1. editor@islaminews.com : editorpost :
  2. jashimsarkar@gmail.com : jassemadmin :
সফলতার গল্প :

মায়ের কানের দুল বেচে শুরু, ওয়ালটনের সাথে ব্যবসা করে কোটিপতি!

ব্যবসা করতে কি লাগে! অনেকের ধারণা প্রচুর অর্থ বা মূলধন। কিন্তু সফল ব্যবসায়ীদের মত ভিন্ন। তাদের মতে ব্যবসা করতে লাগে বুদ্ধি। সাথে পরিশ্রম ও একাগ্রতা থাকলে ব্যবসার মূলধনের যোগান কোনো না কোনো ভাবে হয়ে যাবে। শূন্য থেকে শুরু করে বিশাল সফলতায় পৌঁছাতে কোনো প্রতিকূলতা আটকে রাখতে পারবে না।

এমন একজন সফল ব্যবসায়ীর উদাহরণ মো. সালাউদ্দিন। বাড়ি কুমিল্লার তিতাস উপজেলার কলাকান্দি গ্রামে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করা সালাউদ্দিন ব্যবসা শুরু করেন মায়ের কানের একজোড়া সোনার দুল বিক্রি করে। মাত্র ৫ হাজার টাকা নিয়ে। দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটনের পণ্য বিক্রির ব্যবসায় আজ সেই সালাউদ্দিন কোটিপতি। মা-বাবা, ভাই-বোনদের নির্ভরতা। আরো বহুজনের জীবিকার্জনের কারিগর।

তবে এ কথা ভাবার অবকাশ নেই যে আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে সালাউদ্দিন রাতারাতি কোটিপতি বনে গিয়েছেন। তার সফলতার পেছনে আছে অনেক কঠিন সংগ্রামের ইতিহাস। নিজের মেধা, পরিশ্রম, একাগ্রতা সেইসঙ্গে ওয়ালটনের সহায়তায় আজ সফলতার শিখরে পৌঁছেছেন সালাউদ্দিন। সম্প্রতি ঢাকার বসুন্ধরায় ওয়ালটন গ্রুপের করপোরেট অফিসে এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন সালাউদ্দিন। সেখানে এক ফাঁকে শোনান তার সফলতার কাহিনী।

শুরুর গল্প: শুরুটা ২০০৪ সালে। সালাউদ্দিনের বাবা মোস্তফা কামাল ছোটখাটো ব্যবসা করতেন। তাতে পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে নয় জনের সংসার চলতো কষ্টে-সৃষ্টে। বড় ছেলে হওয়ায় সংসারের হাল ধরার সিদ্ধান্ত নেন সালাউদ্দিন। কতই বা বয়স তার! অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছেন তখন। দুই মামা বিদেশে থাকেন। আশ্বাস দিলেন ভাগ্নেকেও বিদেশে নিয়ে যাবেন।

এজন্য ঢাকা এসে ইলেকট্রিকের কাজ শেখার পরামর্শ দেন। যাতে বিদেশে গিয়ে বিল্ডিং নির্মাণ সাইটে হাউজওয়্যারিংয়ের কাজ করতে পারেন। অনেক কষ্ট করে ঢাকায় এক বছর থেকে ইলেকট্রিকের কাজ শেখেন সালাউদ্দিন। পাসপোর্টও করেন। কিন্তু মামারা আর বিদেশ নিয়ে যাননি। ব্যর্থ মনোরথে গ্রামে ফিরে যান তিনি।

হতাশায় ভেঙে না পড়ে সিদ্ধান্ত নেন নিজেই কিছু করবেন। হাতে কোনো টাকা নেই। আছে শুধু আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন আর দৃঢ় মনোবল। তাই নিয়েই কাজে নেমে পড়েন। বাড়ির কাছে কলাকান্দি বাজারে নতুন একটি মার্কেট তৈরি হচ্ছে। সেখানে দোকান নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অ্যাডভান্স হিসেবে দিতে হবে ৫ হাজার টাকা। দোকান হাতে পাবেন আরো অন্তত ৬ মাস পর। কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না সালাউদ্দিন।

এ সময় এগিয়ে আসেন সালাউদ্দিনের মা মোসাম্মত শামসুন্নাহার। বিয়ের সময় ভাইয়েরা একজোড়া সোনার দুল দিয়েছিলেন শামসুন্নাহারকে। সেই দুলজোড়া তুলে দেন ছেলের হাতে। সময়টা ২০০৫ সাল। আটআনা ওজনের দুল বেচে পান ৫ হাজার টাকা। ওই টাকা দোকানের অ্যাডভান্স হিসেবে দেন। এ সময় বাড়িতে বাড়িতে ইলেকট্রিক মিস্ত্রির ছোটখাটো কাজ করতে থাকেন।

দোকান তৈরি হতে বাবা বিভিন্ন জায়গা থেকে ২০ হাজার টাকা যোগাড় করে দেন সালাউদ্দিনকে। মা-বাবার দোয়া নিয়ে দোকান চালু করেন। যেহেতু মায়ের দুল বেচার টাকায় দোকান নেয়া, তাই দোকানের নাম দেন ‘মায়ের দোয়া ইলেকট্রনিক্স’। প্রথমে ইলেকট্রিকের খুচরা কিছু মালামাল তুলে ব্যবসা শুরু করেন।

পাশাপাশি বাড়িতে বাড়িতে ইলেকট্রিকের কাজ চলতে থাকে। এ সময় হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটেন সালাউদ্দিন। তার নিজের কথায়, তখন ভাইবোনদের ১০০ টাকা দিয়েও প্রাইভেট পড়ানোর সামর্থ নাই। তাই গাধার মতো খাটতে থাকলাম। অনেক পরিশ্রম করলাম। তাতেও খুব একটা ভালো করতে পারছিলাম না।

স্বপ্ন যার অনেক বড়, সে থেমে থাকবে কেন? ইলেকট্রিকের কাজ করে কিংবা খুচরা মালামাল বিক্রি করে সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না সালাউদ্দিন। মনে স্বপ্ন টিভি-ফ্রিজের বড় শোরুম দেবেন। একটি এনজিও থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ আর গ্রামের অবস্থাপন্ন মানুষদের কাছ থেকে আরো এক লাখ টাকা ধার করে দু’একটি কোম্পানির সাথে ব্যবসা করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সফল হলেন না। এতেও দমে যান নি সালাউদ্দিন। খুঁজতে থাকেন নতুন ব্যবসার পথ।

আলোকবর্তিকা নিয়ে আসে ওয়ালটন: এই সময়ে তিতাস উপজেলায় ওয়ালটনের ডিলার এস কে এন্টারপ্রাইজের মাইকিং শোনেন সালাউদ্দিন। ওয়ালটন বাংলাদেশি ব্র্যান্ড। তারা তৈরি করছে বিশ্বমানের টিভি-ফ্রিজ-এসিসহ ইলেকট্রনিক্স পণ্য। সাশ্রয়ী মূল্য ও সর্বোত্তম বিক্রয়োত্তর সেবা দিচ্ছে ক্রেতাদের।

এসব শুনে যারা মাইকিং করছিল, তাদের কাছ থেকে এস কে এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী কবির হোসেনের ফোন নাম্বার নেন সালাউদ্দিন। তাকে ফোন করে বলেন, ভাই আমার তো পুঁজি নাই। কিন্তু আপনার কাছ থেকে ওয়ালটন পণ্য নিয়ে বিক্রি করতে চাই। কবির হোসেন তাকে দেখা করতে বলেন। মাত্র ৯০ হাজার টাকা নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে যান। সালাউদ্দিনের আগ্রহের কথা জেনে তাকে ৩ লাখ টাকার ওয়ালটন পণ্য দেন কবির হোসেন।

সফলতার শুরু: ওয়ালটনের পণ্য দোকানে তোলার পর আর পেছনে তাকাতে হয় নি সালাউদ্দিনকে। এর কয়েকদিন পরেই ঈদ। ওই মৌসুমে প্রায় ৮০টি ওয়ালটন ফ্রিজ বিক্রি করেন সালাউদ্দিন। লাভ হয় কয়েক লাখ টাকা। এনজিও থেকে নেয়া ঋণের টাকা ফেরত দেন। দোকানের পরিধিও বড় করেন।

এই সময় এক বন্ধুর কাছ থেকে আরো ৪ লাখ টাকা ধার নিয়ে মুরাদনগরের বাখরাবাদ বাজারে ওয়ালটনের আরেকটি ছোট শোরুম দেন তিনি। সেখানেও বিক্রি হতে থাকে খুব। এক বছরের মধ্যে বন্ধুর টাকা ফেরত দেন। বাড়ে শোরুমের পরিসর। ওয়ালটন পণ্যে ক্রেতাদের ব্যাপক চাহিদার ফলে বাখরাবাদ বাজারে তৃতীয় শোরুমটি দেন সালাউদ্দিন।

হঠাৎ হোঁচট: তখন প্রতিটি শোরুমে একজন করে কর্মচারী ছিল। মোটরসাইকেলে যাতায়াত করে তিনটি শোরুম একাই চালাতেন সালাউদ্দিন। একদিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। সালাউদ্দিন পায়ে ভীষণ আঘাত পান। গুরুতর আহত হয়ে চার মাস বিছানায় পরে থাকতে হয় তাকে।ভাইয়েরা তখনো ছোট। স্কুলে যায় সবাই। এমন সংকটে দ্বিতীয় ভাই শোরুমের দায়িত্ব নেন। পাশাপাশি বাড়ি থেকে ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে শোরুম চালাতে থাকেন সালাউদ্দিন। চার মাস পরে সুস্থ হয়ে আবার পূর্ণ উদ্যমে ব্যবসায় লেগে যান।

ওয়ালটনের সঙ্গে যুক্ত হয় মার্সেল: এ সময় ওয়ালটন গ্রুপের আরেকটি ব্র্যান্ড মার্সেলের পণ্য বিক্রি শুরু করেন সালাউদ্দিন। দুর্ঘটনার পরও ওই মৌসুমে ওয়ালটন পণ্য বিক্রি করে প্রায় ৭ লাখ টাকা লাভ হয় তাদের। পর্যায়ক্রমে সবগুলো শোরুম বড় করেন। বর্তমানে তৃতীয় শোরুমটির আয়তন ২ হাজার ২ শত বর্গফুট। তিনটি শোরুমে ভর্তি পণ্য। এখন ডিসপ্লেতেই আছে ২২০টি ফ্রিজ।

সব মিলিয়ে তিন শোরুম ও গুদামে রয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকার পণ্য। সম্প্রতি মার্সেলের ডিস্ট্রিবিউটর হয়েছেন সালাউদ্দিন। বাখরাবাদ বাজারে ২ নম্বর শোরুমটি মার্সেলের জন্য আলাদা করেছেন। শোরুমটিতে এখন শুধু মার্সেল পণ্যই থাকবে। গত ঈদে এই শোরুম থেকে প্রায় ৮০টি মার্সেল ফ্রিজ বিক্রি করেছেন সালাউদ্দিন। তার এলাকায় ওয়ালটনের মতো দিন দিন ব্যাপক চাহিদা বাড়ছে মার্সেল পণ্যের।

সফলতা হাতের মুঠোয়: দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটন এবং মার্সেলের পণ্য ব্যবসায় সালাউদ্দিন আজ কোটিপতি। সেইসঙ্গে তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেকের। বর্তমানে সালাউদ্দিনের শোরুমে ৬ জন বেতনভুক্ত কর্মচারীসহ আরো প্রায় ১০ জন বিভিন্নভাবে যুক্ত আছেন। ওয়ালটন ও মার্সেলের তিনটি শোরুম এবং অন্যান্য ব্যবসা থেকে বর্তমানে সালাউদ্দিনের মাসিক আয় প্রায় তিন লাখ টাকা। ফ্রিজ বিক্রির মৌসুমে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৫-১৬ লাখে।

সবার ভরসা সালাউদ্দিন: সংসারের সব দায়িত্ব সালাউদ্দিনের কাঁধেই। চার বছর ধরে বাবাকে আর কোনো কাজ করতে দিচ্ছেন না। ৬০ লাখ টাকা খরচ করে বাড়িতে বিল্ডিং তৈরি করেছেন। জমি-জমা কিনেছেন। বোনদের বিয়ে দিয়েছেন। মা-বাবার পছন্দে নিজেও বিয়ে করেছেন। দুই মেয়ে এবং এক ছেলে নিয়ে তার সুখের সংসার।

পাঁচভাই একসঙ্গে বসবাস করেন। ভাইদেরও প্রতিষ্ঠিত করে দিচ্ছেন সালাউদ্দিন। দুই ভাই কলেজে পড়ছে। সবচেয়ে ছোট ভাই এবার জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। অন্য ভাইকে হার্ডওয়্যারের ব্যবসায় লাগিয়ে দিয়েছেন। পড়াশুনার পাশাপাশি ভাইয়েরা সালাউদ্দিনের শোরুমে সাহায্য করেন।

ভাই-বোনেরা যখন যা চায়, তখনই তাদের আবদার পূরণ করেন সালাউদ্দিন। তার কথায়, এক সময় আমি একটা বাইসাইকেল কিনতে পারি নাই। আর এই তো সেদিন সাড়ে ৩ লাখ টাকা দিয়ে ছোটভাইকে মোটরসাইকেল কিনে দিলাম।

আর মাকে? মা-ই তো সব। তার দুল বিক্রির টাকায় আমার ব্যবসা শুরু। কয়েক বছর আগে মাকে ৪২ হাজার টাকা দিয়ে সোনার দুল তৈরি করে দিয়েছি। এবার ৫০ হাজার টাকার সোনার চেইন দিতে চাচ্ছি। মা নিতে চাচ্ছেন না। বলছেন সবার জন্য তুমি যা করছো, আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন, তাতেই আমরা সন্তুষ্ট। আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া।

বাবা-মা, ভাই-বোন সবার ভরসা কিংবা নির্ভরতার নাম সালাউদ্দিন। কিন্তু সালাউদ্দিনের নির্ভরতা কিসে? সহাস্যে জানান, তার নির্ভরতা বা ভরসা যেটাই বলেন না কেন, তা হলো দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটন এবং মার্সেল। তিনি বলেন, আমি নিজে পড়াশুনা করতে পারি নাই। মামারা বিদেশে নিয়ে যাবেন। যেখানে গিয়ে কাজ করে সংসারের হাল ধরবো। এই ছিল স্বপ্ন। কিন্তু বিদেশে যাওয়া হয় নাই। আল্লাহ আমার জন্য দেশেই রিজিক লিখে রেখেছিলেন।

বিদেশে গিয়ে হয়তো শ্রমিকের কাজ করতে হতো। আর দেশে আমি একজন ব্যবসায়ী হিসেবে অনেক সম্মান পাচ্ছি। অনেক ভালো আছি। এ সবই সম্ভব হয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন এবং মার্সেলের সৌজন্যে। আমি ওয়ালটন এবং মার্সেল কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তথ্যসূত্র: রাইজিং বিডি।

More News Of This Category