1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

যা করতে ভাল লাগে, সেগুলোকে ‘কিছু করা’ বলে স্বীকৃতি দেয় না সমাজ

জনপ্রিয় কমেডি শো ‘মীরাক্কেল’-এর উপস্থাপক মীরের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। কনেপক্ষের একজন স্বভাবতই জিজ্ঞাসা করলেন, ছেলে করে কি? পাত্রের অভিভাবক কিছুটা গর্ব করেই বললেন, একটা রেডিও চ্যানেলে খবর পড়ার পাশাপাশি অনুষ্ঠানের ঘোষক হিসেবে আছে; কলকাতা শহরের বড় বড় অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে।

তাছাড়া বিজ্ঞাপনে নিয়মিত কণ্ঠ দেয়; অল্প-বিস্তর গানও গায়! সব শুনে কনেপক্ষের মুরব্বি ব্যক্তিটির নির্লিপ্ত উচ্চারণ— সবই তো বুঝলাম, কিন্তু ছেলে আসলে কী করে? অর্থাত্ এতক্ষণ যা যা বলা হলো, সেগুলোর কোনোটিই ‘করা’র পর্যায়ে পড়ে বলে তার মনে হয়নি! ভদ্রলোক হয়তো চাকরি বা ব্যবসার মতো একটি ‘কাজের’ কথা শুনতে চাইছিলেন। ফলাফল সহজেই অনুমেয়।

আমাদের দেশে কিশোর বা যুবক বয়সে অনেকেই এমন কিছুর সঙ্গে যুক্ত থাকে, যা করতে সত্যিই তার ভালো লাগে; মেধা-শ্রম উজাড় করে দিন-রাত পরিশ্রম করে সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে। কিন্তু প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা সেগুলোকে ‘কিছু করা’ বলে স্বীকৃতি দেয় না বলেই হয়তো আমাদের যে বন্ধুটি সকাল-সন্ধ্যা বিশ্ববিদ্যালয়, স্টেডিয়াম আর সুইমিংপুল দাপিয়ে বেড়াত, স্বীকৃতিস্বরূপ ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল, সে এখন হাঁস-মুরগির খাবার বাজারজাত করে অহোরাত্রি!

খুব ইচ্ছা ছিল খেলার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পেশায় থাকার, কিন্তু বাস্তবতা তাকে ঠেলে দিয়েছে পোলট্রি ফিড ব্যবসায়। এটা শুধু আমার বন্ধুটির ক্ষেত্রে হয়েছে তা নয়। সেদিন জানলাম, বাংলাদেশের আইসিসি চ্যাম্পিয়নশিপ ও টেস্ট স্ট্যাটাস অর্জনকারী দলের ওপেনিং ফার্স্ট বোলার এখন ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কয়েকটি পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করছেন। সাক্ষাত্কারে বলেছেন, বেশ ভালো আছেন!

এমনিভাবে হাজারো প্রতিভা আমাদের চারপাশে রয়েছে, যারা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় পাগলের মতো ব্যয় করেছেন খেলাধুলা, শিল্পচর্চা কিংবা সহপাঠ্যক্রমিক কোনো কার্যক্রমে। অথচ জীবিকার তাগিদে এখন সারা দিন ব্যাংকে বসে অন্যের টাকার হিসাব মেলান কিংবা দিনরাত পরিশ্রম করেন বদ্ধ কোনো অফিস ঘরে। কারণ এ দেশে সাকিব কিংবা মুস্তাফিজের মতো ক’জনের সৌভাগ্য হয় প্যাশনকেই প্রফেশন হিসেবে নেয়ার?

বাংলার দামাল ছেলেরা যখন ক্রিকেটবিশ্বের সিংহদের একের পর এক ভেড়া বানিয়ে সগৌরবে মেলে ধরে লাল-সবুজের পতাকা, তখন কোটি প্রাণ হয় ঐক্যবদ্ধ; ক্ষণিকের জন্য হলেও ভুলে যায় সব বিভেদ ও দ্বন্দ্ব। খুব জানতে ইচ্ছে করে, অন্যান্য খেলায় যখন বাছাই পর্বই পেরোতে পারি না, সেখানে ক্রিকেট বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালও আমাদের মন ভরাতে পারছে না!

এই সফলতার ‘গোপন রহস্য’ কী? কেউ কেউ বলেন, ক্রিকেটের প্রতি আমাদের গভীর ভালোবাসাই এর মূল উত্স। সত্যিই কি তা-ই? আমাদের ছোটবেলায় দেশ রাজনৈতিকভাবে যতটা না বিভক্ত ছিল, তার চেয়ে বেশি বিভক্ত ছিল আবাহনী আর মোহামেডানের ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে।

দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতো এই দুই দলের সপক্ষে স্লোগান, সর্বত্র উড়ত তাদের পতাকা। খেলায় হার মানতে না পেরে সমর্থকরা হয়ে উঠত বিক্ষুব্ধ এবং খেলা শেষে সংঘর্ষ হয়ে উঠেছিল অনিবার্য। ফলে একপর্যায়ে ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল দর্শকবিহীন আর্মি স্টেডিয়ামে! দর্শকদের অনুরোধ করা হয়েছিল ঘরে বসে টেলিভিশনে খেলাটি দেখার জন্য।

তখন কায়সার হামিদ, আসলাম, সাব্বির, কাননরা ফিল্মস্টারদের চেয়ে কম জনপ্রিয় ছিলেন না; তাদের দলীয় ও একক ছবি শোভা পেত পাড়ার ক্লাব, হল-মেস, বসার ঘর সর্বত্র। এখনো ভোরে প্রচণ্ড হাততালি আর চিত্কারে আচমকা ঘুম ভেঙে গেলে বুঝতে পারি, বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদের খেলা চলছে!

সিলেটে অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ ফুটবলের প্রতিটি ম্যাচ শেষে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়ে পুরো শহর স্থবির হয়ে পড়ত কয়েক ঘণ্টার জন্য। আমার তো মনে হয়, যে বছর আমরা ক্রিকেটে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হব, সেবারো প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় বাংলাদেশের এত পতাকা উড়বে না— এখন বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার যে পরিমাণ পতাকা ওড়ে! তার পরও কি বলা যায়, ভালোবাসার অভাবেই একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় খেলাটি ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে?

কিশোর বা তরুণরা কেন ফুটবলকে জীবনের সাধনা হিসেবে নেবে, দক্ষতা অর্জনে হবে সচেষ্ট? এ বিষয়ে একটি ঘটনা বোধহয় প্রাসঙ্গিক হবে। স্পেনের বার্সেলোনার নিকটবর্তী যে শহরে ছিলাম, সেখানে বাঙালি এক পরিবারের সঙ্গে বেশ জানাশোনা ছিল। তিন ছেলের মধ্যে মেজ ও ছোট ছেলেটি খুব ভালো ফুটবল খেলত।

তাদের বাবার সঙ্গে সন্তানদের লেখাপড়া বিষয়ে যখনই কথা বলতাম, তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে ছেলেদের ফুটবলের দক্ষতা নিয়ে আলোচনা শুরু করতেন। আমাদের দেশে অভিভাবকরা চান সন্তানদের ওসব বিষয় চাপা দিয়ে লেখাপড়ায় ভালো করার উপায় খুঁজতে, অথচ সেখানে তিনি করতেন উল্টোটা!

একদিন বিরক্ত হয়ে বললাম, আপনার কী ধারণা, ওরা ফুটবল খেলে মেসি বা রোনাল্ডো হবে? খুব সাবলীলভাবে তিনি জবাব দিলেন, চেষ্টা করতে দোষ কী? আর যদি বড় ক্লাবে খেলতে নাও পারে, স্পেনের পাড়া-মহল্লার ক্লাবে ফুটবল খেলেও মানসম্মত জীবনযাপন সম্ভব! তখন বুঝলাম, শুধু লেখাপড়ায় ভালো করা ছাড়াও ভালো পেশায় যাওয়া যায় বলেই তিনি সন্তানদের প্যাশনকে সাদরে গ্রহণ করতে পারছেন। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা কি আদৌ ভাবা যায়?

একসময় সুইডেন ও রাশিয়ায় ডানা কাপ এবং গোথিয়া কাপে আমাদের ক্ষুদে ফুটবলাররা (এমনকি ব্রাজিলকেও হারিয়ে) চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সেই ফুটবলারদের আমরা ধরে রাখতে পারলাম না কেন? প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, আর্থিক প্রণোদনা, বিকাশের সুষ্ঠু পরিবেশ— এর কোনোটিই কি আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? যেখানে ক্রিকেটের এক টুর্নামেন্টে খেলার জন্য সাকিবরা লাখ লাখ ডলার গুনছেন, সেখানে ফুটবলে জাতীয় দলের ক্যাপ্টেনের নাম দেশের কয়জন মানুষ জানে? হয়তো এখানেও অর্থই অনর্থের কারণ হয়েছে।

আমাদের ছেলে বিশ্বর্যাংকিংয়ে এক নম্বর— ভাবতেই ভালো লাগে। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রগুলোয় কেন এই দুর্গতি? কারণ যেকোনো পেশায় সর্বোচ্চ সফলতা পেতে প্যাশনের সঙ্গে প্রফেশনের সমন্বয়টা যে বড় বেশি দরকার। পেশাদারিত্ব অর্জন ‘বাই চান্স’ হয় না। এর জন্য দরকার হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আন্তরিক চেষ্টা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা।

যে ছেলে বা মেয়েটি ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত স্বপ্ন দেখল ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার; সেখানে চান্স না পাওয়ায় অভিভাবক জোর করে পাঠাচ্ছে বিবিএ পড়তে! পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ার সুযোগ পেয়ে মা-বাবা বেজায় খুশি! কিন্তু শিক্ষার্থীর মনের অবস্থা কেউ কি জানতে চেষ্টা করছি? সেটি করছি না কারণ তার মধ্যে চিকিত্সাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রতিভা থাকলেও মা-বাবার বর্তমানে চাওয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতে ন্যূনতম পরিচয় দেয়ার মতো একটা ‘চাকরি’র নিশ্চয়তা।

আর বিবিএ পড়লে এখন চাকরির বাজারে অগ্রাধিকার পাওয়া যায় বলে তারা শুনেছেন; ফলে সেটিই পড়তে হবে! শিক্ষার্থীটি মোটেও এ বিষয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে কিনা কিংবা মানসিকভাবে প্রস্তুত কিনা, তা কেয়ার করার সময় নেই। সেজন্য বিবিএর প্রথম ক্লাসে সাধারণত ওদের বলি, তোমরা মন খারাপ করো না। ধরে নাও ভালোবেসেছিলে একজনকে, হঠাত্ মা-বাবা জোর করে বিয়ে দিয়েছে ‘ভালো পাত্রে’র সঙ্গে।

চেষ্টা করো তার সঙ্গেই মন দিয়ে সংসার করতে! সেটেল্ড ম্যারেজের মতো সেটেল্ড সাবজেক্ট নিয়ে অনার্স ও মাস্টার্স পড়া; তার পর সারা জীবন সেই ঘানি টানতে থাকা (ফিল্ডে চাকরি করা)। ভালো লাগুক বা না লাগুক ‘একটা কিছু’ তো করছে, তাতেই আমরা সন্তুষ্ট। সেজন্যই হয়তো যুগের পর যুগ কাজ চালিয়ে নেয়ার মতো লোক পাচ্ছি, কিন্তু পেশাগত সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জনের উদাহরণ খুবই নগণ্য।

প্রত্যাশিত পেশা থেকে নগদ প্রাপ্তিই যেন আমাদের অগ্রাধিকার। যদি সামান্য শঙ্কাও থাকে ভবিষ্যতে ওই পেশা থেকে কম লাভবান হওয়ার, তবে প্যাশনকে গুডবাই বলে আমরা পয়সার দিকে ছুটি। হয়তো সে কারণেই সাকিব আল হাসান ক্যারিয়ারে সাফল্যের শীর্ষে থেকেও ক্রিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো উদ্যোগ না নিয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নেমেছেন।

সিনেমার পর্দায় একসময়ের সফল জুটি মৌসুমী-ওমরসানি সিনেমাসংশ্লিষ্ট কাজে না গিয়ে খুলে বসেছেন তৈরি পোশাকের দোকান! এশিয়ান হকিতে একসময় ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়া খেলোয়াড় নাকি নিউমার্কেটে খুলেছেন স্টেশনারি পণ্যের দোকান। যুুক্তি হিসেবে বলেছেন, খেলা ছেড়ে দেয়ার পরে সংসার চলবে কীভাবে? সত্যিই তা-ই।

পেটে ক্ষুধা নিয়ে তো আর শিল্পচর্চা হয় না। ফলে যে সন্তানটি খেলোয়াড় বা শিল্পী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর, মনেপ্রাণে সচেষ্ট— তাকে আমরা পাঠাচ্ছি একাডেমিক কোচিং সেন্টারে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে। পরিশেষে সে ডাক্তারও হয় না, খেলোয়াড়ও হয় না। যেটা হয় সেটা হলো— পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝা!

মেসি কিংবা রোনাল্ডোর কাজের স্বীকৃতি দেয়ার আগে আমরা কি জানতে চাই, তারা কী পাস? শাহরুখ কিংবা আমির খানের প্রশংসা করার আগে কি কখনো ভাবি, তাদের লেখাপড়ার দৌড় কতটুকু? সাকিব ও মুশফিকুর রহিমের মধ্যে কে ভার্সিটি পাস? হিরো সাকিব খান আর ফেরদৌসের মধ্যে কে বেশি শিক্ষিত? নায়িকা জয়া, শাবনুর, মাহীরা স্কুলে কেমন ছাত্রী ছিলেন?

এ প্রশ্নগুলো একেবারেই গৌণ এ কারণে যে, আমরা তাদের যে ভূমিকার জন্য চিনেছি, তার সঙ্গে লেখাপড়া কিংবা ভালো রেজাল্ট মোটেই সম্পর্কিত নয়। তাদের নিজ নিজ কর্মগুণ আমাদের কাছে তাদের পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য করেছে। প্যাশনকে গুরুত্ব দিয়ে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সুযোগকে পাশ কাটিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে এসে কাজ শুরু করলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো নোবেল পুরস্কার মেলে কিংবা হুমায়ূন আহমেদের মতো খ্যাতিমান লেখক হওয়া যায়।

কিন্তু আমরা কেরানিগিরি মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারিনি বলেই হয়তো যা যা করলে চাকরি পাওয়া যায়, সেগুলোর পেছনে ছুটি, চাকরি দেয়ার যোগ্যতা অর্জনের পেছনে নয়! লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট তথ্যসূত্র: বনিকবার্তা।

More News Of This Category