বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা অবমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত

বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা। মন্দা মানেই চাহিদা কমে যাওয়া। আবার এই সুযোগে ক্রেতারাও পণ্যের দাম কমিয়ে দিচ্ছেন। বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে অনেক দেশ তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। এতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় রপ্তানি সক্ষমতায় পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ।

রপ্তানি বাণিজ্যে টিকে থাকতে অবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংকও টাকার অবমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে লাভবান হবেন প্রবাসীরাও। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ গত মাসেই এ নিয়ে একটি প্রস্তাবনা ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পাঠিয়েছে। তবে ঠিক কত টাকা অবমূল্যায়ন করা হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি।

রপ্তানি আয়ে মন্দাদশা: গত জুলাইয়ে দেশের রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৮ শতাংশের কিছু বেশি। কিন্তু চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম মাসের এই অগ্রযাত্রা পরের দুই মাসে আর দেখা যায়নি। পরের মাসে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ আর সেপ্টেম্বরে কমেছে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ।

ফলে জুলাই-সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি এখন ঋণাত্মক, এর হার ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, সামনের দিনগুলোতে এ খাত বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের এক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের এমবি নিট ফ্যাশন দেড় যুগ ধরে ব্যবসা করছে।

ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানটি ওই কারখানাকে গত বছর একটি ডিজাইনের টি-শার্ট প্রতিটি ৯৯ সেন্টে ক্রয়াদেশ দিলেও চলতি বছর তা কমিয়ে ৮৬ সেন্ট দিয়েছে। এ রকম ঘটনা এখন অহরহই ঘটছে বলে একাধিক পোশাকমালিক জানান। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক এ নিয়ে প্রথম আলোকে বললেন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের প্রতিযোগী সক্ষম হতে হবে। এ জন্য অবশ্যই আমাদের নীতি সহায়তা লাগবে।’

অন্যরা কী করছে: বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের হাত ধরে। বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল। শুরুতে সেটি হলেও চীন বিষয়টি সামলে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ১ হাজার ৭৫৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে চীন।

এই আয় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ বেশি। মূলত গত বছর মার্কিন ডলারের বিপরীতে চীনা মুদ্রা ইউয়ান প্রায় ১০ শতাংশ অবমূল্যায়ন করার কারণে দেশটির উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন। আর ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ইউয়ানের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে ৩৩ শতাংশ।

আবার বাংলাদেশের জিনসের কাপড় তৈরির সুতা ও ডেনিম কাপড়ের ক্ষেত্রে বড় হুমকি হয়ে উঠছে পাকিস্তান। গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে পাকিস্তানের রুপি ২৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কান রুপিরও অবমূল্যায়ন হয়েছে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। তাতে বাংলাদেশ থেকে ডেনিমের সুতা ও কাপড়ের ক্রয়াদেশ পাকিস্তান এবং নিট ও সিনথেটিক কাপড়ের পোশাকের ক্রয়াদেশ শ্রীলঙ্কায় সরে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন রপ্তানিকারক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে সাত বছর ধরে ব্যবসা করছিলেন তাঁরা। শ্রীলঙ্কার রপ্তানিকারকেরা ১৫ শতাংশ কম দাম অফার করায় দেড় কোটি ডলারের একটি ক্রয়াদেশ তাঁদের হাতছাড়া হয়ে গেছে।

অবমূল্যায়নের পক্ষে-বিপক্ষে: তাত্ত্বিকভাবে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে রপ্তানিকারক ও প্রবাসীরা লাভবান হন। কারণ, আগের তুলনায় ডলারের বিপরীতে বেশি হারে টাকা পাওয়া যায়। তবে মুদ্রার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। কারণ, আমদানিকারকদের আগের তুলনায় বাড়তি অর্থ দিয়ে ডলার কিনতে হয়।

বাংলাদেশে এখনো রপ্তানির তুলনায় আমদানি বেশি। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি তেলসহ শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের বড় অংশই আমদানি করতে হয়। অবমূল্যায়ন হলে মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধিরও আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশ মূলত মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতেই টাকার অবমূল্যায়ন থেকে দূরে থাকে।

দেশের বড় খাদ্যপণ্য আমদানিকারকের অন্যতম প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী এ নিয়ে বলেন, বাংলাদেশকে প্রচুর খাদ্যদ্রব্য আমদানি করতে হয়। ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমলে আমদানিতে খরচ বাড়বে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখা উচিত।

নীতির পরিবর্তন: প্রায় এক দশক ধরেই টাকার মূল্যমান স্থিতিশীল রাখার নীতি বজায় রাখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলারের সংকট হলেই ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করে বাজারে ভারসাম্য নিয়ে আসে। তারপরও গত এক বছরে ডলারের সংকটের কারণে টাকার মূল্যমান আর স্থির রাখা যায়নি। চলতি বছরের মে মাসে আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের মূল্য ৮৪ টাকা ৫০ পয়সায় নির্দিষ্ট করা হয়। ৬ অক্টোবর প্রতি ডলার বেড়ে হয় ৮৪ টাকা ৬৫ পয়সা। আর গতকাল রোববার ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে লেনদেন করেছে ৮৪ টাকা ৭০ পয়সা দরে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর এ নিয়ে বলেন, ‘চীন, ভারতসহ অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ ইতিমধ্যে তাদের স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে। ফলে অন্যদের তুলনায় আমাদের কাছ থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রেতাদের খরচ বেশি পড়ছে। এটি চলতে থাকলে আমরা বাজার হারাব। তাই রপ্তানি বাজার ধরে রাখার সবচেয়ে ভালো সমাধান হচ্ছে ডলারের বিপরীতে ৫-৭ টাকা অবমূল্যায়ন করা।’

অবমূল্যায়নের কারণে আমদানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না বলে মনে করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘ভারত ও চীন থেকে আমরা সবচেয়ে বেশি আমদানি করি। সেখানকার মুদ্রার অবমূল্যায়ন করায় দাম কিছুটা কমেছে। তাই আমদানিকারকদের খরচ বাড়বে না। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির কোনো আশঙ্কা নেই।’

SHARE