1. editor@islaminews.com : editorpost :
  2. jashimsarkar@gmail.com : jassemadmin :

ধনীরা ত্রাণ দেয় না, কর দেয় না, উল্টো সরকারের কাছে হাত পাতে!

করোনার তাণ্ডবে স্থবির অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য। দেশ পরিচালনায় সরকার কর-রাজস্ব হিসাবে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে যেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ার কথা, উল্টো তাঁরাই এখন সরকারের কাছে সহায়তার জন্য হাত পাতছেন। ফলে বর্তমানে যেমন কর চাওয়ার উপায় নেই, অন্যদিকে করমুক্তির আবেদনও আসছে এনবিআরে। শীর্ষ করদাতা প্রতিষ্ঠান, শীর্ষ ব্যক্তি করদাতাদের মধ্যে হাতে গোনা ক’জন ছাড়া অনেকেই না আছেন করোনাকালে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে, না আছেন রাজস্ব দিয়ে সরকারের পাশে।

এ অবস্থায় রাজস্ব আয়ের নেতিবাচক প্রভাব দিনে দিনে চরম অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংস্থাটির নজর এখন মোবাইল ফোন অপারেটর, সিগারেট, ওষুধ কম্পানি, মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী দু-একটি বড় প্রতিষ্ঠানের দিকে। এই করোনাকালে এই কয়েকটি খাতের প্রতিষ্ঠানই ভালো ব্যবসা করছে। এনবিআর জানায়, এরাই এখন রাজস্ব আয়ের শেষ ভরসাস্থল।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও সিনিয়র সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘করোনার কারণে সরকারের অপ্রত্যাশিত খরচ অনেক বেড়ে গেছে। স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় অসহায় মানুষের পেছনেও বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। তাই আমি মনে করি, বড় করদাতাদের মধ্যে যাঁরা ভালো করদাতা আছেন, তাঁদের কর কমানো উচিত নয়। করোনার কারণে তাঁদের ব্যবসা কম হলে মুনাফা কম হবে, ট্যাক্সও কম দেবেন। তাই বলে কর ছাড় দেওয়ার দরকার নেই। তাঁদের কর সুবিধা না দিয়ে বরং ঋণ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।

এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি শাখার সদস্য জামাল হোসেন বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে দেশের শীর্ষ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যেখানে আমরা ১১ হাজার কোটি টাকা পাই, করোনার কারণে এবার তাদের কাছ থেকে পেলাম মাত্র চার হাজার কোটি টাকা। বেশির ভাগ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ। দু-একটি চালু রয়েছে, তাদের কাছ থেকে যেভাবে সম্ভব, আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করে রাজস্ব আয়ের জন্য ছুটছেন। সবাই একটি প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’

দেশের শীর্ষ ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাট দেয় ভ্যাটের বৃহৎ করদাতা ইউনিট এলটিইউতে। সেখানে গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংকসহ বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটর, ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকোসহ বিভিন্ন সিগারেট কম্পানি, তেল-গ্যাস কম্পানি, ইউনিলিভারসহ কয়েকটি মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি এবং দেশীয় পণ্য ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ভ্যাট দিয়ে থাকে।

তাদের মধ্যে মোবাইল ফোন কম্পানিগুলো করোনাকালে ইন্টারনেট সেবা অব্যাহত থাকায় বেশ ভালো ব্যবসা করছে। তাই তাদের কাছ থেকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভ্যাট আদায় করছে এনবিআর। দেশি শীর্ষ কম্পানিগুলোর বেশির ভাগ বন্ধ থাকায় বলতে গেলে ভ্যাট আদায় অনেকখানি কমে গেছে। সম্প্রতি এনবিআরের ব্যাট বাস্তবায়ন শাখার সদস্য জামাল হোসেন চিঠি দিয়ে সংশ্লিষ্ট সব ব্যাট অফিসকে সিগারেট, মোবাইল ফোন, মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ও ওষুধ কম্পানির দিকে নজর দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

চলতি অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ আট হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৬৭ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। গেল বছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৮৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। মে-জুন দুই মাসে ভ্যাট আদায় করতে হবে ৪১ হাজার কোটি টাকা। গেল বছরের সমান আদায় করতে হলেও আরো ১৯ হাজার ৪১৬ কোটি টাকার ভ্যাট আদায় করতে হবে। পরিস্থিতি কঠিন হলেও ভ্যাট শাখার পক্ষ থেকে ব্যাপক তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানান, মোট রাজস্বের ২৩ শতাংশ এবং ভ্যাটের ৫২ শতাংশ রাজস্ব একাই জোগান দেয় ভ্যাট এলটিইউ। একই অবস্থা আয়করের ক্ষেত্রেও। শীর্ষ করদাতারা আয়কর দেন আয়করের বৃহৎ করদাতা ইউনিট এলটিইউতে। সেখানেও কর দেওয়ার পরিস্থিতি বেশ নেতিবাচক। সূত্র মতে, আয়কর এলটিইউতে মোট করদাতার সংখ্যা প্রায় এক হাজার ১০০। এর মধ্যে প্রায় পৌনে ৩০০ হচ্ছে ব্যাংক, বীমাসহ শীর্ষ করপোরেট কম্পানি। এখানে কর দেন গ্রামীণফোন, রবিসহ বড় করদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ও তাদের পরিচালকরা।

এখানকার এক হাজার ১০০ করদাতার কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। অথচ সর্বশেষ গত মার্চ পর্যন্ত সময়ে শীর্ষ করদাতারা কর দিয়েছেন মাত্র সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা। বলা যায়, আট মাসে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক আদায় করা হলেও বাকি তিন মাসে আরো অর্ধেক প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা আদায়ের কথা। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি এমন নাজুক যে গ্রামীণফোন ছাড়া বাকিরা হাত গুটিয়ে বসে আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলটিইউর এক কর্মকর্তা জানান, এখানে মূলত ব্যাংক, বীমা, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও তাদের পরিচালকরা কর দেন। বলা যায়, মোট আয়করের প্রায় ২৫ শতাংশ তাঁরা একাই দেন। এমনিতে এ বছর ব্যবসা খারাপ যাচ্ছিল। তার ওপর করোনার আঘাতে সব থমকে গেছে। এখন ট্যাক্স চাইলে বলে ব্যবসা নেই, ট্যাক্স দেব কিভাবে? লকডাউনের কারণে প্রায় সব ব্যবসাই বন্ধ। ব্যাংকে সীমিত পরিসরে সেবা চলছে। আগামী দুই মাসের জন্য সব ঋণের কিস্তি স্থগিত করা হয়েছে। সুদও নেওয়া যাবে না।

ব্যাংকের মূল ব্যবসাই ঋণ থেকে আয়। এটা এখন হচ্ছে না। রপ্তানি আয় তলানিতে। রপ্তানি বাণিজ্য থেকে ব্যাংকের আয় ছিল। সেটাও কম। রেমিট্যান্স কমছে। ফলে ব্যাংকের কমিশন বাবদ যে আয় সেটাও কমছে। মোটা দাগে ব্যাংকের মূল আয়ের খাতগুলো এখন সংকুচিত। আবার সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর ডিভিডেন্ট দেওয়া স্থগিত করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকের পরিচালকরাও তাঁদের আয় কমে গেছে বলে কর কম দেখাচ্ছেন। সব মিলিয়ে দেশের সেরা করদাতাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত কর পাওয়ার রাস্তাও সংকুচিত।

শীর্ষ করদাতা প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও শামস উল ইসলাম বলেন, ‘করোনার আঘাত মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেওয়া ঋণের কিস্তি স্থগিত করেছে, সুদও স্থগিত করেছে। বলা যায়, ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের মুনাফা আটকে গেছে। মুনাফা না হলে ট্যাক্সে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে স্বাভাবিকভাবেই। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, আয়কর, ভ্যাটের পাশাপাশি শুল্ক খাতেও রাজস্ব আয় ব্যাপকভাবে কমছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস এককভাবে শীর্ষ রাজস্ব আদায়কারী কমিশনারেট। এপ্রিল মাসে এখানে রাজস্ব আদায় কমেছে লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ছয় হাজার ১০৬ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে দুই হাজার ১২৬ কোটি টাকা। গেল বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। গেল ১০ মাসের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি পর্যালোচনা করে জানা যায়, এ সময় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির বদলে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ।

দ্বিতীয় শীর্ষ শুল্ক আদায়কারী শুল্ক বন্দর বেনাপোলে গেল কয়েক মাস ধরে বলতে গেলে আমদানি একেবারে শূন্যের কোটায়। এ রকম চিত্র প্রায় সব শুল্ক স্টেশন ও বন্দরে। শীর্ষ ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানই মূলত আমদানিতেও শীর্ষে। ঘুরে ফিরে তারাই বেশি আমদানি করে, তারাই আবার বেশি ভ্যাট দেয়। আর ঘুরে ফিরে এরাই আয়করে বড় অবদান রাখে। এক জায়গায় বাধাগ্রস্ত হওয়া মানে পুরো রাজস্ব পরিস্থিতি নেতিবাচক হওয়া। আমদানিকারকরা আমদানি কমানোয় কমছে শুল্ক, উৎপাদন ও বিপণন ব্যাহত হওয়ায় কমছে ভ্যাট। আর সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কমছে আয়কর আদায়ও।

কর্মকর্তারা আরো জানান, শীর্ষ করদাতারা করোনার অজুহাতে শুধু কর দেওয়াই কমিয়ে দেননি, উল্টো তাঁরা বাজেট সামনে রেখে ডজন ডজন চিঠি পাঠাচ্ছেন করমুক্তি বা কর অব্যাহতি চেয়ে। কোনো কোনো খাতে চান আমদানি শুল্ক কমাতে, কেউ চান শুল্ক পুরোপুরি উঠিয়ে নিতে, কেউ বা চান ভ্যাট না দিতে বা হার কমাতে। আর আয়কর ছাড় পেতেও আবেদনের কমতি নেই।

ব্যবসা বন্ধ, রপ্তানি বন্ধ, বেচাবিক্রি নেই, মুনাফা নেই, প্রতিষ্ঠানের লোকসান হচ্ছে, কর্মচারীর বেতন দেওয়া যাচ্ছে না ইত্যাদি নানা যুক্তি তুলে ধরে শুল্ক-কর ছাড় চাইছেন তাঁরা। ফলে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এনবিআর। করোনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষতিগ্রস্ত খাতের সুরক্ষায় বেশ কিছু প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তিনি দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিত্তবানদের অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এতে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলেও বেশির ভাগের সাড়া মেলেনি। ভ্যাট ও ট্যাক্সের বৃহৎ করদাতা ইউনিটে যেসব শীর্ষ করদাতা কর দেন, তাঁদের বেশির ভাগও এই করোনাকালে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দেননি। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ত্রাণসামগ্রী, প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে কয়েক কোটি টাকার চেক দিলেও মোটাদাগে তাদের বড় কোনো সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি।

এ ব্যাপারে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘শুল্ক-কর সুবিধা নিয়ে বহু প্রতিষ্ঠান মোটাতাজা হয়েছে। সময় সময় কর ফাঁকিও দিয়েছে। এ দুর্দিনে তাদের দেখা মেলা ভার। উল্টো রাজস্ব সুবিধা চায়। এটা গণহারে মানা ঠিক হবে না। এদের মধ্যে যারা সৎ করদাতা তাদের ছাড় দেওয়া যেতে পারে। আর যারা করও ফাঁকি দিয়েছে, এখন দুর্দিনে সাড়াও দেয় না, তাদের ধরা উচিত।’ তথ্যসূত্র: কালেরকন্ঠ।

More News Of This Category