পেশা হিসেবে হিউম্যান রিসোর্স অফিসার!

দীর্ঘ ৭ বছরের চাকরি জীবনে মোস্তাফিজ সাহেবের ছুটি নেওয়ার তেমন কোনো প্রয়োজনই হয়নি। কিন্তু হঠাত্ অসুস্থ হওয়াতে দীর্ঘদিনের ছুটি প্রয়োজন হলো তার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ ছুটির আবেদন করেন মোস্তাফিজ সাহেব। তাকে অবাক করে দিয়ে ছুটির আবেদন মঞ্জুর করে তার প্রতিষ্ঠান। প্রচণ্ড অবাক হয় মোস্তাফিজ সাহেব। কিন্তু পাঠক, এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

মোস্তাফিজ সাহেবের মতো সকল কর্মকর্তা কর্মচারী সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য সদা অবগত রয়েছে স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের কর্মরত হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট নামক একটি বিভাগ। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিশাল কর্মপরিধির দায়িত্ব পালন করতে হয় এই বিভাগটিতে। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় যেকোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই হিউম্যান রিসোর্স বিভাগ নামে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ পরিচালনা করা হয়ে থাকে।

প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কর্মপরিধি যাই হোক না কেনো হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট অফিসারদের কাজের ধরণ প্রায় একই ধরনের। স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের লোকজন এবং তাদের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামনে যথাযথ তথ্য উপস্থাপন করাই একজন হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট অফিসারের মূল কাজ। যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই বিভাগের কর্মকর্তারা।

প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের বদলি, প্রমোশন, পোস্টিং, অবসরের সিদ্ধান্ত, অবসরকালীন পেনশন নির্ধারণ, চাকরি অবস্থায় প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে যেকোনো প্রকার সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রেখে চলে তারা। স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রেখে চলে এই বিভাগটি। প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের সময়ের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে যথাযথভাবে ট্রেনিং প্রদান অথবা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে থাকে তারা।

বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই মানব সম্পদ উন্নয়ন বিভাগটি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কর্মপরিধি এবং লোকবলের উপর নির্ভর করে মূলত নির্ধারিত হয়ে থাকে এই বিভাগের কর্মী সংখ্যা। প্রতিষ্ঠানভেদে মানব সম্পদ উন্নয়ন বিভাগের কর্মরত ব্যক্তির সংখ্যা ৫জন থেকে ২০ জন পর্যন্ত হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীক কর্মপরিধি এবং লোকবল যাই হোক না কেন মানব সম্পদ উন্নয়ন বিভাগের কর্মীরা মূলত কাজ করে থাকে প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় কেন্দ্রীক। কেননা, তাদের কাজের অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের।

যোগ্যতা ঃ এই পেশাতে আসতে হলে প্রার্থীকে অবশ্যই স্ব স্ব প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া একেক প্রতিষষ্ঠানে একেক রকম হলেও চাকরি প্রার্থীর জন্য কিছু প্রাথমিক যোগ্যতা থাকা আবশ্যক। বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠান মানব সম্পদ উন্নয়ন বিভাগে সরাসরি নিয়োগ দিয়ে থাকে আবার কেউ কেউ প্রথমে ট্রেইনি অফিসার এবং প্রবেশনারী অফিসার পদে নিয়োগ দিয়ে থাকে। এই পেশাতে একজন প্রার্থীকে অবশ্যই মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন হতে হয়।

সেই সাথে মানব সম্পদ উন্নয়নে ডিপ্লোমা ডিগ্রি প্রার্থীর যোগ্যতা সমৃদ্ধ করে নিঃসন্দেহে। বর্তমানে বাংলাদেশে এইচআরএম বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করার সুযোগ রয়েছে। এই পেশাতে এইচআরএম বিষয়ে শিক্ষা সম্পন্নকারী ব্যক্তিরা প্রাধান্য পেলেও শিক্ষাগত যোগ্যতা এই পেশাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখে না। কেননা, প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য থাকে যোগ্য ব্যক্তিকে এই পদে নিয়োগ দেয়ার। এই পদে যোগ্যতা হিসেবে একজন প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি নেতৃত্বগূণ, ধৈর্য্যগুণ সম্পন্ন, সদালোপী, সমস্যা সমাধানে পারদর্শীতা এবং লেবার ল’ সম্বন্ধে সমস্যা ধারণা রাখতে হয়।

এই পেশাতে প্রতিষ্ঠিত হতে একজন ব্যক্তির যথাযথ যোগ্যতার কোনো বিকল্প নেই। ক্যারিয়ার হিসেবে হিউম্যান রিসোর্স বিভাগে কর্মরত ব্যক্তি যথেষ্ট দায়িত্বপালন করে থাকে। প্রতিষ্ঠানের আকার এবং ব্যবসায়িক পরিধির উপর ভিত্তি করে এই বিভাগে কর্মরতদের বেতন ১৫-৪০ হাজার টাকা হয়ে থাকে। সেই সাথে প্রতিষ্ঠানের সকল সুযোগ সুবিধা তো থাকছেই। হিউম্যান রিসোর্স বিভাগে কর্মরতদের সবসময় প্রশিক্ষণ এ অংশগ্রহণ করতে হয় এবং সেই জ্ঞান প্রতিষ্ঠানের অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হয়।

একটি প্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়নে সবসময় কাজ করে যায় হিউম্যান রিসোর্স বিভাগের কর্মকর্তারা। প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সুন্দরভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের বিভিন্ন ধরনের কর্মসংশ্লিষ্ট ট্রেনিং প্রদানের ব্যবস্থা করে থাকে তারা। সেই সাথে কর্মরত ব্যক্তিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজসমূহ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারছে কিনা তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্বও এই বিভাগটির উপরই বর্তায়। মূলত এই বিভাগে কর্মরত ব্যক্তিরা স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।

সেইসাথে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীদের কর্মজীবনের সমস্ত তথ্য সংরক্ষণপূর্বক যথাসময়ে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষব্যক্তিদের অবহিত করণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলাবিধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলে। স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের যেকোনো নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কার্যসমাধান দায়িত্ব তাদেরকেই পালন করতে হয়। এই সফল দায়িত্ব পালন করতে একজন হিউম্যান রিসোর্স অফিসারকে যথেষ্ট জ্ঞানের অধিকারি হতে হয়। সেই সাথে দৃঢ়চেতা এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি ব্যতিরেকে এই পেশাতে উন্নতি করা সম্ভব নয়। নিজেকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে তুলনামূলক জ্ঞান অর্জন করতে হয়। সেই সাথে কর্মরত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শৃঙ্খলা বিধান করাও একজন হিউম্যান রিসোর্স অফিসারের অন্যতম কাজ।

আমাদের দেশে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর সংখ্যা চাকরির তুলনায় অনেকগুণ বেশি। ফলে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় সাফল্য সবসময় ধরা দেয় না। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই চাকরি সমন্ধে বিস্তারিত ধারণা না রেখেই চাকরির জন্য আবেদন করে থাকেন। কিন্তু আবেদনের পূর্বে যদি আবেদিত পদের বিপরীতে করণীয় কাজ সমন্ধে ধারণা অর্জন করা যায় তবে চাকরির বাজারে নিজের অবস্থানকে অন্যদের থেকে সমৃদ্ধ করা যাবে নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশে আধুনিক ধারার চাকরির বাজারে হিউম্যান রিসোর্স বিভাগে কর্মরতরা যথেষ্ট ভূমিকা রেখে চলেছে। ৎ

পেশা হিসেবে হিউম্যান রিসোর্স বিভাগটি আপনাকে খুব দ্রুতই সাফল্যের চূড়ায় নিতে সহায়তা করবে। তবে এই পেশাতে আসতে হলে আপনাকে অবশ্যই যথাযথভাবে যোগ্যতার মানদণ্ডে নিজেকে আসীন করতে হবে। সেই সাথে পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান এই পেশাতে আপনার স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথে অনেকদূর নিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। আপনার স্বপ্নকে বাস্তবায়নে আজ থেকে শুরু হোক নিজেকে পরিণত করার প্রয়াসে আপনার নবধারা। সাফল্যের হাত ধরে আগামীর পথচলাতে সফল হতে আপনার প্রয়াসই যথেষ্ট।

লেখক: জাহিদ আহম্মেদ, তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক ডটকম।

SHARE