যে মার্কেটিং ষ্টাটেজির কারনে ফেসবুক বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি!

২০১৭ সালে ফ্সেবুকের বাৎসরিক ব্যয় ছিল বিশ বিলিয়ন ডলার বা দুই হাজার কোটি ডলার। কিন্তু আমরা তো ফ্রিতে ফেসবুক ব্যাবহার করে থাকি। তাহলে ফেসবুক কিভাবে এই বিশাল টাকা সংগ্রহ করে। আর তার আয়ের বিশাল অংশ কোথায় খরচ করে।

প্রথমত, আমরা যখন কোনো ছবি বা ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করি, তা একটি সার্ভারের মাধ্যমে আমাদের কাছে প্রদর্শিত হয়। ধরেন, আপনার মোবাইলে একটি ছবি তুলবেন, তখন যদি আপনার মোবাইলে মেমরি কার্ড বা ফোন মেমরি না থাকে তাহলে কি হবে? আপনি ছবিটি তুলতে পারবেন না বা সংরক্ষণ করতে পারবেন না।

ঠিক তেমনি আপনি ফেসবুকে আপলোড করা ছবি দেখতে হলে, সেটা একটা সার্ভারে সংরক্ষিত থাকতে হবে। আপনি যখন লগ ইন করেন তখন সেটা আপনার কাছ থেকে রিকুয়েস্ট পেয়ে, বলতে পারেন, আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে ঐ সার্ভারে মধ্যে রাখা আপনার তথ্য আপনাকে প্রদর্শন করে। এই প্রক্রিয়াটা এতই দ্রুত হয়, যা থেকে বুঝা যায় না যে এই ছবি বা ভিডিওটি হাজার মাইল দূরে কোন বড় সার্ভারে মেমরি কার্ডে রয়েছে। আপনি জানলে হয়ত আবাক হবেন, ফেসবুকের ব্যয়ের বেশির ভাগই এই সার্ভার রক্ষনাবেক্ষণ করতে গিয়ে খরচ হয় ।

কিন্তু ফেসবুক তো আর ছোট কোম্পানি না যা মোটামুটি একটা সাইজের সার্ভার হলেই হবে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত ফেসবুকের ২.৩ বিলিয়ন গ্রাহক রয়েছে। ফেইসবুকে প্রতিদিন ১০০ মিলিয়নেরও বেশি ভিডিও দেখা হয়। এখানে প্রতি মিনিটে ৩,১৭,০০০ স্ট্যাটাস আপডেট হয় । প্রতি মিনিটে ৪০০ নতুন গ্রাহক নিবন্ধিত হয়। প্রতি মিনিটে ১,৪৭,০০০ ছবি আপলোড হয় এবং ৫৪০০০ লিঙ্ক শেয়ার হয়। এই বিশাল পরিমান ডাটা সংরক্ষন করতে গিয়ে ফেবুকের প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়।

২০১৭ সালে ফেসবুকের সর্বমোট খরচ ছিল ২০,৪৫০ মিলিওন ডলার বা ২০ বিলিয়ন ডলার। এখন এই বিশাল পরিমাণ টাকা কোথা হতে আসে? আমরা জানি এটা সাধারণত বিজ্ঞাপন থেকে আসে। কিন্তু , প্রশ্ন হচ্ছে বিজ্ঞাপন মার্কেটে তো ফেইসবুক একা নয়, গুগল, ইয়াহু সহ আরও শতাধিক বিভিন্ন বড় বড় এ্যাড নেটওয়ার্ক রয়েছ। তাহলে মানুষ ফেসবুকেই কেন বেছে নেবে।

মুলত ফেইসবুক কোন কোন ক্ষত্রে আপনার সম্বন্ধে আপনার থেকে বেশি জানে। আপনার নাম। ঠিকানা, জন্ম তারিখ তো খুবই সাধারন! আপনি কি পছন্দ করেন? আপনি কোন রেস্টুরেন্টে খেয়েছেন? আপনার প্রিয় হোটেল কি? আপনার জন্মদিন কবে? আপনার বন্ধুর জন্মদিন কবে? আপনার গার্লফ্রেন্ড এর জন্মদিন কবে? ফেসবুক সবই জানে। তারা আপনার এই ডাটাগুলা বিজ্ঞাপনদাতাদের সাথে শেয়ার করা মাধমে বিজ্ঞাপনদাতাদের একটি সংকীর্ণ টার্গেট করে দেয়।

ফেসবুক মুলত দুইটি ইন্টারেস্টিং ষ্টাটেজি ব্যবহার করে থাকে। একটি হচ্ছে, গ্রাভিং স্টেটেজি এবং অপরটি কপিকাট স্টেটেজি দেখুন, ২০১৪ সালে একটি ভিসি কোম্পানি (বিনিয়োগকারী) হোয়াটস-আপ কে ১.৫ বিলিয়ন ডলার ভ্যালুয়েশন করে বিনিয়োগ করে, তার ঠিক এক মাসের মধ্যে ফেসবুক হোয়াটস-আপ কে ১৯ বিলিয়ন ডলার এর বিনিময়ে ক্রয় করে। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন!

যেখানে ১.৫ বিলিয়ন ডলার ভ্যালু মেনে বিনিয়োগ করা হয়েছিল, সেখানে ১৯ বিলিয়ন ডলার দিয়ে ফেসবুক হোয়াটস-আপ ক্রয় করে। কারন কি? কারন হোয়াটস-আপ ফেসবুকের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল হোয়াটস-আপ কিছুদিনের মধ্যে ফেসবুককে পিছনে ফেলে দিবে, ব্যবহারকারীদের জন্য হোয়াটস-আপ ফেসবুক থেকে বেশি নিরাপদ ছিল। এক জায়গায় কথা বলা ও মেসেজ ছিল দেওয়া এবং ফেসবুক থেকে দ্রুত লোড হত।

ফেসবুক কিনে তার গতি স্টপ করে দিয়েছে। ফেসবুক না কিনলে হয়ত, হোয়াটস-আপ আজকের মত থাকত না, নতুন নতুন ফিচার আসত। আপনারা হয়ত তখন হোয়াটস-আপ এর ওয়ালে – স্ট্যাটাস, ভিডিও, লিঙ্ক শেয়ারিং, নিউজ শেয়ারিং সবই দেখতে পেতেন। টুইটার হ্যাস ট্যাগ নিয়ে এসেছে, ফেসবুক চেষ্টা করেছে টুইটারকে ক্রয় করার জন্য যখন পারেনাই তখন টুইটারের হ্যাস ট্যাগ কপি করে ফেলেছে।

স্নেপচ্যাট স্টরি দিয়ে জনপ্রিয়তা পায়, ফেসবুক সেই স্টরি কপি করে নিয়ে এসেছে। ইনস্টাগ্রামকে তো কিনে হোয়াটস-আপ এর মত গতি স্টপ করে দিয়েছে। মুলত ফেসবুক চায় মানুষ যেন তার প্লাটফর্ম থেকে শিফট না হয়। অন্য সামাজিক সাইটের যে ফিচার তা মানুষের জনপ্রিয়তা পাচ্ছে সেটা তারা কপি বা ক্রয় করে, যাতে মানুষ ঐ সুবিধাটা ফেসবুকেও পেতে পারে ।

আসলে এই শতাব্দীতে শুধু গ্রেট প্রডাক্ট হলেই ব্যবসা সাফল্য পাওয়া যাবে না, সাথে গ্রেট বিজনেস ষ্টাটেজি থাকতে হবে যা আপনার ব্যবসাকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আপনাকে লিডার বানিয়ে রাখবে।

লেখক: মোহাম্মদ ইব্রাহীম, সিইও সুরমাহাট।

SHARE