নামার সঙ্গে বিক্রিও বাড়ে কমে।

মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, এবার নির্বাচনী সামগ্রীর বেশির ভাগই জেলা শহরে ছাপা হচ্ছে। ঢাকায় এসব সামগ্রী ছাপাতে কিছুটা বাধাবিপত্তির মধ্যেও পড়তে হচ্ছে। এবার সব মিলিয়ে সারা দেশে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকার নির্বাচনী সামগ্রী ছাপা হতে পারে।

তোফায়েল খান আরও বলেন, বছরের শেষ সময় হওয়ায় ক্যালেন্ডার, ডায়েরি, বইসহ নানা সামগ্রী ছাপানোর কাজ চলছে। অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ছাপাখানাগুলো এখন ব্যস্ত সময় পার করছে।

আরামবাগের গলির শুরুতেই ডায়নামিক অফসেট প্রিন্টার্সের দোকান। দুপুরে সেখানে গেলে পাওয়া যায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মোস্তাক হোসেন দুলালকে। এ সময় ছাপাখানাটিতে ছাপার কাজ চলছিল। দেখা গেল, নতুন বই ছাপার কাজ চলছে। যদিও আলাপকালে মোস্তাক হোসেন বলেন, ব্যবসা আর আগের মতো নেই। যাঁরা বড় ছাপাখানা করতে পেরেছেন, তাঁরাই সব কাজ নিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া সব এলাকায় নতুন নতুন ছাপাখানা গড়ে উঠেছে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই এখন টেন্ডারে কাজ দিচ্ছে, যাঁরা পাচ্ছেন, তাঁরা ভালো ব্যবসা করছেন।

আরামবাগের অলিগলি ঘুরে দেখা গেল, সব ছাপাখানায় সব ধরনের কাজ হয় না। কেউ বই ছাপায়, আবার কেউ শুধু ক্যালেন্ডার। আবার ওষুধের মোড়ক ছাপার কাজ করে বিশেষায়িত কিছু ছাপাখানা। পোস্টার ছাপানো হয় বেশ কয়েকটি ছাপাখানায়। দেখা গেল, মাত্র ১১টি ছাপাখানায় নির্বাচনী পোস্টার ছাপানোর কাজ চলছে। বাকি ছাপাখানাগুলো বই, ক্যালেন্ডার, ডায়েরি ও ব্যাংকের বিভিন্ন সামগ্রী ছাপাতে ব্যস্ত।

মুদ্রণ শিল্প সমিতি বলছে, রাজধানীসহ আশপাশের ছাপাখানাগুলোর মধ্যে হাজারখানেক ছাপাখানা পাঠ্যপুস্তক ছাপার সঙ্গে যুক্ত। আর বাকিরা সারা বছরই ক্যালেন্ডার, ডায়েরি ও শুভেচ্ছা কার্ড ছাপায়। আরামবাগের একাধিক ছাপাখানার কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে কোনো বিশেষ কাজ পাননি তাঁরা। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভালো ব্যবসা হয়েছিল।

এবার সব দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ভালো ব্যবসা হবে বলে আশা করেছিলেন তাঁরা। তবে শেষ পর্যন্ত আশানুরূপ কাজ মেলেনি ছাপাখানাগুলোতে। আবার অনেক ছাপাখানা ভয়ে সরকারি দলের বাইরে বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের পোস্টার ছাপানোর কাজের ঝুঁকি নেয়নি। ঢাকার পরিবর্তে এবার নির্বাচনী পোস্টারের ব্যবসা ভাগ হয়ে গেছে এলাকাকেন্দ্রিক।

SHARE