1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

বিডি সাইক্লিস্টের অন্যরকম সফলতার গল্প!

রাস্তায় বের হলেই ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোর মানুষগুলোকে জেঁকে বসে চিরচারিত জ্যাম। এই জ্যাম থেকে বাঁচতে পথ আলাদা করার কোনো সুযোগও নেই। কিন্তু মানুষ চায় সময় বাঁচাতে। বসে থেকে এই সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না। তাই নিজেরাই বেছে নিয়েছেন নতুন উপায়।

সাইকেলে চেপেই বেরিয়ে পড়ছেন যেখানে খুশি। এই বাহনটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম যে সংগঠন গড়ে ওঠে সেটি ‘বিডি সাইক্লিস্ট’। তাদের পথচলার গল্প নিয়ে আজকের আয়োজন— বুরাজধানীর ঝিগাতলার একটি রেস্টুরেন্টে বাংলাদেশের প্রথম সংঘবদ্ধ সাইক্লিস্ট দল বিডি সাইক্লিস্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা মোজাম্মেল হকের সঙ্গে। তার মুখ থেকেই আমরা শুনি শুরুর গল্পটা।

‘২০০৯ সালের কথা। আমি তখন খুব দৌড়াতে পছন্দ করতাম। আমি নিজে নিজেই দৌড়াতাম, মনে হতো যে আমরা সারাদিন কাজ করার পর কিছু একটা করা দরকার। বসে থাকার জন্য আমাদের বডি তৈরি হয়নি। আমাদের পূর্বপুরুষরা সবসময় কিন্তু শারীরিক পরিশ্রম করত। কিন্তু তখনকার মতো সেভাবে পরিশ্রম করার সুযোগ এখন নেই। তাই আমি সেই চিন্তা ভাবনা থেকে নিয়মিত দৌড়াতাম।

আমি তখন একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। সেখানে ব্রায়ান ম্যাগগয়্যার নামের একজন অফিসের ইমিডিয়েট বস ছিলেন। তিনি আমাকে একবার বললেন, নেপালের একটা হলিডে বাইসাইকেল রাইডে অংশগ্রহণ করতে। নেপালে তিনি মাউন্টেন বাইক করতেন। তো তার কথায় আমিও রাজি হলাম। ২০১০ সালের শেষের দিকে নেপালে গেলাম,’ বললেন মোজাম্মেল হক।

বিডি সাইক্লিস্ট-এর শুরু: নেপালে গিয়ে চোখ খুলল মোজাম্মেল হকের। যে বাইসাইকেলটা দিয়ে তিনি পাহাড়ে ট্রেইল করেন, সেটা এত হালকা ও মজবুত ছিল যে তিনি রীতিমতো সাইকেলটার প্রেমে পড়ে গেলেন। সেই সঙ্গে চিন্তাও করলেন, আমি যদি সাইকেলটা কিনে নিয়ে যাই, তাহলে বাসা থেকে অফিস যেতেও আমার খুব বেশিক্ষণ লাগবে না।

সেই ভাবনা থেকে তিনি সাইকেলটি কিনে নিয়ে আসেন নেপাল থেকে। শুরু হলো বাইসাইকেলে চেপে অফিসে যাতায়াত। যেখানে আগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাগত, বাইসাইকেলে সময় লাগে ২০-২৫ মিনিট! সময় বাঁচানোর ক্ষেত্রে তার এই সাফল্য অফিস কলিগ ও অন্য পরিচিতজনদের উত্সাহিত করে।

এরপর তাদেরকে তিনি বিদেশ থেকে সাইকেল এনে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। কারণ ২০১১ সালে দিকে বাংলাদেশে ভালো মানের কোনো সাইকেল পাওয়া যেত না। যে সাইকেলগুলো বাজারে পাওয়া যেত সেগুলো বেশিদিন চালানোর উপযোগী ছিল না। মোজাম্মেল হকের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় আস্তে আস্তে সাইক্লিস্টদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

তখনো মোজাম্মেলের কোনো পরিকল্পনা ছিল না একটা সংগঠন করার। কিন্তু যখন দিন দিন মানুষের আগ্রহ বাড়ছে দেখতে পেলেন, তখনই মাথায় কিছু একটা করার বিষয় চলে আসে। সব ভেবে মোজাম্মেল ও তার সহযোগীরা ফেসবুকে খুলে ফেললেন—বিডি সাইক্লিস্ট গ্রুপ। দিনে দিনে আরও তরুণ-তরুণীরা যোগ দিলেন তাদের দলে।

প্রতি সপ্তাহে একদিন দলবেঁধে তারা সারা শহরে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তারা নিজেদের যাত্রার সময় ও স্থান ঠিক করে নেন। তবে প্রথম দিকে ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছিল তাদের প্রথম পছন্দ। কারণ, এটি সবার জন্য উপযুক্ত একটি জায়গা। ২০১১ সালের ১৭ মে মাসে মূলত প্রতিষ্ঠিত হয় বিডি সাইক্লিস্ট। তখন সদস্য ছিল ২০-২২ জনের মতো। আর বর্তমানে তাদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার।

চিন্তার বাইরের কিছু কথা! সাইক্লিংয়ের গল্প শুনতে শুনতে পেরিয়ে গেল অনেকটা সময়। এর মাঝেই প্রশ্ন করে বসলাম, এখন পর্যন্ত বিডি সাইক্লিস্ট-এর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী? কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি বললেন আমার চিন্তার বাইরের কিছু কথা! ভেবেছিলাম তিনি বলবেন তাদের রেকর্ডের কথা।

পাঠকদের মনে করিয়ে দিই আরেকবার, ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ‘লঙ্গেস্ট সিঙ্গেল লাইন অব বাইসাইকেল মুভিং’ ক্যাটেগরিতে নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল বিডি সাইক্লিস্ট। ১১৮৬ জন সাইক্লিস্ট নিয়ে এক সারিতে সাইকেল চালিয়ে এই রেকর্ড গড়ে গ্রুপটি।সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি নিয়ে তিনি বললেন, ‘একসময় ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে সাইকেলে অফিস যাতায়াতকারীর সংখ্যাটা ছিল না বললেই চলে।

কিন্তু বিডি সাইক্লিস্ট অনেক সংখ্যক মানুষকে সাইকেলে যাতায়াত করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এমনও দেখা গেছে যে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মালিক আর তার দারোয়ান একসঙ্গেই সাইক্লিং করছে। এমনকি এটাও হয়েছে যে, আমার বাসার দারোয়ানসহ আরো অনেকেই আমাদের গ্রুপে যোগ দিয়েছে। যেটা মানুষে মানুষে দূরত্ব কমে আসারই লক্ষণ। এটাই আমাদের পাওয়া।’

বাইক ফ্রাইডে- বিড়ি সাইক্লিস্ট-এর সাপ্তাহিক কার্যক্রমগুলোর অন্যতম হলো বাইক ফ্রাইডে। যেটা প্রতি শুক্রবার হয়ে থাকে। এটা বিগিনার থেকে মডারেট লেভেলের জন্য। এটা শুরু হয় সকাল ৬টা থেকে। প্রায় ৪-৫ ঘণ্টার রাইড। আর শনিবারে আরো একটা রাইড হয়, এই রাইডটি এক্সপার্টদের জন্য।

মোজাম্মেল হক বলেন, ‘ঢাকা শহরের ছেলেমেয়েরা ঘরে বন্দি হয়ে থাকে। তাদের চেনা-জানার গণ্ডিটাই অনেকটা কম্পিউটার আর ছোট্ট ক্যাম্পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যে কারণে তারা নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক বা অন্য কিছুতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সাইকেল তাই তরুণদের একধরনের অ্যাডভেঞ্চার হতে পারে। নিজের মনকে আনন্দ দিতে বা শরীর ফিট রাখতে সাইকেল চালানো যেতে পারে।’

শুক্রবার ভোরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে দেখা পেলাম অসংখ্য সাইকেলিস্টদের। এরা সবাই বিডি সাইক্লিস্ট-এর সদস্য। তাদের মধ্যে একজন ইয়াসির। তাকে জিজ্ঞেস করলাম সাইক্লিংয়ের প্রতি এত ভালোবাসা কেন? এই প্রশ্নের উত্তরটা ছিল এমন, ‘সাইকেল পরিবেশবান্ধব। সাইকেল ব্যবহারে জ্বালানিও বাঁচে। আবার একসঙ্গে শরীরচর্চাও হয়ে যাচ্ছে।

একজন সাইক্লিস্ট অন্য যেকোনো সাধারণ মানুষের চেয়ে শারীরিকভাবে অনেক বেশি সুস্থ থাকে। আর সাইক্লিস্টদের কাছে স্বাধীনতার আরেক নাম সাইকেল। যেটা চাপিয়ে যেখানে খুশি যাওয়া যায়। যখন যেখানে যেতে মন চাইবে, সাইকেলটা সঙ্গী করে রাস্তায় নেমে পড়লেই হলো!’

সাইক্লিং হলো শ্রেষ্ঠ ব্যায়াম: বেশ কয়েক বছর সাইক্লিংয়ের সঙ্গে জড়িত আছেন সাগর। তিনি জানালেন, আজকাল বিভিন্ন আবাসিক এলাকার প্রশস্ত রাস্তায় তরুণ-তরুণীদের সকাল-সন্ধ্যায় সাইকেল চালিয়ে ব্যায়াম করতে দেখা যায়। সহজ ও কম খরচে, সাইক্লিং হলো শ্রেষ্ঠ ব্যায়াম। সাইক্লিং পেশি শক্তিশালী করে। সাইক্লিং শুধু পায়ের ব্যায়াম নয়।

নিয়মিত সাইকেল চালালে আমাদের শরীরের প্রতিটি পেশিতে চাপ পড়ে, ফলে পেশি সুগঠিত ও শক্তিশালী হতে সাহায্য করে। তা ছাড়া হূদরোগের ঝুঁকি কমে। সাইক্লিং আমাদের হার্ট, ফুসফুস এবং রক্তচাপের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখে। আর এভাবে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়।আমাদের দেশে সাইকেল চালানোর জন্য এখনো আলাদা লেন তৈরি হয়নি। সেজন্যই কিছুটা সাবধান হওয়া দরকার বলেও জানালেন মোজাম্মেল হক। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় সাইক্লিং করা সহজ নয়।

এক্ষেত্রে নিজের সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, সাইকেল কেনার সময় নিরাপত্তা গিয়ার ঠিক আছে কি না চেক করে নেওয়াটা জরুরি। সব সময় রাস্তার একপাশ দিয়ে সাইকেল চালাতে হবে। বাই সাইকেল চালালেও ট্রাফিক আইন মেনে চলুন। কখনই খুব দ্রুত সাইকেল চালানো যাবে না। হেলমেট ব্যবহার করুন। তা ছাড়া সাইকেল চালানোর সময় অনেক ঘামতে হয়। তাই ক্লান্তি দূর করতে সঙ্গে এক বোতল পানি, স্যালাইন বা জুস রাখুন।

সাইক্লিস্টদের আলাদা লেন- বিড়ি সাইক্লিস্ট নিয়ে তাদের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা শুনতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমরা চাই ঢাকাকে একটি সাইকেলবান্ধব শহরে পরিণত করতে। ঢাকায় এখন মাত্র দু-একটি জায়গায় সাইকেলের জন্য আলাদা লেন রয়েছে। আমরা চাই ঢাকার প্রতিটি রাস্তা সাইক্লিস্টদের আলাদা লেন থাকুক। আর সেজন্য সরকারের সঙ্গে আমরা শিগগিরই বসব।

মোজাম্মেল হকের যুক্তি, ‘আমাদের গড় আয়ু যদি ৬৫-৬৭ বছর ধরি, তাহলে যানজটেই কেটে যায় ১০-১২ বছর। অথচ বাইসাইকেলে অফিসে যাতায়াতের ফলে ওই সময়গুলো বেঁচে যাচ্ছে আমার। এই সময়টায় কত কিছুই না করতে পারি!’ ভালোবাসাটা কতটুকু গভীর হলে হাজারো তরুণ-তরুণী শত ব্যস্ততার মাঝেও সাইকেল চালানোর জন্য প্রতিদিন কিছুটা হলেও সময় ঠিকই খুঁজে নেয়।

এছাড়া প্রয়োজনীয় কাজে তো সাইকেলের ব্যবহার আছেই। বিডি সাইক্লিস্ট প্রতি সপ্তাহেই নিয়মিত সাইকেল র্যালি আয়োজন করে। এছাড়া বিশেষ দিবসগুলোয় বিশেষ সাইকেল র্যালি তো আছেই। অংশগ্রহণ করতে চান? একটা সাইকেল নিয়ে প্যাডেল মেরে চলে আসুন। ব্যস, হয়ে গেল। সাইকেল চালানোর আনন্দ তো পাবেনই, বাড়তি পাওনা নতুন কিছু অসম্ভব বন্ধুসুলভ মানুষের সান্নিধ্য। এছাড়া বিডি সাইক্লিস্ট গ্রুপের সদস্যরা ছোটখাটো সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ করে আসছে বহুদিন ধরেই। তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক।

More News Of This Category