1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীর আত্মকাহিনি!

মধ্যস্বত্বভোগী হলো সেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, যারা উৎপাদকের পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখে। এরা সাধারণত চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি কৃষিপণ্য কিনে বাজারে ভোক্তা অথবা অন্য কোনো ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে। যেকোনো পণ্য, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির জন্য প্রায়ই এই মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করা হয়। লেখাটি মধ্যস্বত্বভোগীদের সম্পর্কে এই প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধাচরণ করে লেখা।
ছোটবেলায় মাধ্যমিকের সময় অন্য কিছু পড়তে ভালো না লাগলেও ব্যাকরণ বইয়ের রচনা বিভাগে আত্মকাহিনিবিষয়ক রচনাগুলো পড়তে খুব ভালো লাগত। এর মধ্যে সবচেয়ে ভালো লাগত জনৈক চোরের আত্মকাহিনি। কিন্তু কখনোই ভাবিনি যে একদিন এই আমাকেই একধরনের চোর চোর ভাব নিয়ে আত্মকাহিনি লিখতে হবে। কারণ আর কিছুই নয়, ভাগ্যের ফেরে আজ আমি একজন তথাকথিত মধ্যস্বত্বভোগী।

এই অধমের নাম হলো কলিম। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। মফস্বল শহরের একটি স্কুলে পড়াশোনা করতাম এবং পড়াশোনায় বরাবরই যথেষ্ট মেধার পরিচয় দিয়ে আসছিলাম। কিন্তু মাধ্যমিকের পর পর স্কুলশিক্ষক বাবার মৃত্যুর পর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ল। উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে না পারায় আর পরীক্ষাই দেওয়া হলো না। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে সংসারের দায়িত্ব কাঁধের ওপর এসে পড়ল। উপায়ান্তর না দেখে কয়েকজন বন্ধুবান্ধব মিলে একটি ট্রাক কিনে পণ্য পরিবহনের ব্যবসায় নেমে পড়লাম। গ্রামের চাষিদের কাছ থেকে ধান, পাট, সবজি কিনে শহরে বিক্রি করে যৎসামান্য যা লাভ হতো তা দিয়ে সংসার চালাতে লাগলাম।

আমি অনেক দিন জানতাম না যে আমার এই নিরীহ এবং সৎ পেশাটিকে অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি বেশ খারাপ চোখে দেখে থাকেন। আমি জানতে পারলাম ভদ্র ভাষায় আমাদের বলা হয়ে থাকে মধ্যস্বত্বভোগী। অনেকে ফড়িয়া বা দালালও বলে থাকে। টেলিভিশন কিংবা পত্রপত্রিকায় মূল্য বৃদ্ধির জন্য আমাদের মতো ফড়িয়াদের প্রায়ই দায়ী করা হয়।

আমি জানি না আমাদের অপরাধ কী। চাষির কাছ থেকে উৎপাদিত পণ্য নিয়ে তাঁকে বাজারদর বুঝিয়ে দিয়ে শহরে নিয়ে বিক্রি করি আমরা। এই কাজটি করে কী অন্যায় করছি, তা আমি আমার স্বল্প বুদ্ধিতে বুঝতে পারতাম না। তাই এ নিয়ে অনেক দিন ধরেই কিছুটা অপরাধ বোধে ভুগছিলাম। তাই আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় তাঁর বন্ধুকে নিয়ে যখন আমাদের গ্রামে বেড়াতে এলেন, তখন তাঁকে এই বিষয়গুলো জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, আমি কেমিস্ট্রি পড়েছি, এসব ব্যাপার ভালো বুঝি না। কিন্তু আমার বন্ধু এ ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করতে পারবেন। কারণ, তিনি একজন অর্থনীতির শিক্ষক। মনে বেশ দ্বিধা এবং সংকোচ নিয়ে তাঁর কাছে গেলাম। তিনি হয়তো আমার প্রশ্নগুলোকে খুবই অবান্তর মনে করতে পারেন। কিন্তু আশ্চর্য হলাম যখন দেখলাম তিনি খুবই মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনলেন।

এরপর তিনি আমাকে যা বললেন তাতে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। তিনি বললেন, দেখুন, মূল্য বৃদ্ধির জন্য আপনাদের দায়ী করাটা একেবারেই ভুল। টিভি বা মিডিয়ায় এ নিয়ে কথাবার্তা, লেখালেখি একেবারেই অজ্ঞানপ্রসূত। মধ্যস্বত্বভোগী না বলে আপনাদের আসলে বলা উচিত মধ্যসেবা প্রদানকারী। উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছাতে আপনারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে আপনার ভূমিকা উৎপাদকের থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।

আমি কিছুটা হতবাক হয়ে গেলাম। আমার দিকে তাকিয়ে তিনি মুচকি হেসে বলে চললেন। দেখুন, এই মধ্যস্বত্বভোগী আর কিছুই নয়, এটা হলো উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার সেবা প্রদান। ধরা যাক, আপনার গ্রামে আলুচাষি রয়েছেন। তিনি খেতে আলু উৎপাদন করলেন ১০০ কেজি। এটি শহরে গিয়ে বিক্রি করতে হলে তাঁকে বাস ভাড়া করতে হবে। সেই বাসের ভাড়ার খরচ রয়েছে। এভাবে প্রত্যেক চাষি যদি আলাদাভাবে গিয়ে বিক্রি করেন, তা হলে খরচ অনেক বেশি পড়ে যাবে। যেহেতু সমবায় সমিতি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সব সময় হয় না, তাই পণ্য চাষির কাছ থেকে ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব আপনারা পালন করে থাকেন।

আমি কেমন যেন একটু স্বস্তি অনুভব করলাম। একটু ভেবে জিজ্ঞেস করলাম, শুধুই কৃষিপণ্যের কাজেই মধ্যস্বত্বভোগী থাকে? অন্য কোনো পেশায় থাকে না? আরে এই মধ্যস্বত্ব ব্যবসা তো অনেকেই কমবেশি করে থাকে। এই যে কোরবানির সময় চামড়া নিয়ে যা ঘটে থাকে। পাড়ায় পাড়ায় প্রধানত যুবক বয়সের ছেলেদের ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় চামড়ার জন্য। আমরা কেন তাদের কাছে চামড়া বিক্রি করলাম? কেন আমরা সরাসরি ট্যানারির চামড়া ব্যবসায়ী কাছে বিক্রি করলাম না?

কেন? আমি বেশ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। কারণ, ঈদের আনন্দে ব্যাঘাত ঘটিয়ে চামড়া বিক্রি করাটা আমার জন্য একটি বিরাট ঝামেলা হতো। আমাকে চামড়াটি নিয়ে যে জায়গায় চামড়া কেনাবেচা হয় সেখানে নিয়ে যেতে হবে, দরদাম করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগী ব্যক্তি হলো সেই ব্যক্তি যে কিনা আমাদের এসব ঝামেলা থেকে বাঁচিয়ে দেয়। সে আপনাকে এসে বলে, ভাই, আপনার এসব ঝামেলার মধ্যে পড়তে হবে না। আমি ট্যানারির মালিকদের সঙ্গে দেনদরবার করব। এর বিনিময়ে আমি কিছু লাভ করব। তিনি একটু থেমে আবার বলা শুরু করলেন।

এরপর দেখেন, আমার চাচাশ্বশুর যখন হজে গেলেন, তাঁর জন্য টিকিট কিনতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম তিনি যে ব্যক্তির কাছে থেকে সচরাচর টিকিট ক্রয় করে থাকেন, যাদের ট্রাভেল এজেন্ট বলা হয়ে থাকে, সেই জনাব হাশেম আলীও একজন মধ্যস্বত্বভোগকারী। তিনি একটি সেবা প্রদান করে থাকেন। সেটি হচ্ছে আমাকে দশ-বারোটা প্রতিষ্ঠানের কাছে যেতে হচ্ছে না। আমি তাঁর কাছ থেকে যে প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে কম টাকায় টিকিট দিচ্ছে, তা কিনে নিলাম। এর বিনিময়ে হাশেম আলী কমিশন পাচ্ছেন। এই কমিশন আর কিছুই নয়, বিমান প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত মূল্য আর আমার কাছে বিক্রীত মূল্যের পার্থক্য। আমি জিজ্ঞেস করলাম, বিমান কোম্পানি কী কারণে নিজেরা বিক্রি না করে এজেন্টদের দিয়ে বিক্রি করে?

তিনি বললেন, কারণ, বিক্রি করার জন্য তখন আলাদা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে, কর্মচারী নিয়োগ করতে হবে; এর জন্য অনেক খরচ হবে। এর ফলে নিজেরাই বিক্রি করে খুব বেশি লাভ হতো না। তার চেয়ে এজেন্টদের মাধ্যমে বিক্রি করলে তারা এই বিরাট ঝামেলা থেকে বেঁচে যায় এবং তাদের মূল ব্যবসা যেটি বিমান পরিবহন, সেখানে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে।
আমার কাছে অনেকখানি পরিষ্কার হয়ে এল ব্যাপারটি। আমি সজোরে মাথা নাড়িয়ে আমার প্রতিক্রিয়া জানালাম। অর্থনীতির শিক্ষক বোধ করি এতে উৎসাহ পেয়ে বলে চললেন।

আপনি দেখেন, জনপ্রিয় তারকাদের নিজস্ব এজেন্ট আছে। আপনি যদি মেগাতারকা শাহরুখ খানের দিকে তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন তিনি কিন্তু সিনেমার পরিচালকদের সঙ্গে দর-কষাকষি করেন না। শাররুখ খান দেখেছেন যে তাঁর শুটিংয়ের অতি মূল্যবান সময় নষ্ট করে দর-কষাকষি করে লাভ নেই। তার চেয়ে এটা এমন একজনের হাতে ছেড়ে দেওয়া ভালো, যিনি পেশাগতভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন। তিনিই ভালো জানবেন, কীভাবে ভালো পারিশ্রমিক আদায় করা যায়। রোনালদো কিংবা মেসি—সবারই এজেন্ট আছে। এরা তো আর কিছুই নয়, সবাই মধ্যস্বত্বভোগী।

আচ্ছা, আচ্ছা। এসব উচ্চ শ্রেণীর লোকজনের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা পেয়ে কিঞ্চিৎ আহ্লাদিত বোধ করলাম।
আরও আছে। আপনি যখন বাড়ি বা জমি কিনতে যান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় তা একজন দালালের মাধ্যমে হয়ে থাকে। কারণ, আপনার জন্য এটা খুব কষ্টকর যে কোনো নতুন অঞ্চলে গিয়ে ঘুরে ঘুরে উপযুক্ত বাড়ি বা জমি খুঁজে বের করা। তার চেয়ে বেশি সহজ আপনার এমন একজনের কাছে যাওয়া, যিনি ইতিমধ্যে তাঁর শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে এই তথ্যগুলো জোগাড় করে ফেলেছেন। এখন ঢাকা শহরে জমি বা বাড়ির মূল্য বৃদ্ধির জন্য যদি এই দালালদের দায়ী করা হয়ে থাকে, তা হলে সেটা যে রকম হাস্যকর হবে, তেমনি হাস্যকর হবে ধান বা পাটের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে আপনাদের মতো ফড়িয়াদের দায়ী করা হলে।
সেটাই। আমি একমত না হওয়ার কোনো কারণই দেখলাম না।

ঢাকা শহরে জমির দাম আকাশছোঁয়া, তার কারণ হলো ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ। তেমনিভাবে যখন চাল, তেলের দাম বেড়ে যায়, তখন সেটি সরবরাহ কিংবা চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্যের কারণেই ঘটে থাকে। এর জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করাটা দুর্ভাগ্যজনক। এই যে এতক্ষণ যাদের কথা বললাম, চামড়ার ব্যবসায়ী, ট্রাভেল এজেন্ট, জমির দালাল, এই ফড়িয়ারা তো আর কিছুই নয়, এরা হলো বাজারব্যবস্থার একটি অংশ। বাজারের ভালো পণ্যের ভালো দাম পেতে নির্ভরযোগ্য তথ্য লাগে। আর তথ্য পেতে গেলে সময়, শ্রম দিতে হয়। মধ্যস্বত্বভোগীরা সেই সময়, শ্রম এবং অর্থ ব্যয় করে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। এরা তো কোনো অন্যায় সুবিধা বা ক্ষমতার বলে ব্যবসা করে না। এদের অস্তিত্বই প্রমাণ করে এদের প্রয়োজনীয়তা।

এতটুকু বলে তিনি থামলেন; বললেন, আশা করি, আমি আপনার প্রশ্নের কিছুটা হলেও উত্তর দিতে সক্ষম হয়েছি। অবশ্যই, অবশ্যই। এই বলে আমি তাকে সময় দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এলাম। এরপর যখনই শুনি মূল্য বৃদ্ধির জন্য শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করা হচ্ছে, তখন আমার পক্ষে হাসি গোপন করা একটু মুশকিলই হয়ে পড়ে।

রুশাদ ফরিদী: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
তথ্যসূত্র: প্রথমআলো ডটকম।

More News Of This Category