মালয়েশিয়ায় ব্যবসা-বানিজ্য করতে চাইলে!

কুয়ালালামপুরের ১০, জালান পুদু রোডের থ্রি স্টার ‘হোটেল মার্ক’-এর স্বত্বাধিকারী বাংলাদেশি তরুণ প্রবাসী নাহিদুল হক। বেশ কয়েক বছর ধরেই সপরিবারে তিনি মালয়েশিয়ায় বসবাস করছেন। তার হোটেলে বাঙালি ব্যবসায়ী ও পর্যকটরাই বেশি থাকেন। হোটেল ব্যবসায় অনেকটাই সফল তরুণ এ উদ্যোক্তা। ওমর ফারুক ও মেহেদী হাসান নামে আরও দুই তরুণ উদ্যোক্তা ‘সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্ট’ ব্যবসা করছেন।

কুয়ালালামপুরে তাদের চুক্তিভিত্তিক লিজ নেওয়া ১২টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে| www.travelexotika.com নামে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তারা এপার্টমেন্ট বুকিং দেন। আগামীতে অর্ধশত অ্যাপার্টমেন্ট বিজনেস করার স্বপ্ন তাদের। শুধু এই তিন তরুণ উদ্যোক্তাই নন, কয়েক হাজার বাংলাদেশি তরুণ মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন ব্যবসা করছেন। তরুণদের বড় অংশই সফল। আবার প্রবাসী বাংলাদেশির একটি অংশ মালয়েশিয়ান মেয়ে বিয়ে করেও ব্যবসাবাণিজ্য করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সেক্টরে অন্তত ১০ হাজার বাংলাদেশি ব্যবসা-বাণিজ্য করে যাচ্ছেন।

আরও অন্তত ৫০ হাজার লোকের ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ রয়েছে মালয়েশিয়ায়। স্বল্প পুঁজিতে নিরাপত্তার মধ্যেই এসব ব্যবসা করার পরিবেশ আছে। অবশ্য কেউ কেউ হয়রানির শিকারও হচ্ছেন। তবে এর সংখ্যা খুব একটা বেশি নয়। জানা যায়, প্রবাসী বাংলাদেশিরা হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় ব্যাপক সফলতার পরিচয় দিচ্ছেন। সেকেন্ড হোম হিসেবে কয়েক হাজার অ্যাপার্টমেন্ট ও ফ্ল্যাট কিনে রেখেছেন বাংলাদেশি বিত্তশালীরা। সেগুলোকে চুক্তিতে লিজ নিয়েও অ্যাপার্টমেন্টগুলোকে মিনি হোটেল বানিয়েও ব্যবসা করছেন অনেকেই।

কুয়ালালামপুরের জালান সিলাংয়ের কোতারায়ায় বাঙালিপাড়ায় রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করছেন অন্তত অর্ধশত বাংলাদেশি। জানা যায়, শুধু হোটেল-রেস্টুরেন্টই নয়, জমি-জমা লিজ নিয়ে কৃষি খামার বা ডেভেলপমেন্ট ব্যবসা, স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা, হোম সার্ভিস, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, গাড়ি বেচা-কেনা বা ভাড়ায় ব্যবসা, আইটি ব্যবসা, ফাস্ট ফুড, কফি সপসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করছেন অনেক বাংলাদেশী। মালয়েশিয়ায় সম্ভাবনাময় ব্যবসা বাণিজ্যের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন চেইন শপ-এর ফ্যাঞ্চাইজি, ল্যাঙুয়েজ সেন্টার, ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অফিস স্থাপন, সেলুন দোকান, কারওয়াশ, রেন্ট-এ কার, সাইবার ক্যাফে, মোবাইল লোড-ফটোকপির দোকান, টেইলারিং শপ, ফলের দোকান, প্রিন্টিং ব্যবসা ইত্যাদি।

এ ছাড়া কিছুটা বড় পরিসরে জমি লিজ নিয়ে সবজি আবাদ/কৃষি খামার, মত্স্য চাষের মতো ব্যবসা করা যায়। সিআইডিবি (CIDB) লাইসেন্স করে কনস্ট্রাকশন ও রিনোভেসন ব্যবসাও রয়েছে। এসবের বাইরে আছে স্বল্প পুঁজির হোম স্টে ব্যবসা। এছাড়া অনেক চাহিদা রয়েছে ইম্পোর্ট এক্সপোর্ট, বুটিক হাউজ, আইসক্রিম বা কফি সপ, বিউটি সপ বা স্পা সেন্টার ও ফুলের দোকানের। জানা যায়, হোটেল মার্ক ছাড়াও থ্রি ও ফোর স্টার মানের বাঙালি হোটেলের মধ্যে রয়েছে সাফারি হোটেল, ইজি হোটেল, মেসকিউ, হোটেল সেনডার, হোটেল ডি ভিও ইন, হোটেল রেনেসা, হোটেল গুলশান প্রভৃতি।

এরমধ্যে হোটেল রেনেসা ফাইভ স্টার মানের। এটা এখন চালুর অপেক্ষায়। হোটেল ব্যবসায়ী নাহিদুল হক জানান, বাংলাদেশ থেকে শতকরা ২০ জন আসে ঘুরতে। তারা যদি সঠিক দিক নির্দেশনা নিয়ে বাঙালি হোটেলগুলোতে উঠেন, তাহলে ব্যবসা পুরোদমে সফল হবে। অনেকেরই বাঙালি হোটেল সম্পর্কে ধারণাই থাকে না। আবার কেউ কেউ হোটেল বুক না দিয়েও আসেন। তিনি জানান, তার হোটেলে ৪৪টি রুম রয়েছে। এগুলো প্রিমিয়ার, ডিলাক্স,সুপিরিয়র ও অ্যাসেনশিয়াল চার ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে।

স্বল্প খরচেই উন্নত মানের সেবা দেওয়ার কথাও জানান তিনি। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় গিয়ে চায়না টাউন ও বাংলা মার্কেটে শত শত বাংলাদেশি মালিকানার নানা পণ্যের দোকান। জিএম প্লাজা, হানিফা মার্কেট, সগো শপিং মল, সোরিয়া টাওয়ারসহ প্রায় সব এলাকায় রয়েছে বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বিখ্যাত ল-য়েড প্লাজা রয়েছে বাংলাদেশিদের আইটি ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দুতে। অতি অল্প পরিমাণ ভাড়ায় কুয়ালালামপুরের হার্টপয়েন্ট দোকান পাওয়া যায়। মালয়েশিয়া জুড়ে রয়েছে ব্যবসার সমূহ সম্ভাবনা।

জানা যায়, মালয়েশিয়াতে দুইভাবে কোম্পানি খুলে ব্যবসা করা যায়। ১. Offshore Company (International Company)-এর অধীনে ১০০% ফরেন শেয়ারে বা Sdn. Bhd. মাধ্যমে। ২. কোম্পানির মাধ্যমে Employment Pass নিয়েও যে কেউ বৈধ ভিসা নিয়ে সপরিবারে বসবাস ও ব্যবসা করতে পারেন। তবে সরকারকে ৬ ভাগ জিএসটি বা ট্যাক্স দিতে হবে। রাজধানীতে ব্যবসা করতে ডিবিকেএল লাইসেন্স ও ডব্লিউআরটি লাইসেন্স থাকতে হবে। মালয়েশিয়ান অংশীদার ও কর্মী থাকার বিধিও রয়েছে ব্যবসা খুলতে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে ৩০ থেকে ৪০ কার্য দিবসের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন সম্ভব।

কাগজপত্র তৈরি হয়ে গেলে কনসালটেন্সি ফার্মের মাধ্যমে প্রার্থীকে ডেকে নেয় মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন অফিস। এরপর মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে ভিসা নিতে হয় প্রার্থীকে। মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন অফিস অতি দ্রুত ভিসা হাতে দিয়ে দেয়। মালয়েশিয়া প্রবাসী ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিক কোম্পানির অধীনে বিজনেস রেসিডেন্স ভিসা করলে পাঁচ বছর পরে মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব (পিআর) পাওয়া যায় সহজেই। ২ বছর পর পর ভিসা নবায়ন করে আজীবন বসবাস করা যায়। ৫ বছর পর স্থায়ী নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যায়। গত কয়েক বছরে অন্তত ৫ হাজার বাংলাদেশি স্থায়ী নাগরিকত্ব বা মালয়েশিয়ান Passport পেয়েছে বলেও জানান তারা।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন!

SHARE