1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

চীনের জিনজিয়ানের তরুণদের ব্যাবসায় ভিত্তিক পরিকল্পনা!

চীনের জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন বাণিজ্যক্ষেত্রসমূহ, যেমন: ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল সমাধান, ইন্টারনেট ও অন্যান্য বিষয় খুঁজে বের করছেন। তারা সারাদেশের ব্যবসাকেন্দ্রগুলোতে তাদের মেধা ব্যবহার করছেন এবং কেউ কেউ এমনকি দেশের বাইরেও ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন।

জিনজিয়াংয়ের অবস্থান হচ্ছে ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান একটি এলাকায়। তাই এখানকার তরুণ সমাজ সম্পদের সুযোগ ও ইন্টারনেট যুগের প্রদত্ত সুবিধা নিয়ে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের অভিযাত্রায় এগিয়ে চলেছে। আবদুল হাবির মুহাম্মদ ইন্টারনেটের গুরুত্বের কথা জানতে পেরেছেন।

মার্চে তিনি গোটা মাস ধরে আরো শিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে জিনজিয়াংয়ের স্কুল ও কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিতে দিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে সকলের কাছে পৌঁছার জন্য অবশ্যই একটি ভালো পথ বের করতে হবে। তিনি বলেন, অতীতে আমি ভাবতাম যে আমাকে প্রথাগত ধরনের একজন শিক্ষক হতে হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ছিল। তারপর আমি ইন্টারনেট ব্যবহারের গুরুত্ব উপলব্ধি করলাম।

মুহাম্মদ ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিংহ্যামটনস্থ স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক থেকে এমবিএসহ স্নাতক হন। তিনি এ বছর এবিইউ এডুকেশন প্রতিষ্ঠা করেন যা জিনজিয়াংয়ের বিদেশ গমনেচ্ছু শিক্ষার্থীদের ভাষা প্রশিক্ষণ ও কনসালটেন্সি সার্ভিস দিচ্ছে। গত তিন মাস ধরে চীনের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মসমূহ, মেসেজিং অ্যাপস ও প্রকৃতÑসময়ভিত্তিক ওয়েবসাইটগুলো সন্ধান করার পর মুহাম্মদ ইন্টারনেটে তার প্রতিষ্ঠানটির প্রচারের জন্য কাজ করছেন।

তিনি বলেন, এখন আমার মনে হচ্ছে যে আমি যুগের চাহিদা মিটাতে কাজ করছি। তার প্রচেষ্টা সফল প্রমাণিত হয়েছে। তার ওয়েইবো পেজের ফলোয়ার সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশী। ধীরে ধীরে ভক্তদের সংখ্যার পরিবর্তন ঘটেছে। শুরুতে তার ফলোয়ার ও অনলাইন দর্শকের ৬০ শতাংশই ছিল উইঘুর। কিন্তু তিনি চীনা ও ইংরেজি ভাষায় কাজ শুরু করার পর তার অধিকাংশ নতুন ফলোয়ারই হচ্ছে চীনের অন্যান্য অংশের।

যারা বিদেশে যেতে পারেনি জিনজিয়াংয়ের সেসব শিক্ষার্থীদের জন্য মুহাম্মদ এমন একটি প্ল্যাটফরম তৈরি করতে চান যেখানে বিদেশী প্রফেসররা অনলাইনে শিক্ষাকোর্স পরিচালনা করবেন। তিনি বলেন, আমরা জিনজিয়াং ও পশ্চিমের অন্যান্য অঞ্চলে ইংরেজি, চীনা, উইঘুর ও অন্যান্য ভাষায় এসব কোর্স পরিচালনা করতে চাই।

তার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলার পাশাপাশি জিনজিয়াং ও চীনের পশ্চিমের অন্যান্য অঞ্চলের বিদেশ ফেরতাদের চাকরি সন্ধানসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও ভাগাভাগির সেবা প্রদান। তিনি বলেন, আমি আশা করি যে যেসব শিক্ষার্থী বিদেশে যাচ্ছে তারা দেশে ফিরে আমাদের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।

জিনজিয়াংয়ের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হচ্ছে বাদামের পিঠা। বাদাম, মিষ্টি ও আঠালো চাল দিয়ে এটি তৈরি হয়। ২০১২ সালে বাদামের পিঠা বিক্রির সময় এক বিক্রেতাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনা মামাত্তুরাকে তার নিজস্ব পিঠা ব্যবসা শুরু করতে উৎসাহিত করে। তিনি তখন চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হিউনান প্রদেশের চাংশা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

বাদাম পিঠার দামকে কেন্দ্র করে চীনা ক্রেতার সাথে বিক্রেতা উইঘুরের সংঘর্ষ ঘটেছিল। সে বছর শেষের দিকে তার ক্ষতি হওয়া পিঠার জন্য ১ লাখ ৬০ হাজার ইউয়ান (২৪ হাজার ৮০ ডলার) ক্ষতিপূরণ পায়। এ ঘটনা চীনা ও উইঘুরদের মধ্যে জাতিগোষ্ঠিগত উজেনার সৃষ্টি করে। মামাত্তুরা ভাবলেন, এ ঘটনায় তার জন্মভূমির ঐতিহ্যবাহী এ খাবারটি সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। তাই তিনি অনলাইনে এ বাদাম পিঠার প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

আজ চার বছর পর তার বাদাম পিঠা বিক্রয়কারী কোম্পানির মাসিক বিক্রির পরিমাণ ৩০ লাখ থেকে ৬০ লাখ ইউয়ানে পৌঁছেছে। এ সাফল্যের পিছনে রয়েছে ইন্টারনেটে প্রচারণা, তার তৈরি প্রিন্স ব্র্যান্ডের বাদাম পিঠা ও নিজের অক্লান্ত চেষ্টা। বাদাম পিঠা কিভাবে তৈরি করা হয় তা নিয়ে ভিডিও তৈরি করে তিনি সামাজিক মাধ্যমে নিমিত প্রচার করেন। তিনি স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করেন। তিনি মনে করেন, এর ফলে তার পণ্যের উপর ক্রেতাদের আস্থা সৃষ্টি হবে।

মামাত্তুরা এখন তার বাদাম পিঠার আন্তর্জাতিক বাজার চাইছেন। তিনি বলেন, সাংহাইতে কিছু বিদেশ ক্রেতা জিনজিয়াংয়ের বাদাম পিঠা খেয়েছেন। তারা বলেছেন, এটা সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর। যেহেতু এটা বিভিন্ন ধরনের বাদাম দিয়ে তৈরি সে কারণে অত্যন্ত পুষ্টিকর ও শক্তিবর্ধক।
তবে মামাত্তুরা চিন্তিত যে জিনজিয়াংয়ের বাদাম পিঠা নরম এবং তাপমাত্রা দ্বারা প্রভাবিত হয়। তা বেশিক্ষণ ভালো থাকে না। ফলে তা বেশি পরিমাণে তৈরি ও বিক্রি করার ক্ষেত্রে সমস্যা। তাই এ পিঠাকে আরো টেকসই ও অধিকক্ষণ রাখার উপযোগী করে তৈরি করার চেষ্টা করছেন তিনি।

চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের হাংঝুতে আইলিকেমু আবুজিলির একটি কোম্পানি আছে যা অনলাইনে খেলনা ও পুরুষদের খেলার পোশাক বিক্রি করে। ২০১৪ সালে একটি ছোট, সাদামাটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। এখন তার প্রতিষ্ঠানে ৭ জন লোক কাজ করে এবং মাসিক বিক্রির পরিমাণ ১ লাখ ২০ হাজার ডলার। তার পণ্য ই-বে, আমাজন ও আলি এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বেশিরভাগ দেশের বাইরে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে যায়।

তার আগে তার বয়সী বেশিরভাগ চীনা কলেজ স্নাতক ছাত্রদের মতো তিনিও জানতেন না তিনি কি করবেন। আবুজিলি ইউক্রেনের একটি কলেজ থেকে বিমান পরিবহণ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে ই-কমার্সই হচ্ছে ব্যবসার ভবিষ্যত। তাই তিনি ই-কমার্স দানব আলিবাবা যেখানে অবস্থিত সেই হাংঝুকেই তার কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন।

এখানে সুবিধা ছিল যে লজিস্টিক ব্যয় ছিল তুলনামূলক ভাবে কম এবং শুরু করার জন্য স্থানীয় সরকারের ভর্তুকি পাওয়া যেত। এখন তিনি সাংহাই ও শেনঝেনে অফিস খোলার পরিকল্পনা করছেন। তিনি মনে করেন তিনি তার জন্য সঠিক জায়গা খুঁজে পেয়েছেন। তিনি আশা করছেন যে জিনজিয়াংয়ের আরো অনেকে তরুণ তার শিল্পে যোগ দেবে এবং দেশের বিভিন্ন শহরে তাদের ভাগ্য সন্ধান করবে।

আবুজিলি মূলত হামি শহরের লোক। হামি মিষ্টি তরমুজের জন্য বিখ্যাত। তিনি মনে করেন, জিনজিয়াংকে নিয়ে তার দেশের লোক ভাবুক এটা চাইলে শুধু মিষ্টি তরমুজ উৎপাদনকারী স্থান হিসেবে পরিচিতি সহায়ক হবে না। বহু লোকই মনে করে যে জিনজিয়াংয়ের ব্যবসায়ীরা রেস্তোরাঁ মালিক বা কাবাব বা ফল বিক্রেতার বেশি কিছু নয়। তিনি বলেন, আমি তাদের জানাতে চাই যে আমরা ই-কমার্স ব্যবসা চালাতেও সক্ষম।

আরাফাত আনোয়ার জিনজিয়াংয়ের ঐতিহ্যবাহী চ্যাপ্টা রুটি তৈরি করেন। কোম্পানির লোগো লাগানো টিনের ফয়েলে মোড়া একটি বক্সে ভরা ন্যাং নামে পরিচিত এ রুটি সারাদেশব্যাপী হালাল খাদ্যপিপাসু লোকদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেয়া নিশ্চিত করতে চান তিনি। বেইজিংয়ের নর্থ চায়না ইলেকট্রিক পাওয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে সফটওয়ারে ডিপ্লোমা নেয়া আনোয়ার সামাজিক মাধ্যমে তার সেবার প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করছিলেন। যেমন তার রুটি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়া নেটব্যবহারকারীদের পুরস্কার প্রদান।

ওয়েবসাইট ও অ্যাপসের মাধ্যমে তারা সে ব্যবস্থা করতে চাচ্ছিলেন যাতে ব্যক্তি ও খুচরা বিক্রেতারা শুকনো ফল ও শুকনো মাংস থেকে বিস্কুট ও এনার্জি বারসহ সকল হালাল খাবার ইয়ামিমিগো থেকে কিনতে সক্ষম হন। এখন তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে জিনজিয়াং থেকে চীনের অন্যান্য স্থানে অধ্যয়নরত কলেজছাত্ররা যাদের জন্য হালাল খাদ্য খাওয়া খুবই কঠিন। তিনি বলেন, আমি যখন স্কুলে ছিলাম তখন হালাল খাবার পাওয়া আমার জন্য কঠিন ছিল।

আনোয়ার বলেন, জিনজিয়াংয়ের পটভূমি এবং সংযোগ তার জন্য সুবিধাজনক হয়েছে। তিনি বলেন, আমি জানি কোথায় হালাল খাদ্য পাওয়া যায়। আমি যদি জুজুবি (বরইয়ের মত ফল) চাই তাহলে আমাকে হোতানে যেতে হবে এবং সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কিনতে হবে।
তার উচ্চাকাক্সক্ষা হচ্ছে নিজের উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ে আমাজনের মত আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জন করা। আনোয়ার বিদেশীদের সাথে যোগাযোগ ও বড় বিদেশী খাদ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সহযোগিতা ও চীনে তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে চান।

যেসব উইঘুর তাদের গৃহকোণ থেকে বের হয়ে আসতে ও নতুন কিছু করতে চায়, আনোয়ার তাদের উৎসাহিত করেন যাতে তারা শুরু করতে ভয় না পায়। তিনি বলেন, জিনজিয়াংয়ের কোনো কোনো ব্যক্তির দেশের অন্য কোনো অংশে একটি ভালো ব্যবসা শুরু করার মত আত্মবিশ্বাস নাও থাকতে পারে। আমি তাদের বলতে চাই যে তোমরা অবশ্যই পারবে। তোমরা সামনে এগিয়ে যাও, একটি দল গড়ো ও শুরু করো। সূত্র গ্লোবাল টাইমস।

More News Of This Category