1. uddoktarkhoje@gmail.com : uddoktarkhoje :

বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প বাঁচাতে মা-ছেলের লড়াই

এলিজা সুলতান সাধারণ গৃহবধূই ছিলেন। সংসার সামলাতেন, বাচ্চাদের বড় করাই ছিল তাঁর কাজ। এখন পারিবারিক বড় ব্যবসা সামলানোর দায়িত্ব তাঁর এবং তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে সোহেল আহমেদ সুলতানের ওপর। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা সামলানো হয়তো কঠিন কোনো কাজ নয়। কিন্তু এলিজার বিষয়টি ভিন্ন।

তাঁদের বড় কারখানাটি বিপুল ঋণের বোঝা নিয়ে দুই বছর বন্ধ ছিল। এলিজা দায়িত্ব নিয়ে কারখানা চালু করলেন, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমালেন, বিপণনে নজর দিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই কারখানা পরিচালন মুনাফার দেখা পেল। রুগ্‌ণ শিল্পে পরিণত হওয়া কারখানায় কর্মরত আড়াই হাজার শ্রমিকের পরিবার দেখল আশার আলো।

এলিজা সুলতানের এখন বড় চিন্তা কীভাবে ব্যাংকের ঋণ শোধ করবেন। তার পরিকল্পনাও করেছেন তিনি। আগে বললেন মাদার টেক্সটাইলের কথা। কারখানাটির প্রতিষ্ঠাতা সুলতান আহমেদ, এলিজা সুলতানের শ্বশুর। এলিজা জানান, সুলতান আহমেদ ছয় দশক আগে বস্ত্রকলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে একটি ববিন (সুতা প্যাঁচানোর চাকা) কারখানা করেন। দেশের বস্ত্রশিল্পের উত্থানপর্বে তিনি তুলা আর যন্ত্রপাতির ব্যবসায় নেমে বিপুল অর্থের মালিক হন।

নব্বইয়ের দশকে দেশের শীর্ষ ধনীদের একজন ছিলেন সুলতান আহমেদ। ১৯৯০ সালে সুলতান আহমেদ নিজেই একটি টেক্সটাইল মিল প্রতিষ্ঠা করেন, নাম দেন মাদার টেক্সটাইল। এলিজা বলেন, ১৯৯৩, ১৯৯৬, ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে চার দফায় নিজের বিনিয়োগ ২৪৬ কোটি টাকার সঙ্গে রূপালী ব্যাংক থেকে ১১১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কারখানা সম্প্রসারণ করেন সুলতান আহমেদ।

ব্যবসার বিপদ শুরু হয় কারখানায় গ্যাস–সংযোগ না পেয়ে। এলিজা সুলতান বলেন, ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বর্ধিত প্রকল্পে গ্যাস–সংযোগ না পাওয়ায় কারখানা বন্ধ ছিল। নতুন ইউনিট প্রতিষ্ঠার পর এক দফায় তুলা আনা হয়েছিল, যা কারখানা চালু না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। কারখানা বন্ধ থাকলেও ব্যাংকঋণের সুদ বাড়তে থাকে।

নতুন যন্ত্রপাতি অকার্যকর হতে থাকে। একপর্যায়ে ব্যাংক ২০০১ সালে ঋণপত্র খোলা সীমিত করে দেয়, যা অব্যাহত ছিল ২০০৬ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০০৯ সাল পর্যন্ত ঋণপত্র খোলা স্থগিত করে রাখা হয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে। ২০১০ সালের পর আরেকটি বড় ধাক্কা বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে। ওই বছর থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজারে তুলা ও সুতার দাম ছিল অস্থির।

ব্যাংকঋণ, কারখানা বন্ধ থাকা, আড়াই হাজার শ্রমিকের বেতন-ভাতা দিতে বিপুল অর্থের জোগান দেওয়া ইত্যাদি নানা দুশ্চিন্তায় ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সুলতান আহমেদ। প্রায় দেড় বছর তিনি বিদেশে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সুলতান আহমেদের একমাত্র ছেলে শোয়েব সুলতান ১২ বছর ধরে ফুসফুসের দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত। ফলে তাঁর পক্ষেও কখনো কোম্পানির দায়িত্বে যুক্ত হওয়া সম্ভব হয়নি।

দায়িত্ব পড়ল পরিবারের পুত্রবধূ এলিজা সুলতানের ওপর। এখন তিনি মাদার টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন পরিস্থিতিতে মা আর ছেলে মিলে কোম্পানির সমস্যাগুলো খুঁজে বের করলেন।

রাজধানীর মতিঝিলে সেনাকল্যাণ ভবনে মাদার টেক্সটাইলের কার্যালয়ে এই প্রতিবেদককে রুগ্‌ণ কারখানা জাগিয়ে তোলার চেষ্টার কথা শোনান এলিজা সুলতান, সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছেলে সোহেল আহমেদ সুলতান। সোহেল আহমেদ ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে পড়ছেন।

এখন মাদার টেক্সটাইলের মাথায় ঋণের বোঝা ৭২৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এলিজার দাবি, এই ঋণের মধ্যে ব্যাংকের আসল টাকা ৪৬৫ কোটি টাকা। বাকি ২৬৩ কোটি টাকা অপরিশোধিত আরোপিত সুদ। এর বাইরে অনারোপিত সুদ রয়েছে ১৮৫ কোটি টাকা। এটা তিনি ব্যাংকের কাছে মওকুফ চেয়েছেন।

পরিস্থিতিগত কারণে মাদার টেক্সটাইলের অবস্থা খারাপ হলেও এ গ্রুপের অন্যান্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করছে। যার মধ্যে রয়েছে ইউরো এশিয়া মেট্রেস, বেডিং ও ইউরো ফার্নিচার। এর মধ্যে ইউরো ফার্নিচারের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন সোহেল আহমেদ সুলতান।

ইউরো এশিয়া মেট্রেস ও ইউরো ফার্নিচার প্রতিষ্ঠান দুটি বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের নিয়মিত ও ভালো গ্রাহক। একইভাবে মাদার টেক্সটাইলকেও ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখতে রাজি নন এলিজা সুলতান। মাদার টেক্সটাইল গাজীপুরে ৭৫ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এতে আড়াই হাজার শ্রমিক কাজ করেন।

এলিজা সুলতান বলেন, ‘নানামুখী সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় আমরা ব্যাংকের টাকা সময়মতো শোধ করতে পারিনি। ব্যাংকের ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচারের কোনো উদ্দেশ্যও আমাদের নেই। গ্যাস না পাওয়া, ব্যাংকের অসহযোগিতা আর বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আমরা ঋণ শোধ করতে পারিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ঋণ শোধ করব। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

More News Of This Category