1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

বঙ্গবন্ধু ট্যানেলে সুরঙ্গ তৈরীর অর্ধেক কাজ শেষ

তিনতলার সমান উচ্চতার ক্যাপসুল আকারের এক যন্ত্রদানব। নাম ‘টিবিএম’ বা টানেল বোরিং মেশিন। যন্ত্রটি চট্টগ্রাম শহরের প্রান্তে নেভাল একাডেমির কাছে কর্ণফুলী নদীর কোল ঘেঁষে মাটির ১২ মিটার গভীরে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বসানো হয়েছে। এই দানব এখন শোঁ শোঁ শব্দ করে নদীর তলদেশের নিচ দিয়ে মাটি কেটে অন্য পাড়ে আনোয়ারা উপজেলার দিকে ছুটে চলেছে।

এসেছে সে সুদূর চীন থেকে। মুখের ধারালো দাঁতে মাটি কাটতে কাটতে ২৪ ঘণ্টায় ১০ মিটার পথ তৈরি করে সে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে তার লেজ কংক্রিটের গোল চাকতি বসিয়ে চারদিকে গোলাকার শক্ত দেয়াল তৈরি করছে। কাটা মাটি পাইপ দিয়ে সরে যাচ্ছে।

টিবিএম যত এগোচ্ছে, ততই ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর নিচে পরিকল্পিত স্বপ্নের সুড়ঙ্গ। শত শত প্রকৌশলী ও শ্রমিকের শ্রমে-ঘামে রচিত হচ্ছে এই বঙ্গবন্ধু টানেল। কংক্রিটের চাকতিগুলো একটি রেলপথ বেয়ে সুড়ঙ্গে টিবিএমের কাছে পৌঁছাচ্ছে। আটটি চাকতি জুড়ে গিয়ে দুই মিটারের একটি করে রিং বা পাত

তৈরি হচ্ছে। পাতে পাতে গড়গড়িয়ে চলেছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশের গভীরে বহু লেন সুড়ঙ্গপথ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ, যার দৈর্ঘ্য হবে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার। এক প্রান্তে পতেঙ্গার নেভাল একাডেমি থেকে শুরু হয়ে পথটি কাফকো ও সিইউএফএল সীমানার মাঝখান দিয়ে উঠে কর্ণফুলী-আনোয়ারা প্রান্তে সংযোগ ঘটাবে।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, এটি সরকারের গর্ব করার মতো মেগা প্রকল্পগুলোর একটি। নদীর তীরে দ্রুতগতিতে চলছে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজও। নির্মাণসহ প্রকল্পের মোট কাজের প্রায় অর্ধেক শেষ হয়েছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সুড়ঙ্গপথটি গাড়ি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

তখন নদীর দক্ষিণ পারে কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলা মূল নগরের সঙ্গে যুক্ত হবে। চীনের সাংহাইয়ের আদলে দুই শহর ও এক সিটি হবে চট্টগ্রাম। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’ নামের এই পথ হবে দেশে নদীর তলদেশে সুড়ঙ্গপথ নির্মাণের প্রথম প্রকল্প। ভারতের কলকাতা শহরেও গঙ্গা নদীর তলদেশে মেট্রোরেলের জন্য একটি সুড়ঙ্গপথ তৈরি হচ্ছে। তবে সেটির দৈর্ঘ্য কম, ৫২০ মিটার।

বঙ্গবন্ধু টানেল কক্সবাজারের সঙ্গে চট্টগ্রামের দূরত্বও ৩৪ কিলোমিটার কমিয়ে দেবে। তবে তার জন্য সুড়ঙ্গপথের মুখ থেকে বাঁশখালী ও পেকুয়া হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণ করতে হবে। টানেলের সঙ্গে বর্তমানে নির্মাণাধীন পতেঙ্গা সমুদ্র উপকূলঘেঁষা আউটার রিং রোডের সংযোগ থাকছে। এতে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের গাড়ি চট্টগ্রাম শহরকে এড়িয়ে সুড়ঙ্গপথ দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে চলাচল করতে পারবে। চট্টগ্রাম নগরে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে।

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী এলাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি স্টেশনসহ জ্বালানিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। বঙ্গবন্ধু টানেল সেগুলোর সঙ্গে পুরো বাংলাদেশের যোগাযোগ সহজ করবে। আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চায়না অর্থনৈতিক অঞ্চল, কোরিয়ান ইপিজেডসহ অন্যান্য শিল্পকারখানার সঙ্গেও যোগাযোগব্যবস্থা সুগম হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে চায়নিজ এক্সিম ব্যাংক। বাকি খরচ বাংলাদেশ সরকারের। কাজের মেয়াদ ধরা হয়েছে পাঁচ বছর।

প্রকল্পের কর্মযজ্ঞ: গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু টানেলের খননকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই দিন তিনি প্রকল্পের নির্মাণক্ষেত্র বা কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড পরিদর্শন করেন। সুড়ঙ্গপথটির এক-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থাৎ প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ নদীর নিচে থাকবে। ৬ ডিসেম্বর নাগাদ এক কিলোমিটারের মতো খননকাজ শেষে সুড়ঙ্গে কংক্রিটের পাত লাগানো হয়ে গেছে।

কর্ণফুলী নদীর তলদেশের নিচে ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরতায় দুটি টিউব বা সুড়ঙ্গপথ হবে। একটি দিয়ে শহর থেকে গাড়ি আনোয়ারার দিকে যাবে, অন্যটি দিয়ে শহরে গাড়ি ঢুকবে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাঁ দিকের টিউবের নির্মাণকাজ চলছে। প্রতিটি টিউব চওড়ায় ৩৫ ফুট এবং উচ্চতায় প্রায় ১৬ ফুট।

টিউব দুটির জন্য কর্ণফুলীর পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে মোট পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সংযোগ সড়ক এবং ৭২৭ মিটার সেতু সড়ক বা ওভারপাস তৈরি করা হচ্ছে। খনন ও টিউব বসানোর পাশাপাশি দুই পাশের সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজও সমানতালে চলছে।

প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড প্রকল্পের অর্ধেকের মতো কাজ শেষ করেছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২২ সালের ডিসেম্বর নাগাদ সুড়ঙ্গপথ তৈরি হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, এ পথ চালু হলে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে কর্ণফুলীর দক্ষিণাংশের যোগাযোগ সুগম হবে। কক্সবাজারের সঙ্গে চট্টগ্রামের দূরত্ব অনেক কমে যাবে।

প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছিল ২০১৫ সালের নভেম্বরে। নির্মাণযজ্ঞটি বিশাল। সুড়ঙ্গ বানিয়ে পথপাত বসিয়ে পথ তৈরির পাশাপাশি নদীর দুই ধারে পতেঙ্গা আর আনোয়ারায় সুড়ঙ্গপথের মুখ নির্মাণ করতে হবে। সংযোগ সড়কের বড় অংশটিই পতেঙ্গার প্রান্তে। আনোয়ারায় সেতু সড়কের কাজ। রাত-দিন তিন পালায় চীনের ২৭১ জন এবং বাংলাদেশের ৬৬২ জন প্রকৌশলী ও শ্রমিক কাজ করছেন। এভাবে চললে এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভূমিকম্প না হলে নির্মাণকাজ সময়মতো শেষ হবে বলে আশা আছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া কাজের অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্ট। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, উপমহাদেশের মধ্যে এটি প্রথম নদীর নিচে দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ। মেট্রোরেল চলাচলের জন্য কলকাতার গঙ্গায় যে সুড়ঙ্গপথটি হচ্ছে, তার দৈর্ঘ্য মাত্র আধা কিলোমিটার।

সুভাষ বড়ুয়া কর্ণফুলীর দুই প্রান্তে সংযোগ সড়ক চওড়া না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, রাস্তা না বানালে টানেলের বহুমুখী ব্যবহার করা যাবে না। তিনি মনে করেন, আনোয়ারার প্রান্তে দ্রুত শিল্পকারখানা গড়তে হবে। বাঁশখালী হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত চার লেন সড়ক এবং শহরের আউটার রিং রোডের সাগরিকা আর বড় পোলের জংশন চওড়া করার কাজও এখনই শুরু করতে হবে।

বিকল্প সড়কের ডিপিপি: আনোয়ারায় টানেলের মুখ থেকে বাঁশখালী ও পেকুয়া হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত চার লেন সড়কের নির্মাণকাজ এখনই শুরু হলে সুড়ঙ্গপথের সুফল দ্রুত পাওয়া যেত—এ কথা অনেকের মুখেই শোনা যায়। কিন্তু সরেজমিনে সে সড়ক নির্মাণের তোড়জোড় বিশেষ চোখে পড়ে না। বঙ্গবন্ধু টানেলের সঙ্গে সংযুক্ত সড়কটি হলে বন্দরনগরীর সঙ্গে সৈকতের জেলা কক্সবাজারের দূরত্ব ৩৪ কিলোমিটার কমত।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, এ সড়ক নির্মাণের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রণয়নের কাজ চলছে। প্রস্তাব পেলে প্রকল্প অনুমোদনের পর কাজে হাত দেওয়া হবে। তিনি মনে করছেন, তাতে বেশি সময় লাগার কথা নয়।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম সড়কটি নির্মাণের জোর তাগিদ দিয়ে বলেন, এ সড়ক নির্মাণের আগে সুড়ঙ্গপথটি চালু হলে এর পুরো ফায়দা ওঠানো যাবে না। তিনি বলেন, প্রায় ১১ বছর আগে মূল শহরের সঙ্গে সংযোগ সড়ক নির্মাণের আগেই কর্ণফুলীর ওপর শাহ আমানত সেতু চালু করা হয়েছিল। সেটির সুফল পাওয়া যাচ্ছে এত দিনে, বহদ্দারহাটের সঙ্গে সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ হওয়ার পর।

চেম্বার সভাপতির আশঙ্কা, একইভাবে এখন বঙ্গবন্ধু টানেলের মুখ থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়কটি করা না হলে সুড়ঙ্গপথের পুরোপুরি আর বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চিত হবে না। তথ্যসূত্র: প্রথমআলো।

More News Of This Category