1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

ব্যবসায় লাভ করতে চাইলে লোকসানের প্রস্তুতিও রাখতে হবে।

আমরা বেশির ভাগ মানুষই নিজের কাঁধে দায়িত্ব নিতে চাই না এবং দায়িত্ব পালন করতে চাই না। কিন্তু আমরা সবাই নিজেকে যোগ্য বলে দাবি করি এবং সবসময় নিজের দক্ষতার বড়াই করি। আমরা পরিশ্রম করতে চাই না, কিন্তু উন্নতি করতে চাই। আমরা কষ্ট করতে চাই না, কিন্তু সুখী হতে চাই।

আমরা ব্যবসা-বাণিজ্যে শুধু মুনাফা করতে চাই, কিন্তু ক্ষতি মানতে চাই না। আমরা সবাই শর্টকাট পথে ধনী হতে চাই, কিন্তু ধনী হওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে চাই না। আমরা সবাই বিখ্যাত হতে চাই, কিন্তু বিখ্যাত হওয়ার জন্য যে সাধনার দরকার, তা করতে চাই না। কর্মক্ষেত্রে আমরা সবসময় প্রমোশন চাই, কিন্তু প্রমোশন পাওয়ার জন্য নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলি না।

আমরা সবাই ভালো বেতন ও সম্মানের চাকরি চাই, কিন্তু সেই ভালো বেতন এবং সম্মান পাওয়ার জন্য নিজেকে যে অধিকতর যোগ্য করে তুলতে হবে, সেটি করতে চাই না। আমরা অন্যের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার আশা করি, কিন্তু অন্যকে ভালো ব্যবহার করতে চাই না।

আমরা সবাই মানুষের ভালোবাসা এবং সম্মান পেতে চাই, কিন্তু তার জন্য যে মানুষকে ভালোবাসতে হবে এবং সম্মান করতে হবে, তা করি না। আমরা সবাই অধিকার আদায়ের জন্য কথা বলি কিন্তু অধিকার প্রদানের জন্য কথা বলি না। নিজের অধিকার আদায়ের জন্য আমরা যতটা সোচ্চার, অন্যকে তার অধিকার প্রদানের বেলায় ততটাই নিশ্চুপ।

আমরা কেবল পেতে চাই কিন্তু দিতে চাই না। মানুষের মনে এবং চিন্তা ও কাজকর্মে এই যে চরম বিপরীত অবস্থান, তা আমাদের সমাজকে কলুষিত করছে। সর্বত্রই অশান্তি সৃষ্টি করছে এবং আমাদের কেবলই পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এজন্য আমরা সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারছি না।

কিন্তু উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এবং নিজেকে সফলতার শীর্ষে নিয়ে যেতে হলে আমাদের পরিশ্রম করতে হবে এবং দায়িত্ব নিতে হবে। পরিশ্রম আপনার জীবনে যেমন সফলতা নিয়ে আসবে, ঠিক তেমনি দায়িত্ব আপনার যোগ্যতাকে বৃদ্ধি করে আপনাকে অধিকতর দায়িত্বসম্পন্ন ও যোগ্য করে তুলবে। দায়িত্ব পালন করতে করতেই আপনি অধিকতর যোগ্য হিসেবে গড়ে উঠবেন এবং এর মাধ্যমেই আপনি পৌঁছে যাবেন সফলতার শীর্ষে।

পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি— এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু নিজের জীবনে আমরা এর বাস্তবায়ন করি না। একইভাবে Survival of the fittest– কথাটির সঙ্গেও আমরা সবাই পরিচিত। কিন্তু বাস্তব জীবনে এর গুরুত্ব আমরা অনুধাবন করি না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পরিশ্রম ছাড়া কেউই উন্নতি করতে পারেনি আর যোগ্যতা ছাড়া কেউ টিকে থাকতে পারেনি।

যোগ্যতা না থাকলে প্রতিযোগিতায় আপনি পিছিয়ে পড়বেন এবং অন্যরা এগিয়ে যাবে। অতীত থেকে আজ পর্যন্ত পরিশ্রম এবং দায়িত্ব পালন ছাড়া কেউই সফলতা অর্জন করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। দায়িত্ব পালন করতে করতেই আপনি একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হবেন।

যে খাতেই আপনি সফল হতে চান না কেন, আপনাকে পরিশ্রম করতেই হবে। আপনাকে দায়িত্ব নিতেই হবে এবং সবসময় অধিকতর দায়িত্ব আপনার কাঁধে নিতে হবে। ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেই বড় হতে হয়। চাকরি বলেন, ব্যবসা, খেলাধুলা কিংবা সাংস্কৃতিক জগত্ বলেন, পরিশ্রম ও দায়িত্ব পালন ছাড়া আপনি সফল হতে পারবেন না।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও আপনাকে সফল হতে হলে রাজনীতির ময়দানে অনেক বেশি দায়িত্ব আপনার কাঁধে নিতেই হবে। আপনাকে একজন সমাজসেবক হতে হলেও সমাজের দায়িত্ব আপনাকে নিজের কাঁধে নিতে হবে।

আজকের বিশ্বে সফলতার শীর্ষে অবস্থানকারী বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গ, কার্লোস স্লিম, বারাক ওবামা, নরেন্দ্র মোদি, সুন্দর পিচাই, সত্য নাদেলাসহ সবাই কিন্তু কঠোর পরিশ্রম এবং দায়িত্ব পালন করেই সমাজের নিম্ন অবস্থান থেকে সমাজের শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছেছেন। কারো দয়া ও অনুগ্রহে তারা কেউ এ সফলতা অর্জন করেননি।

স্টিভ জবস কিংবা মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর বেলায়ও কথাটি সত্য। পেলে কিংবা ম্যারাডোনা, রোনাল্ডো কিংবা মেসি সবাই কঠোর পরিশ্রম এবং বড় বড় দায়িত্ব পালন করেই বিখ্যাত হয়েছেন। আমাদের ড. মুহাম্মদ ইউনূস আর স্যার ফজলে হাসান আবেদ সে রকম দুটি বটবৃক্ষ, যারা পালন করছেন হাজারো দায়িত্ব এবং এর মাধ্যমেই তারা সফলতার শীর্ষে অবস্থান করছেন। কর্ম ও দায়িত্বই তাদের সফলতা দিয়েছে এবং তারা হয়েছেন সমাজের স্মরণীয় ও বরণীয়।

এ রকম হাজারো মানুষের উদাহরণ দেয়া যাবে, যাদের সবাই নিজের কাঁধে দায়িত্ব নিয়েই বড় হয়েছেন। দায়িত্ব এড়িয়ে কেউ বড় হননি এবং দায়িত্ববানরাই সফল হন। তাই তো বলা হয় Fortune favours the great.

মনে করুন, আপনি সদ্য পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করা একজন মানুষ। আপনার যদি আর্থিক সচ্ছলতা থাকে এবং চাকরিটা আপনার ইমিডিয়েট প্রয়োজন না হয়, তাহলে আপনি একটু সময় নিন এবং একটি ভালো চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিন আর নিজেকে অধিকতর যোগ্য করে গড়ে তুলুন।

আপনার যদি আর্থিক সচ্ছলতা না থাকে আর চাকরিটা আপনার ইমিডিয়েট প্রয়োজন হয়, তাহলে জীবনের শুরুতেই আপনি একটি চাকরিতে যোগ দিন। চাকরিটা যদি আপনার পছন্দমতো এবং যোগ্যতা অনুযায়ী নাও হয়, তবু চাকরিটিতে যোগ দিন এবং মন দিয়ে আপনার দায়িত্ব পালন করুন। মনে রাখবেন কোনো চাকরিই ছোট নয়, আবার কোনো পেশাই অবহেলার নয়।

ছোট পদে চাকরিতে যোগ দিয়েও যুগে যুগে দেশে দেশে অনেক মানুষ সফলতার শীর্ষে পৌঁছেছেন। সুতরাং আপনিও পারবেন। আপনি কখনো হতাশ হবেন না এবং হতাশ হওয়ার কোনো দরকার নেই। সবসময় আশাবাদী হবেন। যে প্রতিষ্ঠানের যে পদে আপনি চাকরি করছেন, সে পদে আপনি নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করুন এবং অধিকতর দায়িত্ব পালনে মনোযোগী হোন।

প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আপনার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ভালোমতো পালন করুন। দেখবেন প্রতিষ্ঠান নিজ প্রয়োজনেই আপনাকে প্রমোশন দেবে এবং উচ্চ পদে আসীন করবে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আপনি নীরবে কাজ করুন এবং অধিকতর দায়িত্ব পালন করুন। আপনি ১০০ ভাগ সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করুন।

দেখবেন আপনার সফলতা অবধারিত এবং আপনি সময়ের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে উন্নীত হবেন। আর যদি ওই প্রতিষ্ঠানের চাকরি আপনার পছন্দ না হয়, তাহলে আপনি সেই চাকরির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবং সেই চাকরিতে বর্তমান থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো চাকরির জন্য চেষ্টা করুন।

দেখবেন সময়ের ব্যবধানে আপনি একটি ভালো চাকরি জোগাড় করতে পারবেন। তখন আপনি আপনার স্বপ্ন পূরণে সফল হবেন। কিন্তু কোনো অবস্থায় আপনি আরো ভালো চাকরির আশায়, নতুন চাকরি পাওয়ার আগে বর্তমান চাকরি ছাড়বেন না। মনে রাখবেন, একটি সফলতা মানুষকে আরেকটি সফলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।

চাকরি না করে আপনি যদি ব্যবসা করতে চান অর্থাত্ একজন উদ্যোক্তা হতে চান, তাহলে কী ধরনের ব্যবসা দিয়ে আপনি শুরু করবেন, তা আগে ঠিক করুন। এক্ষেত্রে আপনি এককভাবে শুরু করতে পারেন আবার কয়েকজন মিলে যৌথ উদ্যোগেও শুরু করতে পারেন। তবে আমি বলব, এককভাবে শুরুর চেয়ে যৌথ উদ্যোগে শুরু করাটা ভালো।

কারণ এক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তির চিন্তা কাজ করবে, ফলে আরো ভালো নীতি গৃহীত হবে। কাজের চাপ একজন ব্যক্তির ওপর না পড়ে একাধিক ব্যক্তির ওপর পড়বে, ফলে আপনার লোড কমবে। ঝুঁকি একজনের ওপর না পড়ে একাধিক ব্যক্তির ওপর ভাগ হবে, ফলে আপনার এগিয়ে যেতে সুবিধা হবে। আপনি শুরু করুন।

মনে রাখবেন শুরু করাটাই আসল কাজ। তবে শুরুর আগে যে ব্যবসা করবেন, সেটির বাজার চাহিদা যাচাই করুন। বাজার চাহিদা না থাকলে যে পণ্যের ব্যবসা করবেন, তা যতই প্রয়োজনীয় পণ্য হোক না কেন, তা কিন্তু বিক্রি হবে না। এ অবস্থায় আপনার ব্যবসায় লোকসান হবে। সুতরাং এমন একটি পণ্যের ব্যবসা দিয়ে আপনার যাত্রা শুরু করুন, যে পণ্যের চাহিদা বেশি।

মনে রাখবেন, কোনো পণ্যের ব্যবসাই ছোট নয়। পৃথিবীর বড় বড় ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতি, সবাই কিন্তু ছোট পরিসরেই শুরু করেছেন। আর সেটির ওপর ভিত্তি করেই তারা সামনের পথে এগিয়ে গেছেন এবং সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছেন। সুতরাং আপনিও পারবেন। আপনি সাহসী হোন এবং সাহস করে শুরু করুন।

ভয়, জড়তা, অলসতা ও কাপুরুষতাকে পরিত্যাগ করুন। মাইক্রোসফট, ডেল, অ্যাপল, কোকাকোলা, পেপসি, সিঙ্গার, মটোরোলা, নকিয়া, জিইসি, জেনারেল মোটরস, হুন্দাই, টয়োটা, হোন্ডা, হুন্দাই, ভলবো, মার্সিডিজ, হাইডেলবার্গ, লাফার্জ, ইউনিলিভার, ম্যাকডোনাল্ড, স্যামস্যাং, মিত্সুবিশি, নাইকি, এডিডাস, ইউনিলিভার, টাটা, মিত্তালসহ বিশ্বের বড় বড় শিল্প গ্রুপ সবাই কিন্তু স্বল্প পরিসরেই শুরু করেছিল এবং সেটির ওপর ভিত্তি করেই তারা আজকের অবস্থানে এসেছে।

আমাদের দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপের সৃষ্টিও কিন্তু একইভাবে। স্কয়ার, আকিজ, এসিআই, ট্রান্সকম, প্রাণ-আরএফএল, বেক্সিমকো, বিএসআরএম, কেএসআরএম, আবুল খায়ের, পিএইচপি, এস আলম, যমুনা, মেঘনা, বসুন্ধরা, কেডিএস, টিকে, বিআরবি, সামিট, নাসাসহ সবাই কিন্তু ছোট পরিসরেই যাত্রা করেছিল।

কিন্তু ধৈর্য, পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও দায়িত্ব গ্রহণের চ্যালেঞ্জ তাদের আজকের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। সুতরাং আপনিও সফলতা অর্জন করতে পারবেন। হাসিমুখে কথা বলুন এবং কাস্টমারের মন জয় করুন। সততা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করুন। বড় বড় দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন। কখনো হতাশ হবেন না। লোকসানে পড়লে হাত গুটিয়ে পালিয়ে আসবেন না।

মনে রাখবেন, এ ব্যর্থতার পেছনেই লুকিয়ে আছে সফলতার সম্ভাবনা। কথায় আছে, একবারে না পারিলে দেখ শতবার। আর যে সহে সে রহে। সুতরাং আজ যারা সফল হয়েছেন, তারা সবাই জীবনে কোনো না কোনো পর্যায়ে ব্যর্থ এবং আর্থিক লোকসানের মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু তারা হাল ছাড়েননি। বরং অধিকতর দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করে সেই ব্যর্থতা ও লোকসান কাটিয়ে উঠেছেন।

এভাবে তারা সফলতা অর্জন করেছেন এবং সামনের দিকে ছুটে চলেছেন। তবে তাড়াতাড়ি ধনী হওয়ার জন্য কখনো অত্যধিক মুনাফা করবেন না এবং প্রতারণার আশ্রয় নেবেন না। কারণ short term gain, মানে হচ্ছে long term pain. চাকরি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের বাইরে আপনি যদি সৃজনশীল কোনো পেশায় নিজেকে গড়তে চান, তাহলেও আপনাকে নিজ নিজ কর্মে দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

আপনাকে নীরবে কাজ করতে হবে। ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট কিংবা বৈমানিক, লেখক কিংবা সাংবাদিক, কবি কিংবা সাহিত্যিক, গায়ক কিংবা নায়ক, রাজনীতিক কিংবা সমাজসেবক অথবা খেলোয়াড় যে ক্ষেত্রেই আপনি সফলতা অর্জন করতে চান না কেন, আপনাকে সাধনা করতেই হবে।

আপনাকে দায়িত্ব কাঁধে নিতেই হবে এবং ধৈর্যের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। ব্যর্থতায় কখনো হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। বরং নতুন উদ্যমে এবং উদ্যোগে কাজ করে যেতে হবে। কারণ Failure is the pillar of success. মনে রাখবেন, Failure is never final and success is never ending. সুতরাং দায়িত্ব নিন, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন এবং সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যান। আপনার সফলতা নিশ্চিত। লেখক: প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক তথ্যসূত্র: বনিক বার্তা

More News Of This Category