1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত হার মানা যাবে না!

ছোট থেকেই স্থপতি হওয়ার ইচ্ছা ছিল হুমায়রা মোস্তফা সোহানীর। সে জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানে স্নাতক করার পাশাপাশি চালিয়ে যান স্থাপত্য (আর্কিটেকচার) ও অন্দরসজ্জা (ইন্টেরিয়র ডিজাইন) নিয়ে পড়াশোনা। আর এ অধ্যবসায়ই বদলে দেয় তাঁর জীবনের গতিপথ। মাত্র ৫০ হাজার টাকা পুঁজি ও তিনজন কর্মী নিয়ে ২০১৩ সালে হুমায়রা মোস্তফা প্রতিষ্ঠা করেন অন্দরসজ্জার প্রতিষ্ঠান সোহানী’স ইন্টেরিয়র।

মাত্র এক দশকের ব্যবধানে এটি এখন শতাধিক কর্মীর প্রতিষ্ঠান। সব ব্যয় মিটিয়ে বছরে ভালো মুনাফাও করছে হুমায়রার প্রতিষ্ঠান। যদিও এত দূর আসার পথটি মোটেও সহজ ছিল না তাঁর। ব্যবসায়ী পরিবারে বেড়ে ওঠেন হুমায়রা মোস্তফা। পারিবারিকভাবে তাঁতপণ্য ও পাটকলের ব্যবসা ছিল তাঁর বাবার। দাদার বাড়ি নরসিংদীর আড়াইহাজারে হলেও বাবার ব্যবসায়িক কর্মসূত্রে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরে।

ছোট থেকেই স্থপতি হওয়ার ইচ্ছা ছিল হুমায়রার। সব সময় তাঁর ঝোঁক ছিল নকশায়। তবে প্রথম বাধা আসে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষের পর। হুমায়রা বলেন, দূরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে চায়নি তাঁর পরিবার। এ জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে স্নাতকের জন্য ভর্তি হন। তবে নকশা কিংবা আঁকাআঁকির বিষয়ে আগ্রহ এতটুকু কমেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় স্থাপত্য ও অন্দরসজ্জা নিয়ে একটি বৃত্তির সুযোগ পান। সেই সুযোগটি নিতে আর দ্বিতীয়বার ভাবেননি। তারপর থেকেই পড়াশোনা আর কাজকে সমান তালে চালিয়ে গেছেন এই নারী উদ্যোক্তা। সেসময় অন্দরসজ্জা নিয়ে অনুশীলন করতে থাকেন হুমায়রা। পাশাপাশি নেন চিত্রশিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ। তিনি বলেন, ‘ধীরে ধীরে চিত্রশিল্পের ওপর দক্ষতা বাড়তে থাকে।

প্রশিক্ষণ থাকায় সেই সময়ে চারুকলার শিক্ষার্থী না হয়েও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগীয় শিল্পকলা একাডেমিসহ কিছু জায়গায় অনুষ্ঠিত চিত্র প্রদর্শনীতে আমি অংশ নিই। এসব অনুষ্ঠানে চিত্রকর্ম বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় হয় আমার। পরে এই টাকাকেই আমার উদ্যোক্তা জীবনের প্রথম পুঁজি হিসেবে কাজে লাগাই।’

হুমায়রা জানান, তাঁর কর্মজীবনের হাতেখড়ি হয় চট্টগ্রামের একটি স্বনামধন্য স্থাপত্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠানে (আর্কিটেকচার ফার্মে) কাজের মাধ্যমে। সেই চাকরির পাশাপাশি অস্থায়ী ভিত্তিতে পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন একটি আসবাব ব্র্যান্ডে। এসব কাজের সুবাদে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের একজন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় হয়।

২০১২ সালে সামরিক বাহিনী একটি প্রকল্পের জন্য নকশা আহ্বান করলে তাতে অংশ নেন হুমায়রা। কর্মকর্তারা তাঁর উপস্থাপন করা নকশা পছন্দ করেন। এরপরই ভাগ্যবদল শুরু। নিজের প্রথম কাজ শুরুর পর ২০১৩ সালে হুমায়রা মোস্তফা প্রতিষ্ঠা করেন সোহানী’স ইন্টেরিয়র। এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, ‘প্রায় ৪৭ লাখ টাকার সেই প্রকল্পটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। করেছিও খুব যত্ন নিয়ে। আর ফলও মিলেছে হাতে হাতে।

ওই কাজের সম্প্রসারণ ঘটে আড়াই কোটি টাকা পর্যন্ত। পরে নিয়মিত কাজের প্রস্তাব আসতে থাকে আমার প্রতিষ্ঠানের কাছে।’ হুমায়রা আরও জানান, বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪৮ জন কর্মী স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কাজ করছেন। এ ছাড়া প্রকল্পভেদে স্বল্প মেয়াদে কাজ করেন আরও শতাধিক লোক।

এখন পর্যন্ত ২০০টিরও বেশি সরকারি, বেসরকারি, বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্রকল্পের কাজ করেছেন তিনি। শুরুতে শুধু নকশার মধ্যে কাজ সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে দক্ষ কর্মী বাড়িয়ে সেসব নকশা বাস্তবায়নের কাজও শুরু করেন তিনি। তিনি জানান,‘ব্যবসায় উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে নারী হিসেবে যাত্রাটা মসৃণ ছিল না। তবে পরিবার আমাকে সম্পূর্ণ সহায়তা দিয়েছে।’

ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধিও বাড়ান হুমায়রা। আগে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান থাকলেও এখন তাঁর কোম্পানির সংখ্যা চার। সোহানী অ্যান্ড কনসোসিয়েটস (এসঅ্যান্ডসি) নামে গ্রুপ অব কোম্পানি করেছেন। কাজের পাশাপাশি নিজের দক্ষতা বাড়াতে পড়াশোনাও ধরে রেখেছেন হুমায়রা মোস্তফা। তারই অংশ হিসেবে দিল্লির সারদা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্কিটেকচার ও প্ল্যানিং থেকে নকশা বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। নিজেকে আরও ঝালিয়ে নিতে বর্তমানে এমফিল ডিগ্রির জন্য পড়াশোনা করছেন।

অনেক বাধাবিপত্তি থাকলেও লক্ষ্য অর্জনে কোনো ছাড় না দেওয়া এই উদ্যোক্তা বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তা শ্রেণিতে জাতীয় এসএমই পুরস্কার ২০২১ বিজয়ী হন। নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, ‘লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগপর্যন্ত হার মানা যাবে না। আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক সমস্যার মাঝেই এর সমাধান আছে। তাই সংকট তৈরি হলে ঘাবড়ে না গিয়ে ধৈর্য ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’ তথ্যসূত্র: প্রথমআলো।

More News Of This Category