পোষা প্রাণীর সাথেই যখন বন্ধুত্ব!

শুধু মানুষ নয়, বন্ধুত্ব হতে পারে অন্য প্রাণীর সঙ্গেও। সুখ কিংবা দুঃখও যেন তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা যায়। পোষা প্রাণীটির সঙ্গে আনমনে কথাও বলেন কিন্তু অনেকে। পাশ্চাত্যে তো বটেই, আমাদের দেশেও অনেকে প্রাণী পোষেন বাড়িতে।

বাড়িতে কুকুর, বিড়ালের মতো পোষা প্রাণী আনার পর দায়িত্বের শেষ নয়, বরং বলা যায় শুরু। ওদের যত্ন নেওয়া, ওদের সময় দেওয়া এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে খেয়াল রাখার কাজগুলো করতে হবে পরিবারের সবাইকে মিলে। রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিশেষজ্ঞ প্রাণী চিকিৎসক কে বি এম সাইফুল ইসলাম জানালেন এমনটাই। পোষা প্রাণীর যত্নে তিনি দিলেন বেশ কিছু পরামর্শ।

সবার আগে পরিচ্ছন্নতা
পোষা প্রাণীর সুস্থতার পাশাপাশি বাড়ির সদস্যদের সুস্থতার জন্য শখের সঙ্গীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে সবার আগে। এমনিতে নোংরা না হলে গোসলের প্রয়োজন নেই। ঘন ঘন গোসলে ত্বকের তৈলাক্ত ভাব নষ্ট হয়, ত্বকের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। গোসল ছাড়াই পরিষ্কার রাখতে নিয়মিত লোম আঁচড়ে দিন (ব্রাশ করা)। বাজারে ‘ড্রাই রিনজ’ পাবেন। এটি স্প্রে করে শুকনা তোয়ালের সাহায্যে ভালোভাবে মুছে দিতে পারেন। এটি গোসলের মতোই কার্যকর। মোটামুটিভাবে ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রার পানিতে গোসল করাতে পারেন। রোমশ কুকুর-বিড়ালের জন্য বিশেষ শ্যাম্পু ব্যবহার করা যায়। গোসলের পরপরই মুছে নিন। চাইলে হেয়ারড্রায়ারের সহায়তা নিতে পারেন। প্রস্রাব-পায়খানার স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করুন; খেয়াল রাখুন যেন তা ভেজা না থাকে।

আরাম-ঘুম
তুলার বিছানা আরামদায়ক। তবে যদি আপনার সঙ্গে ঘুমায়, খেয়াল রাখুন কাঁথা-চাদর-বালিশের নিচে যেন ঢাকা পড়ে না যায়। এ রকম হলে শ্বাস আটকে যেতে পারে, মেরুদণ্ড এবং শরীরের অন্যান্য অস্থি ও অস্থিসন্ধিতে (জয়েন্ট) আঘাত লাগতে পারে। খরগোশ, গিনিপিগের মতো প্রাণী থাকলে খড়ের টুকরা, ধানের তুষ, কাঠের গুঁড়া প্রভৃতি দিয়ে বিছানা করা যায়।

হঠাৎ বিপদ?
গরম-ঘামে লবণ-পানির ঘাটতি হলে খাওয়ার স্যালাইন দিতে পারেন। এক চা-চামচ ভিটামিন সি সিরাপ (মানুষের জন্য তৈরি, প্রাণীদেরও উপযোগী) ২৫০ মিলিলিটার পানিতে মিশিয়ে খাওয়াতে পারেন। কে বি এম সাইফুল ইসলাম জানালেন, প্রচণ্ড গরমে ওদেরও হিট স্ট্রোক হয়। মুখ হা করে ঘন ঘন শ্বাস, অস্থিরতা, লালা পড়া, বমি, পাতলা পায়খানা এবং নিস্তেজ ভাব হলে প্রাণীটিকে দ্রুত শীতল স্থানে নিন। প্রয়োজনে আইস প্যাক ব্যবহার করুন।

বিভিন্ন মৌসুমে ফ্লু, নিউমোনিয়া ও ত্বকের সমস্যা হয়। ত্বকের সমস্যার লক্ষণ—কোনো নির্দিষ্ট অংশের লোম পড়ে যাওয়া, লাল হওয়া, আঁশের মতো অংশ দেখা যাওয়া, ফুসকুড়ি, চুলকানি ইত্যাদি। পরজীবীর সংক্রমণও হয় (যেমন ফ্লি, টিক)। টিকের কারণে জ্বর, এমনকি প্যারালাইসিসও হয়। ফ্লি থাকলে পরবর্তী সময়ে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে শরীরে পচনও ধরতে পারে।

সবচেয়ে মারাত্বক হলো বিড়ালের প্যানলিউকোপেনিয়া (ভাইরাসজনিত রোগ—শ্বেত রক্তকণিকা বিপজ্জনক হারে কমে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়) এবং কুকুরের ‘পারভো’ ভাইরাস ও ‘হার্ট ওয়ার্ম’ সংক্রমণ (মশাবাহিত রোগ)।

বিভিন্ন রোগের সাধারণ রোগ হলে ক্ষুধামন্দা, বমি, পাতলা পায়খানা, অবসন্নতা, পানিশূন্যতা প্রভৃতি দেখা যাবে। বিপদচিহ্ন হলো দুর্গন্ধযুক্ত পাতলা পায়খানার সঙ্গে বমি এবং শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া। বমি বা পাতলা পায়খানায় স্যালাইন খাওয়ানো বাধ্যতামূলক।

নিয়মিত টিকা ও কৃমিনাশক দিন। যেকোনো সমস্যায় প্রাণী চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। একই লক্ষণ ভিন্ন রোগেও হয়; পূর্বে একই লক্ষণে দেওয়া ওষুধ আবার সেই লক্ষণের জন্য কার্যকর হবে এমনটা নয়। মানুষ ও প্রাণীদের অনেক ওষুধ একই হলেও মাত্রা (ডোজ) ভিন্ন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ দেবেন না। হিতে বিপরীত হবে।

আরও কিছু
• পোষা প্রাণীদের আবদ্ধ স্থানে রাখবেন না। পচা-বাসি খাবার দেবেন না।
• লম্বা ও ভারী লোম থাকলে গরমের সময় ছেঁটে দিন, আরামবোধ করবে।
• ভিটামিন ডি তৈরিতে রোদ প্রয়োজন। প্রতিদিন কিছুক্ষণ রোদে থাকতে দিন।
• নবজাতকদের মায়ের সংস্পর্শে রাখুন। তুলার তৈরি বিশেষ বিছানা দিতে পারেন।
• এবার পোষা কুকুর-বিড়ালের যত্ন নিয়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো। পরবর্তী সময়ে নকশায় পোষা মাছ ও পাখির যত্নআত্তি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো ডটকম।

SHARE