1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

নাট বল্টুতে আটকে আছে সম্ভাবনা

হালকা প্রকৌশলশিল্পের ওপর ভিত্তি করেই অটোমোবাইলসহ বড় শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। তবে সম্ভাবনাময় এই খাতটি তার আঁতুড়ঘর পুরান ঢাকাতেই একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে গেছে। গাড়ির ইঞ্জিন ও বিভিন্ন কলকারখানার যন্ত্রপাতি মেরামত আর ছোটখাটো নাটবল্টু তৈরিতেই ব্যস্ত এখানকার অধিকাংশ কারখানা।

অবশ্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্বল্পপরিসরে কৃষি ও নির্মাণকাজের যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিকপণ্যের ছাঁচ বা মোল্ড, পেপারমিলের রোলার, ব্রেড-বেকারির যন্ত্র ইত্যাদি তৈরি করছে। তবে এখানকার দক্ষ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে আরও অনেক শিল্পের প্রয়োজনীয় মূলধনি যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করার সুযোগ থাকলেও হয়ে উঠছে না।

জানা যায়, গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পুরান ঢাকার টিপু সুলতান রোডে মোটরগাড়ি ও পাটকলের যন্ত্রপাতি মেরামতের কারখানার গোড়াপত্তন হয়। পরে কিছু প্রতিষ্ঠান যন্ত্রাংশ তৈরি শুরু করে। কারখানাগুলো ধীরে ধীরে ধোলাইখাল, নারিন্দা, লক্ষ্মীবাজার, লালবাগ, ইসলামবাগসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পমালিক সমিতির ধারণা, সব মিলিয়ে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ৫ থেকে ৬ হাজার কারখানা আছে। তবে ৯০ শতাংশ কারখানাই গাড়ির ইঞ্জিন থেকে শুরু করে নানা শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি মেরামতে নিয়োজিত। বাকি ১০ শতাংশের অধিকাংশ আবার নাটবল্টুসহ খুচরা যন্ত্রাংশ প্রস্তুত করে থাকে।

অবশ্য হালকা প্রকৌশলশিল্প পুরান ঢাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে বগুড়া, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদা, গাড়ির ইঞ্জিনসহ অন্য যন্ত্রাংশ মেরামতের জন্যই এসব কারখানা গড়ে উঠেছে। সারা দেশে ৪০ হাজার কারখানা আছে। কারখানাগুলোয় প্রায় ৬ লাখ লোক কাজ করেন বলে ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পমালিক সমিতির ধারণা।

দেশের বিভিন্ন বিসিক শিল্প এলাকা ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) হালকা প্রকৌশলশিল্পের মাঝারি ও বড় কারখানা আছে। এখানকার অনেক কারখানা প্রকৌশল যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রিক পণ্য, বাইসাইকেল, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি রপ্তানি করছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫১ কোটি মার্কিন ডলারের প্রকৌশলপণ্য রপ্তানি হয়।

পুরান ঢাকায় একদিন: ১২ বছর বয়সে টিপু সুলতান রোডের স্টার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চাকরি নেন ফরাশগঞ্জের মো. নাদিম। লেদ মেশিনে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করাই তাঁর কাজ। এভাবেই কেটে গেছে ৩৫ বছর। কারখানার মালিক ব্যবসা ছেড়ে দেবেন তাই নাদিম নিজেই কারখানাটি কিনে নেবেন। কথাবার্তা চূড়ান্ত পর্যায়ে।

বলধা গার্ডেনের পাশের সড়ক ধরে কয়েক মিনিট হাঁটলেই টিপু সুলতান রোড। সেই রোডের মাঝামাঝিতে স্টার ইঞ্জিনিয়ারিং। কারখানার ভেতরে নাদিমের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। লেদ মেশিনে কাজ করতে করতে নাদিম বললেন, ঢাকা ছাড়াও বিভিন্ন জেলার গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপ থেকে যন্ত্রাংশ তৈরির ক্রয়াদেশ আসে তাঁর কারখানায়।

তবে আগের চেয়ে কাজ কমে গেছে। সব মিলিয়ে মাসে ২৫-৩০ হাজার টাকা আয় হয়। পাশের হোসেন ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় কাজ করছিলেন চারজন। তাঁদের মধ্যে একজন আলী হোসেন, কারখানাটির মালিক। বললেন, ১২ বছর বয়সে টিপু সুলতান রোডের এক কারখানায় চাকরি নেন।

২০ বছর কাজ করার পর নিজেই কারখানা দিয়েছেন। তাঁর কারখানায় গাড়ির ইঞ্জিন মেরামতের কাজ হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি হওয়ায় বর্তমানে কাজ কমে গেছে বলে জানালেন আলী হোসেন। বললেন, গত কয়েক বছর ব্যবসায় খুব বাজে অবস্থা চলছে। টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।

পুরো এলাকা ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মূল সড়কের পাশাপাশি অলিগলিতে ছোট দোকানকোঠা ভাড়া নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা গড়ে উঠেছে। অধিকাংশই ছোট কারখানা। সেখানে কাজ করেন তিন-চারজন শ্রমিক। মাঝারি কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। শ্রমিকেরা চাকরির একটি পর্যায়ে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেন। সে জন্য ছোট কারখানার সংখ্যা বাড়ছে।

তেমনি এক তরুণ শুভ চন্দ্র দাস। প্রিন্টিং মেশিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ করেন নারিন্দার শাহসাহেব লেনের মুন্নাফ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। মাসে সাড়ে ৮ হাজার টাকা বেতন পান। কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনায় পড়েছেন। দেখালেন হাতের নোখের কিছুটা কাটা পড়েছে মেশিনে। তারপরও স্বপ্ন দেখেন ভবিষ্যতে নিজেরই একটি কারখানা হবে। বললেন, নিজের কারখানা তো দিতেই হবে।

মডেল প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইঞ্জিনিয়ারিং: পুরান ঢাকায় যেসব প্রতিষ্ঠান ভালো কাজ করছে তার মধ্যে অন্যতম প্রগতি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস। ১৯৮৪ সালে যাত্রা শুরুর সময়ে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করত প্রতিষ্ঠানটি। তবে ২০১৫ সালে যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগে আধুনিক কারখানা চালু করেছে প্রগতি।

গত মঙ্গলবার সকালে কারখানাটি ঘুরিয়ে দেখান প্রগতির স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম। কম্পিউটারনিয়ন্ত্রিত বড় যন্ত্রের ভেতরে প্লাস্টিকের টুল তৈরির ছাঁচ বা মোল্ড বানানোর কাজ চলছে। আরএফএল, বেঙ্গল, পারটেক্স, নাভানা, গাজী গ্রুপের বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকপণ্য উৎপাদনের জন্য ছাঁচ তৈরি করেন তাঁরা।

এ ছাড়া সার, পেপার, সিমেন্ট, পেপার ও স্টিলমিলের ভারী যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি হয়। সাইফুল ইসলাম জানালেন, বছরে ১০-১২ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি তৈরি করে প্রগতি। শিগগিরই ভুলতায় ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে একটি কারখানা করছে প্রগতি। সেখানে পেপারমিলের রোলার তৈরি হবে।

প্রগতির মতো কারখানা না হওয়ার কারণ হিসেবে সাইফুল ইসলাম বলেন, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২ শতাংশ শুল্ক দিলেই চলে। তবে ভারী যন্ত্র বানানোর জন্য যে কাঁচামাল লাগে তা আমদানি করতে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। শুল্কের এই হারের কারণেই দেশে যন্ত্র উৎপাদন করে টেকা মুশকিল। তা ছাড়া শিল্পে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্টিল উৎপাদনের কোনো কারখানা নেই দেশে।

সম্ভাবনার বন্ধ দুয়ার খুলতে: একটি গাড়ি তৈরিতে কয়েক হাজার যন্ত্রাংশ লাগে। গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাইরের ছোট ছোট কারখানা থেকেই যন্ত্রাংশ কেনে। এই সুযোগ কাজ লাগাতে হলে সরকারকে অন্তত ১০টি মডেল কোম্পানি করতে হবে। কোম্পানিগুলো উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি দিয়ে রপ্তানির জন্য গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরি করবে। তাদের অধীনে থাকবে হাজার হাজার ছোট ছোট কারখানা।

এসব কথা বলে সমিতির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বললেন, পুরান ঢাকার কারখানাগুলো গাড়ির ইঞ্জিনের সব ধরনের যন্ত্রাংশ তৈরি করতে সক্ষম। আবদুর রাজ্জাক আরও বলেন, ‘হালকা প্রকৌশলশিল্পের ওপর ভর করেই জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া উন্নত হয়েছে। আমাদের হালকা প্রকৌশলশিল্প নিয়ে সবাই সম্ভাবনার কথা বলে। কিন্তু কখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সে জন্য পুরো খাতটি বনসাইগাছের মতো হয়ে গেছে।’

More News Of This Category