1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

বেতন পরিশোধে ব্যর্থ কারখানাগুলোর বন্ড সুবিধা বাতিলের দাবি

বন্ড লাইসেন্স ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির বড় ধরনের সুবিধা নিলেও এখনও বহু গার্মেন্ট মালিক শ্রমিকদের বেতন দেয়নি। এ সেক্টরের শীর্ষস্থানীয় শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, তাদের বেতন পরিশোধের তথ্য যেমন সত্য নয়, তেমনি গার্মেন্ট ও শ্রমিক সংখ্যা নিয়ে যা বলা হচ্ছে সেটিও অসত্য।

তারা মনে করেন, যারা এই দুঃসময়ে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করছেন তাদের কারও বন্ড লাইসেন্স সুবিধা থাকা উচিত নয়। এছাড়া এ চক্রের বেশির ভাগ বন্ডের নামে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল এনে খোলা বাজারে বিক্রি করে থাকে। এভাবে গার্মেন্ট ব্যবসার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে অনেকে এখন ধরাকে সরাজ্ঞান করে চলেন।

এক সময় যাদের কিছুই ছিল না, তারা এখন অভিজাত এলাকায় রাজার হালে জীবনযাপন করেন। শ্রমিক নেতারা বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ ও চিন্তাভাবনা সবই শ্রমিকবান্ধব। কিন্তু একশ্রেণির লুটেরা দুর্নীতিবাজের কারণে অগ্রসরমান গার্মেন্ট সেক্টরকে অনেকে অবৈধ পথে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বানানোর মেশিনে পরিণত করেছেন। তাদের দাবি, এদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক।

জানা গেছে, করোনা সংকটের দিন যতই বাড়ছে, তৈরি পোশাক খাত নিয়ে ততই নানারকম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে দেশে গার্মেন্ট এবং এর শ্রমিক সংখ্যা কত তা নিয়ে যেমন হাজারও প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, তেমনি বেতন পরিশোধের পরিসংখ্যান নিয়েও অভিযোগের অন্ত নেই। আগে মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হতো, তৈরি পোশাক খাতে ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করে।

কিন্তু করোনার প্রভাবে অর্ডার বাতিল ও স্থগিতের পর বিজিএমইএ বলছে, তাদের রফতানিমুখী গার্মেন্টের সংখ্যা ২ হাজার ২৭৪টি। এতে সোয়া ২৪ লাখ শ্রমিক কাজ করে। বিপরীতে শ্রমিক নেতারা বলছেন, ছোট-বড় মিলিয়ে দেশে কারখানা আছে ১০ হাজারের বেশি। অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনস্থ ঢাকা ও চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের তথ্য মতে, সক্রিয় বন্ড লাইসেন্সের সংখ্যা হচ্ছে ৩ হাজার ১৩৭টি।

এর মধ্যে ঢাকায় ২ হাজার ৪৩৭টি এবং অবশিষ্ট প্রায় ৭শ’টি চট্টগ্রামে। এই লাইসেন্স দিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে গার্মেন্ট মালিকরা। মূলত কারখানা ও শ্রমিক সংখ্যা নিয়ে তির্যক প্রশ্ন ওঠে শ্রমিকদের মার্চ মাসের বেতন দেয়া নিয়ে। বিজিএমইএ বলছে, ৯৮ ভাগ শ্রমিককে বেতন দেয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন।

প্রতিদিনই শ্রমিকরা বেতনের দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে কারখানার সামনে এবং মহাসড়ক অবরোধ করছেন। এ অবস্থায় শ্রমিক নেতারা বলছেন, বিজিএমইএ’র বেতন দেয়ার তথ্য মনগড়া। এজন্য তারা বেতন পরিশোধে ব্যর্থ গার্মেন্ট মালিকদের দেয়া সব ধরনের নীতি-সুবিধাসহ তাদের বন্ড লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

বিজিএমইএ’র হালনাগাদ তথ্য মতে, বুধবার পর্যন্ত সংগঠনটির সদস্যভুক্ত রফতানিমুখী ২ হাজার ২৭৪টি কারখানার মধ্যে ২ হাজার ১৮২টি কারখানা শ্রমিকদের মার্চ মাসের বেতন পরিশোধ করেছে। বেতন দেয়া হয়েছে ২৪ লাখ ২৪ হাজার ৪১৭ জন শ্রমিককে। তাদের দাবি অনুযায়ী ৯২টি কারখানা এখনও বেতন পরিশোধ করেনি।

করোনার প্রাদুর্ভাবের আগে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে গার্মেন্ট মালিকরা বলে আসছেন, তৈরি পোশাক খাতে ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক কর্মরত আছে। সে অনুযায়ী তারা আর্থিক ও নীতিগত সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু করোনার কারণে একের পর এক অর্ডার বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় বেরিয়ে আসছে নতুন তথ্য। এখন বিজিএমইএ থেকে বলা হচ্ছে, রফতানির জন্য ইউডি (ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন) নেন এমন গার্মেন্টের সংখ্যা হচ্ছে ২ হাজার ২৭৪টি।

এতে কাজ করেন ২৪ লাখ ৭২ হাজার ৪১৭ জন শ্রমিক। যদিও বিজিএমইএ’র ভোটার লিস্ট অনুযায়ী সাড়ে ৪ হাজারের বেশি গার্মেন্ট সংগঠনটির সদস্য। অবশ্য দেশে কতগুলো তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে এবং সেখানে কত শ্রমিক কাজ করে তার হালনাগাদ তথ্য নেই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের কাছেও।

এ অধিদফতরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক শামসুল আলম খান বলেন, ‘কারখানার শ্রমিকদের তথ্য হালনাগাদ করা হচ্ছে। পরে তা ওয়েবসাইটে আপলোড করা হবে।’ এদিকে এনবিআরের তথ্যমতে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে রফতানিমুখী পোশাক শিল্পের বন্ড লাইসেন্স আছে ৬ হাজার ২৪১টি।

এগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের আওতায় নিবন্ধিত। অবশ্য সক্রিয় লাইসেন্সের সংখ্যা ৩ হাজার ১৩৭টি। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ২ হাজার ২৫৬টি, ঢাকা ইপিজেডে ১৮১টি এবং চট্টগ্রামে ৭০০টির মতো সক্রিয় আছে। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত লাইসেন্সের আওতায় পণ্য আমদানি করে থাকে।

শ্রমিক নেতারা যা বলছেন: গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফেডারেশনের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, ৯৮ শতাংশ বেতন পরিশোধের যে দাবি বিজিএমইএ করছে, তা মিথ্যা। এখনও শ্রমিকরা কারখানার সামনে অবস্থান করছে, রাস্তা অবরোধ করছে। আর বিজিএমইএ এখন ২ হাজার ২৭৪টি কারখানার কথা বললেও বাস্তবে তাদের কারখানা ৪ হাজারের বেশি।

এ ছাড়া বিকেএমইএ-র কারখানা আছে ২ হাজারের বেশি। ছোট-বড় মিলিয়ে বাংলাদেশে গার্মেন্ট আছে ১০ হাজারের মতো। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে বেশিরভাগ কারখানা লে-অফ ঘোষণা করেছে। তাই শুধু তহবিলের অর্থ থেকে বঞ্চিত করা নয়, এদের বিষয়ে সরকারকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

গার্মেন্টস শ্রমিক ড্রেড ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলেন, বেতন দেয়ার বিষয়ে বিজিএমইএ-র তথ্য সঠিক নয়। তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে সরকারের বিভিন্ন দফতরে তথ্য পাঠিয়েছেন। যার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কোনো বাস্তবতা নেই। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী শ্রমিকদের বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক; কিন্তু মাঠপর্যায়ে ঠিক তার উল্টো অবস্থান দেখতে পাই।

অনেক কারখানা লে-অফ ঘোষণা করলেও সংশ্লিষ্ট শিল্প পুলিশ কোনো ভূমিকা রাখছে না, উল্টো শ্রমিকদের মারধরসহ হয়রানি করছে। যেসব মালিক বেতন দিচ্ছে না, তাদের নীতি সুবিধা, ব্যাংকিং সুবিধা, বন্ড লাইসেন্স ও সিআইপি কার্ড বাতিল করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক-কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, বিজিএমইএ ৯৮ শতাংশ কারখানায় বেতন দেয়ার দাবি করলেও, তা শতভাগ সত্য নয়।

শুধু কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলোর বেতন-ভাতার চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। সাব-কন্ট্রাক্ট ও বিকেএমইএ-বিজিএমইএ-র ছোট ছোট কারখানার চিত্র ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হচ্ছে। এখনও আড়াই লাখের বেশি শ্রমিক মার্চ মাসের বেতন পায়নি। কোথাও কোথাও আংশিক বেতন দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, গার্মেন্ট শ্রমিকরা ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামছে। এতে তাদের করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ছে বিধায় সংশ্লিষ্ট মালিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা হওয়া উচিত। পাশাপাশি বন্ড লাইসেন্স, সিআইপি সুবিধাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা উচিত।

ইন্ড্রাস্টি অল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব তৌহিদুর রহমান বলেন, এখনও ২০-২৫ ভাগ শ্রমিক মার্চ মাসের বেতন পায়নি। এসব মালিক কি বিজিএমইএ, নাকি বিকেএমইএ-র সদস্য, সেটা মুখ্য বিষয় নয়। বরং যেসব গার্মেন্ট মালিক শ্রমিকদের বেতন দেয়নি তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাতিল করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, বিজিএমইএ-র বেতন দেয়া তথ্যের সঙ্গে আমরা একমত না। সব কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যেসব মালিক শ্রমিকদের বেতন দিচ্ছে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তথ্যসূত্র: যুগান্তর।

More News Of This Category