1. uddoktarkhoje@gmail.com : uddoktarkhoje :

যেভাবে চলে জাপানের কয়েক হাজার প্রাচীণ ব্যবসা

জাপানের প্রাচীন রাজধানী কিয়োটোর শহরতলির বাইরে রাস্তার এক কোনায় অবস্থিত চায়ের দোকান ‘সুয়েন টি’। যার সামনেই রয়েছে বড় একটি নদী ও সেতু। অসাধারণ মঠ, মন্দির আর উদ্যানের (এবং সেলফি স্টিক হাতে পর্যটকদের) জন্য সুপরিচিত শহরটিতে ‘সুয়েন টি’র ভবনটি উল্লেখ করার মতো বিশেষ কিছু না হলেও শান্ত পরিবেশে বসে আইসক্রিম বা গ্রিন টি উপভোগের উপযোগী।

তবে সুয়েন টির বিশেষত্ব হলো দোকানটি ১১৬০ সাল থেকে চালু রয়েছে এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো ও ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত চায়ের দোকান বলে দাবি করা হয়েছে। দোকানটির মালিক ৩৮ বছর বয়সী ইউসকে সুয়েন জানান, আমরা কেবল চায়ের দিকেই মনোযোগ ধরে রেখেছি। আর ব্যবসাও খুব বেশি বাড়ানি। এ কারণেই আমরা এখনো টিকে রয়েছি।

হয়তো কিয়োটোর মতো ঐতিহ্যবাহী ও কারিগরি দক্ষতার জন্য সুপরিচিত শহরে ৯০০ বছরের পুরনো চায়ের দোকানের টিকে থাকা আশ্চর্য কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সুয়েন টি একা নয়, এমন বহু প্রাচীন ব্যবসা আজও টিকে থাকার নিদর্শন রয়েছে। ২০০৮ সালে ব্যাংক অব কোরিয়ার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের ৪১টি দেশে ২০০ বছরের পুরনো ৫ হাজার ৫৮৬টি কোম্পানি রয়েছে, যার ৫৬ শতাংশই জাপানে অবস্থিত। ২০১৯ সালে জাপানে এক শতাব্দী পুরনো ৩৩ হাজারের বেশি ব্যবসা থাকতে দেখা গেছে।

ইয়ামানাশিতে রয়েছে বিশ্বের প্রাচীনতম হোটেল, যা ৭০৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ব্যবসা করছে। এছাড়া কিয়োটোতে ইচিমনজিইয়া ওয়াসুকে কনফেকশনারি ১০০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে মিষ্টি বিক্রি করছে। এমনকি সান্তোরি ও নিনতেন্দোর মতো বৈশ্বিক জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর রয়েছে অপ্রত্যাশিত দীর্ঘ ইতিহাস। এখন প্রশ্ন হলো, এই বিদ্যুত্গতির স্টার্টআপ ব্যবসার যুগে আমরা জাপান থেকে কী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি?

কিয়োটো ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের ডিন ও অধ্যাপক ইয়োশিনোরি হারা জানালেন, এসব দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠান (ন্যূনতম শতবর্ষী পুরনো) শিনিসে নামে পরিচিত, যার আক্ষরিক অর্থ ‘পুরনো দোকান’। দীর্ঘদিন ধরে সিলিকন ভ্যালিতে কর্মরত হারা বলেন, দ্রুত মুনাফা বৃদ্ধি নয়, বরং জাপানি কোম্পানিগুলো টেকসইয়ের ওপর জোর দেয়। দেশের এত এত ব্যবসার দীর্ঘদিন টিকে থাকার প্রধান কারণও এটি। জাপানে আমাদের চিন্তা হলো, কীভাবে এগুলো (কোম্পানি) আমাদের বংশধর, আমাদের সন্তান, তাদের সন্তানদের কাছে দিয়ে যাব।

ইউসকে সুয়েন জানান, তার শৈশবের বহু বন্ধু কিয়োটোর শতাব্দী প্রাচীন কোম্পানি পরিচালনাকারী পরিবারগুলোতে জন্মগ্রহণ করেছে। সুয়েনের কাছে পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরা নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই। তিনি বলেন, ব্যবসা আমি শুরু করিনি, আমি কেবল পূর্বপুরুষদের ব্যবসা চালাচ্ছি। আমি হাল না ধরলে এ পরম্পরার অবসান ঘটত। ছোটবেলা থেকেই ব্যবসার দায়িত্ব নেয়া আমাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন হয়ে ওঠে। এটাই স্বাভাবিক।

যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য দেশের তুলনায় জাপানের শহর ও নগরগুলো শত শত বছর ধরে বিদ্যমান, যে কারণে বহু পুরনো কোম্পানির টিকে থাকা অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। তবে জাপানে এই টিকে থাকার আরো কিছু নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ইনান সাসাকি।

জনপদের স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে যতদিন সম্ভব সংরক্ষিত করা নিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষার উল্লেখ করে সাসাকি বলেন, আরো সাধারণভাবে বললে, মূল কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনের ফল, ঐতিহ্য ও পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা করার সংস্কৃতি। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাপানের দ্বীপরাষ্ট্র হওয়ার বৈশিষ্ট্য, যার কারণে অন্যান্য দেশের সঙ্গে জাপানের যোগাযোগও সীমিত।

প্রাচীন কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই মাঝারি বা ক্ষুদ্র পারিবারিক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, যাদের প্রধান মনোযোগ আতিথেয়তা ও খাবার, যেমন সুয়েন টি। এছাড়া ব্যবসার অটুট উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে পরিবারের কর্তা নির্ধারণে জাপানের স্বীকৃত চর্চাও দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণ। যেমনটা আমরা দেখতে পাই সুজুকি মোটর ও প্যানাসনিকের ক্ষেত্রে।

জাপানের আরেকটি শিনিসে হলো ভিডিও গেম কোম্পানি নিনতেন্দো। বিশ্বের কাছে প্রযুক্তি কোম্পানি হিসেবে পরিচিত হলেও নিনতেন্দো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮৮৯ সালে। সে সময় কোম্পানিটি জাপানি খেলা হানাফুদার জন্য কার্ড তৈরি করত। ইয়োশিনোরি হারা বলেন, ‘মূল পারদর্শিতা’ ধরে রাখার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে নিনতেন্দো। প্রযুক্তিগত বা বৈশ্বিক পরিবর্তন সত্ত্বেও কোম্পানির কাজের মৌলিক ধারণা বহাল রাখা। জাপানে শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার এটি আরেকটি কারণ।

দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসা চলতে থাকার আরেকটি কারণ হলো সর্বোত্তম গ্রাহক সেবা। বিশেষ করে জাপানের ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে এটি অন্যতম চাবিকাঠি, যেখানে গ্রাহকদের পরিবারের মতো আপ্যায়ন করা হয়। হারা বলেন, জাপানের ব্যবসাগুলো উচ্চপর্যায়ের গ্রাহকসেবার ওপর জোর দেয়, যা ওমোতেনাশি নামে পরিচিত। একই সঙ্গে গ্রাহকদের প্রয়োজন বুঝে নিতে চেষ্টা করে, কারণ গ্রাহকরাই জাপানের কোম্পানির মান টেকসই করার মূল চালিকাশক্তি।

কিন্তু স্টার্টআপের যুগে প্রাচীন ব্যবসার অস্তিত্ব টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। শিনিসের শক্তি হলো তার সম্পদ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সুনাম। ফলে স্টার্টআপ জাপানের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। সূত্র: বিবিসি

More News Of This Category