1. editor@islaminews.com : editorpost :
  2. jashimsarkar@gmail.com : jassemadmin :
সফলতার গল্প :

বের্তুস আলবার্টাসের জিরো থেকে হিরো হওয়া!

আমরা জীবনে সবাই সফল হতে চাই। আমরা নিজের জীবনে সেরা হতে চাই, বিখ্যাত হতে চাই। কিন্তু আমরা কি সবাই সফল হই? এই যে দেখুন, পৃথিবী জুড়ে শত কোটি মানুষ। এদের সবাই কি হতে পারে বিলিনিয়ার, কবি শিল্পী কিংবা সেরা গায়ক? সবাই হয় না, শত কোটি মানুষের ভিতর হাতে গোনা কয়েকজন হন মাত্র। এর কারণ কী?

এর কারণ লেগে না থাকা। জীবনে আমরা সফল না হলে আমরা সবাই বলি আমি চেষ্টা করেছি- হয়নি, অমুক আমার চেয়ে বুদ্ধিমান, স্মার্ট, চালাক। আসলে সফলতার পথে এসব কিছুই না। আপনি আসলে আপনার চেষ্টাটুকু পুরোটা করেন নি, যদি করতেন অন্য কোন ভাবে হলেও আপনি এগিয়ে যেতেন। এই ভাবনাটা আমরা সবাই ভাবতে পারি না।

সাফল্যের পেছনের গল্প – লেগে থাকা
সাফল্য কী? কিভাবে অর্জন করা যায় সাফল্য? অনেকে অনেক রকম উত্তর দিলেও সব সফল মানুষদের মাঝে একটা জিনিস থাকেই তা হলো লেগে থাকা বা চেষ্টা করা। জীবন যখন আপনাকে সব দিক দিয়ে ফেলে দিতে চাইবে, সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানোর নাম সফলতা। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এঞ্জেলা লি ডার্কঅর্থ এর এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা, স্মার্টনেস কিংবা কেমন দেখতে তার উপর সফলতা নির্ভর করে না বরং ব্যক্তির আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং লেগে থাকার গুণের উপর সফলতা নির্ভর করে। তাই আপনারা যাতে নিজেদের নিয়ে আরেকবার চিন্তা করেন তাই নিয়ে এলাম নতুন ভাবে শুরু করার টিপস।

এখন প্রশ্ন আসে লেগে থাকা কী? কেন বা কিভাবেই লেগে থাকবো? এঞ্জেলা লি এর মতে, লেগে থাকার গুণটা হচ্ছেন প্যাশন এবং ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ যা ভবিষ্যতের জন্য কাজ করে। তবে এই গুণ হুট করে আসে না বরং চর্চার মাধ্যমে আনতে হয়। একবার লেগে থাকার গুণ চলে এলে ব্যক্তির মাঝে কাজ করার যেমন নেশা বা প্যাশন তৈরি হয় তেমনি কাজ করার জন্য শক্তি আসে মনে। দিনের পর দিন নয় বরং বছরের পর বছর ধরে লেগে থাকতে হয় সফলতার জন্য। লেগে থাকার গুণ হচ্ছে ম্যারাথনের মতো, ১০০ মিটার স্প্রিন্ট নয়। আপনি যদি জীবনে ম্যারাথনের চেষ্টা করেন তবে আপনার সাফল্য আসবে সব দিক দিয়ে। তো কিভাবে নতুন করে শুরু করবেন এই ম্যারাথন।

গল্পে গল্পে লেগে থাকা
নতুন করে শুরু করার গল্প আজ শোনাবো একটু অন্যভাবে। মনে আছে রবার্ট ব্রুসের কথা? যিনি সাত সাতবার যুদ্ধে পরজিত হয়ে এরপর মাকড়শার চেষ্টা দেখে ঠিক ৮ম বারে যুদ্ধ জিতে শত্রু মুক্ত করে ছিলেন নিজের মাতৃভূমিকে। তবে এর ভিতরের গল্প আমরা ক’জন জানি? আমরা সফলতার গল্প শুনি কিন্তু ভিতরের গল্প কখনই শুনি না। তাই আজ একজন জিরো থেকে হিরো হবার গল্প আপনাদের বলবো।

আমাদের এই নায়কের নাম বের্তুস আলবার্টাস। পেশায় একজন ফিটনেস ট্রেইনার, একজন ব্যবসায়ী, একজন উদ্যোক্তা। জন্মেছিলেন নিম্নবিত্ত পরিবারে, দারিদ্রতা পারিবারিক অশান্তি সব পার করে এখন একজন সফল উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী। বডি ২০ তার হাতে নির্মিত ফিটনেস কোম্পানি। আজ শুনবো তার লেগে থাকার গল্প। শূন্য থেকে টেনে তোলার কথা।

বডি ২০ এর সিইও বের্তুস আলবার্টাসের জন্ম আমেরিকার নিম্নবিত্ত পরিবারে। জন্মের ৯ মাসের মাথায় বাবা মায়ের ডিভোর্স হয় আর এরপর শুরু হয় দারিদ্রতা। তার মা ডিভোর্সের পর তাকে এবং তার বোনকে নিয়ে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। এরপর পুরো পরিবার মাতাল নানার সাথে সাথে এ বাড়ি ও বাড়ি করে শেষমেষ রাস্তায় কাটিয়েছে। খুব অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিলেন জীবনে টাকা পয়সা কিংবা সম্পদের গুরুত্ব এর চেয়ে ব্যক্তির গুরুত্ব বেশি। কেননা খুব অল্প বয়সে তিনি দেখেছেন তাদের পছন্দের খেলনা কিংবা কাপড় তার মা বিক্রি করে দিয়েছেন শুধু খাবারের জন্য।

এমনকি ক্রিসমাস উপলক্ষ্যে পাওয়া তাদের নতুন জামা এবং খেলনাও তাদের বিক্রি করে দিতে হয়েছে শুধু ক্ষুধার তাড়নায়। এই ব্যাপারটা এত নিয়মিত হত যে, দোকানদাররা পর্যন্ত তাদের দোকানে ঢুকতে দিতেন না। বের্তুস আলবার্টাস এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, “আমি কখনই ভুলবো না আমি কোথা থেকে উঠে এসেছি, কিভাবে এসেছি। আমি কখনই ভুলবো না দোকানদারেরা কিভাবে আমার আর আমার বোনের দিকে চেয়ে থাকতো, তাদের চোখে আমি দেখেছিলাম ঘৃণা আর অপমান।”

এত অপমান লজ্জা দেখে তিনি মুখ থুবড়ে পড়েননি। মানুষের কথায় ভেঙ্গে পড়েননি। বিখ্যাত টিভি সিরিজ ‘গেম অফ থ্রোন্স’ এর বিখ্যাত লাইন “ভুলে যেও না তুমি কে, পৃথিবী কখনই ভুলে যাবে না। তোমার অক্ষমতাকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করো, এই ঢাল দিয়ে নিজের ভেতরকে বাঁধ, এই অক্ষমতা আর তোমাকে কাঁদাবে না।” সিরিয়ালের এই কথাগুলো শিখেছিলেন জীবন থেকে। তাই তো ভেঙ্গে না পড়ে শুরু করেছিলেন নতুন করে, অক্ষমতাকে তার ক্ষমতা হিসাবে ব্যবহার করেছেন। নিজে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিয়েছেন ধীরে ধীরে।

শুরু করেছেন শরীরচর্চা জীবনের শুরুতেই। নিজের জীবনের দায়িত্ব নিয়ে ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিলেন এখন নিজেই পারবেন নিজের ভাগ্য বদলাতে। তাই তিনি শুরু করেছিলেন প্রচণ্ড পরিশ্রম আর চেষ্টা। তিনি তার জীবনের সেরা বাণীর তালিকায় বলেছিলেন, “তুমি তাই হবে জীবনে যা তুমি বার বার করো। তাই সেরা হওয়ার জন্য আর কিছু না শুধু চর্চা আর চেষ্টার দরকার।” তিনি বলেন, তিনি তার পুরো জীবনে এই কথাটাই মেনে চলেছেন। ফলাফল ও পেয়েছেন আস্তে আস্তে একসময়। শিশুকালের হ্যাংলা পাতলা ছেলেটা হয়ে যায় একজন ক্রীড়াবিদ স্কুলে থাকতেই। খেলোয়াড় বৃত্তি নিয়ে শহরের সেরা হাইস্কুলে ভর্তি হন। এছাড়া শুধু লেগে থাকার দরুণ বনে যান স্কুলের প্রধান ছাত্র।

স্কুলের সেরা ছাত্র দিয়ে তার ঝুলিতে সাফল্য আসতে শুরু করে। খেলাধুলায় অর্জন দিন দিনকে বাড়তে থাকে তার। বহু পুরষ্কার জিতেছেন এর মাঝে সেরা বলার মতো জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বডি বিল্ডিং এবং ফিটনেস টাইটেল। ধীরে ধীরে পদক প্রাপ্তির সাথে সাথে তার জীবনের গল্প আসতে থাকে মিডিয়ার আলোয়। লোকজন আরো আগ্রহী হয় তার সম্পর্কে, লুফে নেয় এই জীবনের গল্প। এর মাঝে তিনি ধরতে পেরেছিলেন মানুষ কি চায়! মানুষ চায় সেসব জিনিসকে যা তাদের অনুপ্রাণিত করে। মানুষ যেখানে অনুপ্রেরণা পায় সেখানে ছুটে যায়, মোটিভেশন লেকচার হলো দেখলে এই কথাটা আপনি ঠিক মানবেন।

তো এই চিন্তা থেকে তার মাথায় এলো ব্যবসার ভাবনা। নিজের লেগে থাকা– চেষ্টাকেই ভিত্তি করে নেমে পড়লেন ব্যবসায়। বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয় বর্ষ চলাকালে শুরু করেন তার নিজের প্রথম ব্যবসা। বাবার কাছ থেকে টাকা লোন করে নেমে পড়লেন ব্যবসায়, চেষ্টার কারণে খুব দ্রুত ব্যবসায় সফল হতে থাকেন তিনি। ব্যবসায় এত দ্রুত সফলতা পান যে মাত্র তিন মাসে লোনের টাকা পরিশোধ করে দেন বাবাকে।

সেই ব্যবসায়িক সফলতার হাত ধরে এখন তিনি জাতীয় পুরষ্কার প্রাপ্ত ফিটনেস রিটেইল কোম্পানি বডি ২০ এর সিইও এবং তিনি এর প্রতিষ্ঠাতাও। এই ফিটনেস কোম্পানির মাধ্যমে তিনি ক্লায়েন্টদের প্রতিদিন শারীরিক পরিশ্রম করার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। অনেকটা লেগে থেকে সুস্বাস্থ্যের চর্চা তৈরি করছেন ক্লায়েন্টদের মাঝে। প্রথমে নিজের এলাকায় শুরু করলেও ধীরে ধীরে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পরে তার এই প্রতিষ্ঠান। আর এখন তো বিশ্বের অনেক দেশেই খুলে গেছে বডি ২০ এর শাখা।

নিজের লেগে থাকা গুণের মাধ্যমে তিনি নিজে যেমন হয়েছেন সফল তেমনি আশে পাশের মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছেন তার কাজের মাধ্যমে। তার এই লেগে থাকার ব্যাপারে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন আমি বিশ্বাস করি, “একটি খরগোশ সব সময় পালাবে একটি শেয়াল থেকে, আর শিয়াল ছুটবে খরগোশের পিছু পিছু। শিয়াল ছুটছে কারণ তার ক্ষুধা নিবারণ করবে খরগোশ, আর খরগোশ পালাবে কারণ এখানে তার জীবন মরণের ভাবনা। আমি মনে করি এই ভাবনা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় আপনি কতটুকু বেপরোয়া হলে নিজেকে বদলে আপনার চারপাশের উপর প্রভাব ফেলতে পারবেন।”

জিরো থেকে হিরোর হবার গল্প এমন অনেক রয়েছেন চারপাশে। শুধু বুদ্ধি বা জ্ঞান থাকলেই হয় না লেগে থেকে সেই গুণগুলোকে বের করে আনতে হয় নিজের ভেতর থেকে। আপনার চারপাশেও খুজে পাবেন এমন অনেক গল্প। তাই পারবো না– হবে না না বলে শুরু করুন এবং লেগে থাকুন, সাফল্য আসবেই আপনার কাছে।

আবরার শাহরিয়ার
তথ্যসূত্র: ইয়ুথ কার্নিভাল ডটকম।

More News Of This Category