বুদ্ধিমানের মত পরিশ্রম করে জীবনে সফলতা এনেছেন!

মরুভুমিতে বালু বিক্রি, সমুদ্রপাড়ে দাঁড়িয়ে বাতাস বিক্রি, অথবা বরফের দেশে ফ্রিজ বিক্রি সহজ কাজ নয়। অথচ এমন কিছু মানুষ আছে যারা শুধুমাত্র আত্মবিশ্বাস আর বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে অসাধ্য কাজটিও করে ফেলে খুব সহজে। সেই মানুষগুলো হুকুমের গোলাম চাকুরীজীবি নয়। এরা সাহসী উদ্যোক্তা! যারা শুন্য কে শুন্য দেখে না। যারা শুন্যকে রুপান্তরিত করে অসংখ্য সংখ্যায়। তেমনই একজন মুহাম্মদ আব্দুল কাদের ভূইয়াঁ।

শুরুটা খুব সহজ ছিল না। এখন থেকে এক যুগেরও বেশী সময় আগের কথা। ইন্টারনেট তখন বর্তমানের মত সহজলভ্য ছিল না। অথচ সীমানা পেরিয়ে যাদের স্বপ্ন তাদের কখনো কোন সীমাবদ্ধতায় থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। জন্ম কুমিল্লাতে হলেও বড় কিছু করার স্বপ্ন তাকে জন্মস্থানে থাকতে দেয়নি। পড়াশুনা শেষ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিজেষ্টার ম্যানেজমেন্টে। আর স্বপ্নকে লালন করেছেন দেশের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর সর্বশেষ প্রান্তে।

নিজে ব্যবসায় করবেন শুধু এই এক উদ্যোগের জন্য শুরু থেকে চাকরীকে না বলা। পড়াশুনা শেষ করে তিন বন্ধুর পরিকল্পনায় শুরু হলো যাত্রা। পরিকল্পনা অনুযায়ী গার্মেন্টস ব্যবসায় করবেন। কিন্তু পকেট তো শুন্য। তাহলে কিভাবে সম্ভব ব্যবসায়ের চাকা ঘুরানো? শুরুতেই থেমে গেলে কি করে হবে? রাত জেগে ইন্টারনেটে বাহিরের দেশের ক্রেতা খোঁজা শুরু করলেন। খুব সহজ কাজ ছিলো না সেটা। নিজের গার্মেন্টস তো দূরের কথা একটা মেশিনও ছিলো না। ক্রেতা কিসের ভরসায় লাখ লাখ ডলারের অর্ডার দিবে তাকে? বিদেশে যে সকল ক্রেতার সাথেই যোগাযোগ করেন তাদেরকে বোঝাতে বার্থ্য হন। কিন্তু থেমে থেকে হাল ছাড়ার পাত্র তিনি নন।

কিছুই নেই এই আত্মবিশ্বাসে শুন্য থেকে সৃষ্টির প্রয়াসে লেগে ছিলেন তিনি। সাফল্য কখনও সোজা পথে আসে না। আসে কন্টকময় পথ ধরে। তার বেলায়ও আসলো। একদিকে দিনরাত পরিশ্রম করে ক্রেতা খোঁজা অন্যদিকে কাজ সম্পর্কেও ধারণা নেওয়া। সুসময় চলে এলো ঠিকই কিন্তু সেটাও বড় বেমানান। বায়ার চায় সরাসরি গার্মেন্টস থেকে পন্য তৈরী করিয়ে নিতে। বায়ারকে বোঝাতে সক্ষম হলেন সরাসরি গার্মেন্টস থেকে পন্য কেনার চেয়ে তার থেকে পন্য কিনলে সে গার্মেন্টস থেকে বেশী সুবিধা দিতে সক্ষম।

আত্মবিশ্বাস ছিল। ক্রেতাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ঠিকই অর্ডার সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেন। নতুন অবস্থায় পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছাড়া বেশ বড় কোয়ান্টিটির অর্ডার সংগ্রহ করলেন। আস্থার সাথে তিনি দিনে দিনে আরও বেশী বায়ারের অর্ডার পেতে চললেন। প্রতিটা দিনই চলছিল বেশ। এর মধ্যেই নানামুখী চাপে এক সময় তার ব্যবসা তিন থেকে একে পরিণত হয়। দেশের সীমা পেরিয়ে বন্দর থেকে বন্দরে তার আস্থার প্রতিটা বিন্দু ঘাম জমতে থাকে। তারই প্রত্যক্ষ শ্রমে পরোক্ষ ভাবে হাজার হাজার গার্মেন্টস শ্রমিকেরা বেতন পাচ্ছে। পরিবার নিয়ে সুখের হাসি হাসছে। নেপথ্যের কারিগড় ঠিকই রাতের পর রাত জেগে চলেছে। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও অফিস নিয়েছেন ততদিনে।

এক এক করে ইউএসএ ভিত্তিক নামী দামী বায়ার যুক্ত হতে শুরু করলো তার প্রতিষ্ঠানে। ডলার, জেনুইন, নর্থ-রিপাবলিক, বিগ বস, এনভিটি, আজনির মত বড় বড় বায়ারের লক্ষ লক্ষ পিচ পোশাক তৈরীর অর্ডার পড়তে শুরু করলো। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন গ্রুপ অব ইন্ডাষ্ট্রিজ তার দেওয়া অর্ডারের কাজ করে। বায়ারের চাহিদা অনুসারে দেওয়া কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে পারাতেই তার সাফল্য।

মুহাম্মদ আব্দুল কাদের ভূইয়াঁ খুব ভাল করেই জানেন থেমে থাকাতে সাফল্য নয়। পথ চলতে চলতে একের পর এক সফলতার যাত্রায় যুক্ত হতে থাকলো নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান। দাঁড় করালেন পাইওনিয়ার ট্রেডিং কর্পোরেশন লিমিটেড, দি ইয়র্কটেক্স এ্যাপারেলস ইংক, পাইওনিয়ার ট্রেডিং চেইন ইউএসএ ইংক, পাইওনিয়ার ট্রেডিং চেইন এসডিএন বিএইচডি। বর্তমানে নিউ ইয়র্ক থেকে প্রতিটা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন দক্ষতার সাথে। তবে ব্যবসায়িক পরিধিতে যখনই কোন সমস্যায় পড়েন ছুটে যান সেখানে। সন্তানকে যেমন হাত ধরে পথ চেনায় বাবা ঠিক তেমনি দক্ষতা বুদ্ধিমত্তার সাথে সমস্যার সমাধান করে সফলতার শীর্ষে নিয়ে যাচ্ছেন তার প্রতিটা প্রতিষ্ঠানকে।

কর্মদক্ষতা ও সফলতার যাত্রায় সদস্যপদ লাভ করেছেন আমেরিকা মালেশিয়া চেম্বার অব কমার্স (এএমসিএইচএএম), ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি (ডিসিসিআই), গ্রেটার নিউইয়র্ক চেম্বার অব কমার্স, স্মল এন্ড মিডিয়াম বিজনেস ওনারর্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ গ্রোসারী বিজনেস এসোসিয়েশন, এসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্স বাংলাদেশ (এটিএবি)।

আত্মবিশ্বাসী মানুষটা কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ইউএসএ তে সর্বোচ্চ পোশাক আমদানীকারকের স্বীকৃতি (এ্যাওয়ার্ড ফর হায়েষ্ট ইমপোর্ট টু ইউএসএ-২০১৭)। সেই সাথে পেয়েছেন চলার পথে হাজারও মানুষের ভালবাসা। অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে তারুন্যকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন এ মানুষটি। তারই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের ইয়ুথ এসেম্বিলির এসডিজি ২০৩০ বাস্তবায়নের লক্ষে বাংলাদেশের হয়ে ইয়ুথ এসেম্বলির অবজারভার হিসেবে কাজ করছেন। সেই সাথে বাংলাদেশ, রোমানিয়া, আইসল্যান্ড ব্যবসায়িক সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য কনস্যুলেট জেনারেল অব রোমানিয়া নিউইয়র্ক এর ডঃ ক্যালিন রাডু আঙ্কুতা (মিনিষ্টার কাউন্সিলর) সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে যাচ্ছেন।

সদালাপী মানুষটি সদা হাস্যজ্বল। তারুন্য আর ঝুঁকি কে সম্ভাবনা হিসেবে দেখা মানুষটি যারা উদ্যোক্তা হতে চায় তাদের জন্য পরামর্শ চাইতেই বলেন যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করুন নিজেকে। বর্তমান সময় যেখানে ইন্টারনেটের কল্যানে সমস্ত পৃথিবী হাতের মুঠোয়। সেখানে ইকমার্স ভিত্তিক ব্যবসায় দক্ষতা উন্নয়ন করা জরুরী বলে মনে করেন তরুন এ উদ্যোক্তা। সেই সাথে সততা ও কমিটমেন্ট রক্ষা করার পাশাপাশি ধৈর্য্য ধারনেরও পরামর্শ দেন তিনি। যারা উদ্যোক্তা হবে তাদের কাছে প্রতিটি প্রতিবন্ধকতা যেন নতুন নতুন সম্ভাবনা। এক একটি সমস্যার সমাধান যেন নিজেকে আরও একবার পরিশুদ্ধ করে নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা। সুতরাং থেমে নয় ধীর গতিতে হলেও এগিয়ে চলতে হবে। যারা শুরু করতে গিয়েও বারবার ভাবছে তাদের উচিৎ হবে খুব ছোট করে হলেও শুরুটা করা।

মোঃ মাসুদুর রহমান মাসুদ/উদ্যোক্তার খোঁজে ডটকম।

SHARE