1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

নির্বাহী প্রকৌশলীর চাকরী ছেড়ে ভারী যন্ত্রের ব্যবসায় সফল!

দেশে বড় অবকাঠামো নির্মাণ যত বাড়ছে, ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহারও তত বাড়ছে। এসব যন্ত্রের পুরোটাই আবার আমদানিনির্ভর। সে জন্য অনেকেই যুক্ত হচ্ছেন ভারী যন্ত্রের ব্যবসায়। এমনই একটি প্রতিষ্ঠান ‘আর্থমুভিং সলিউশন লিমিটেড’। দেশে এখন আর্থমুভিং সলিউশন হচ্ছে চীনের ভারী যন্ত্রপাতি উৎপাদক এক্সসিএমজির একক পরিবেশক।

বিশ্বে ভারী যন্ত্রপাতি বিক্রির শীর্ষ তিনে আছে এক্সসিএমজি। আর দেশে ভারী যন্ত্রপাতি আমদানির শীর্ষে রয়েছে আর্থমুভিং সলিউশন। এই প্রতিষ্ঠান এখন বছরে ৪০০ কোটি টাকার অধিক মূল্যমানের ভারী যন্ত্র ও ট্রাক আমদানি করছে। দেশে এক্সসিএমজির যন্ত্রের ব্যবহার এতটা বেড়েছে যে বড় অবকাঠামোর পাশাপাশি এখন গ্রামাঞ্চলেও পুকুর খনন, সড়ক নির্মাণ ও ভূমি উন্নয়নের কাজে এসব ভারী যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে।

দেশে অবকাঠামো নির্মাণকাজে ব্যবহারের জন্য যেসব ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ব্যবহৃত। অর্থাৎ অন্য দেশে ব্যবহারের পর এসব যন্ত্রপাতি দেশে আমদানি করা হচ্ছে। অনেকটা রিকন্ডিশন্ড গাড়ির মতো। তবে আর্থমুভিং শুধু নতুন যন্ত্রপাতিই আনছে।খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন ও পুরোনো যন্ত্রের মধ্যে দামের পার্থক্য অনেক বেশি।

এ কারণে পুরোনো যন্ত্রের চাহিদা বেশি। দেশে প্রতিবছর নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজারটি ছোট-বড় যন্ত্র আমদানি করা হয়, যার দাম প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। বছর পাঁচেক আগেও আমদানি করা হতো এক হাজার কোটি টাকার কম মূল্যের যন্ত্র। এর মধ্যে এক্সসিএমজির যন্ত্র আমদানি করা হয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকার।

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে খননযন্ত্র এক্সকাভেটর, ভারোত্তোলনের বিভিন্ন ধরনের লোডার ও হুইল ডোজারস, ভূমি সমান করার সোয়েল কমপেক্টর, পাইপ সঠিকভাবে স্থাপনের জন্য পাইপ লেয়ারস, ব্যাকহো লোডারস ইত্যাদি।আসুন, আমরা এবার আর্থমুভিং সলিউশন লিমিটেডের ব্যবসা শুরুর গল্প শুনি।

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কৃষক ও ব্যবসায়ী পরিবারের মুজিবুল হক ১৯৯৩ সালে ভর্তি হন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট)। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বা যন্ত্রপ্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষে ২০০১ সালে চাকরি নেন গ্রিনল্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রাক্টরস কোম্পানিতে (গেটকো)। একই সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগ থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন।

২০০৫ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে (পিডিবি)। সেই সুবাদে তিনি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। বদৌলতে নতুন কিছু করার ভাবনা মাথায় ঢোকে এবং স্বপ্ন দেখতে থাকেন। তাই সরকারি চাকরির ফাঁকে ফাঁকে এক নিকটাত্মীয়ের ব্যবসায় পরামর্শ দিতে শুরু করেন।

এর ফলে তাঁর হাত ধরে ওই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানও ভালো অবস্থায় পৌঁছায়। এরপর বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে জেনারেটর ও ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহের কাজ পান। এরই মধ্যে ঢাকার মগবাজার ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজের জন্য ভারী যন্ত্র সরবরাহের কাজও পান, যা তাঁকে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়।

সরকারি চাকরির সুবাদে যেসব কাজের সুযোগ পেয়েছিলাম, তাতে আমি নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা পেয়ে যাই। এরই ফসল এখনকার আর্থমুভিং সলিউশন। ইতিমধ্যে সহকারী প্রকৌশলী থেকে পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হয়ে যান মুজিবুল হক। তত দিনে চীনের ভারী যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এক্সসিএমজির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়।

২০১৭ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি আর্থমুভিং সলিউশন লিমিটেড নামে নতুন কোম্পানি গড়ে তোলেন। প্রথমে অফিস নেন মিরপুর ডিওএইচএসে। ওই বছরে ২ কোটি ২০ লাখ ডলারের নতুন ভারী যন্ত্র আমদানি করেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠান বছরে ৫ কোটি মার্কিন ডলার বা ৪২৫ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বিক্রি করে। আর্থমুভিং এখন যন্ত্রপাতি আমদানির পাশাপাশি বড় বড় ঠিকাদারের আমদানি প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করে এবং বিক্রয়োত্তর সেবা ও যন্ত্রের গ্যারান্টি সুবিধা দেয়।

মুজিবুল হক বলেন, ‘সরকারি চাকরির সুবাদে যেসব কাজের সুযোগ পেয়েছিলাম, তাতে আমি নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা পেয়ে যাই। এরই ফসল এখনকার আর্থমুভিং সলিউশন।’ তিনি বলেন, এখন ভারী যন্ত্র শুধু শহরে নয়, গ্রামেও পৌঁছে গেছে। সহজলভ্য হওয়ায় কৃষিযন্ত্রের মতো এসব যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে।

মুজিবুল হক বলেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজে এক্সসিএমজির যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারি চাকরি ছেড়ে ব্যবসায়ী হওয়া এই প্রকৌশলী জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান আর্থমুভিং সলিউশন শুধু এক্সসিএমজিরই নয়, একই সঙ্গে চীনের সিনোট্রাকেরও পরিবেশক।

দেশের বিভিন্ন নির্মাণকাজে এখন সিনোট্রাকের ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁরা বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার সিনোট্রাক যন্ত্র আমদানি করছেন। মুজিবুল হক জানান, আর্থমুভিং সলিউশনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এখন স্টিলের সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিমেন্ট কারখানা নির্মাণ করছে। এ ছাড়া ছোট আকারে আবাসন প্রতিষ্ঠান ও একটি বায়িং হাউসের ব্যবসা রয়েছে তাঁর।

মুজিবুল হকের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয় ঢাকার মিরপুরের মাজার রোডে অবস্থিত আর্থমুভিং সলিউশনের কার্যালয়ে। ভবনজুড়েই নিজেদের অফিস। সেখানে চীনা নাগরিকদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। মুজিবুল হক বলেন, ভারী যন্ত্রের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ব্যবসাও দিনে দিনে বড় হচ্ছে। সব বিভাগের জন্য অফিস নেওয়ার পরিকল্পনা করছি। কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এটি অন্য রকম স্বস্তি দেয়। তথ্যসূত্র: প্রথম আলো।

More News Of This Category