1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

ইস্পাত শিল্পের ৯ কারখানা

বাংলাদেশে ইস্পাত খাতে যাত্রা শুরুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিএসআরএম গ্রুপের নাম। প্রায় ৬৭ বছর আগে ১৯৫২ সালে চট্টগ্রামের নাছিরাবাদ শিল্প এলাকায় আকবরআলী আফ্রিকাওয়ালার তিন ভাই ‘ইস্ট বেঙ্গল স্টিল রি–রোলিং মিলস’ গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার পরে নাম বদলে হয় বাংলাদেশ স্টিল রি–রোলিং মিলস বা বিএসআরএম। এটিই প্রথম প্রজন্মের কারখানা।

দীর্ঘ সময় ধরে শুধু একটি খাতেই ব্যবসা করছে কোম্পানিটি। বাংলাদেশে ইস্পাত খাতে নতুন নতুন উচ্চশক্তির পণ্য তৈরিতে এগিয়ে আছে তারা। ১৯৮৭ সালে ৬০ গ্রেড রড প্রথম উৎপাদন করে এই প্রতিষ্ঠান। ২০০৮ সালে বহুতল ভবন নির্মাণে জনপ্রিয় উচ্চশক্তির রড ‘এক্সট্রিম ৫০০ ডব্লিউ’ প্রথম তারা বাজারজাত শুরু করে।

বর্তমানে নাছিরাবাদ ও সীতাকুণ্ডে বিএসআরএম গ্রুপের বিলেট তৈরির চারটি কারখানা এবং রড তৈরির দুটি কারখানা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক বিলেট উৎপাদনক্ষমতা ১৮ লাখ টন। রড উৎপাদনক্ষমতা ১৬ লাখ টন। রডের বাজারে প্রায় ২৪ থেকে ২৬ শতাংশই এই কোম্পানির দখলে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের স্থাপনায় বিএসআরএম রড সরবরাহ করছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু, পদ্মা রেলওয়ে লিংক প্রকল্প, টানেল, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন প্রকল্পে রড সরবরাহের মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে বলে জানায় গ্রুপটি। প্রায় চার দশক ধরে এই কোম্পানির নেতৃত্ব দিচ্ছেন গ্রুপটির চেয়ারম্যান আলীহোসেইন আকবরআলী। তিনি কোম্পানির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আকবরআলী আফ্রিকাওয়ালার সন্তান।

টিএমটি বারে প্রথম আবুল খায়ের: প্রায় ৬৬ বছরের পুরোনো চট্টগ্রামের আবুল খায়ের গ্রুপ ফ্ল্যাট স্টিল বা ঢেউটিন উৎপাদনের মাধ্যমে ইস্পাত খাতে যুক্ত হয় ১৯৯৩ সালে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মাদামবিবিরহাটে গ্রুপটির ঢেউটিন কারখানা রয়েছে। গ্রুপটি ২০১০ সালে সীতাকুণ্ডের শীতলপুরের কারখানায় বাংলাদেশে প্রথম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসে ইস্পাত উৎপাদন শুরু করে।

বার্ষিক ১৪ লাখ টন উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন এটি দেশের সবচেয়ে বড় কারখানা। রড উৎপাদন শুরুর পর বাজার হিস্যায় খুব দ্রুত দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসে কোম্পানিটি। গ্রুপটি দেশে প্রথম টিএমটি (থার্মো মেকানিক্যালি ট্রিটেড) বার বা রড নিয়ে আসে বাজারে। কোম্পানিটি বলছে, তাদের টিএমটি বার বা রড শতভাগ পরিশোধিত।

কাঁচামাল হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপ–আমেরিকা থেকে পুরোনো লোহার টুকরা আমদানি করে। রড উৎপাদনের জন্য গত অর্থবছর গ্রুপটি প্রায় ১০ লাখ টন পুরোনো লোহার টুকরা আমদানি করেছে। প্রতিদিন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস করে সীতাকুণ্ডের শীতলপুরের কারখানায় কোম্পানিটির তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টন কাঁচামাল নেওয়া হচ্ছে। চালুর পর থেকে তাদের কারখানার উৎপাদন বাড়ছে।

কেএসআরএমের উচ্চশক্তির রড: ইস্পাত খাতে দ্বিতীয় প্রজন্মের কারখানা কেএসআরএম। ১৯৮৪ সাল থেকে ইস্পাত পণ্য রড উৎপাদন করে আসছে কোম্পানিটি। ইস্পাত খাতের বাজারে তৃতীয় অবস্থানে থাকা এই গ্রুপ উচ্চশক্তির নতুন পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছে বাজারে। মেগা প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য ‘কেএসআরএম প্রিমিয়াম ৮০ গ্রেড’ মানের রড উৎপাদন শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

শুরুতে আধা–স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে উৎপাদন শুরু হয়। পরে ইউরোপের পমিনি প্রযুক্তিতে রড উৎপাদনের সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি নিয়ে আসে গ্রুপটি। নিজেদের কারখানার রড উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে আট লাখ টনে উন্নীত করেছে। রডের মধ্যবর্তী কাঁচামাল বিলেট উৎপাদনও ছয় লাখ থেকে আট লাখ টনে উন্নীত করার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে তাদের।

পদ্মা সেতুসহ সরকারি–বেসরকারি বড় বড় প্রকল্পে রড সরবরাহ করছে এই প্রতিষ্ঠান। পুরোনো জাহাজ আমদানিতে ও সমুদ্রগামী জাহাজ পরিবহন ব্যবসায় গ্রুপটি বাংলাদেশে শীর্ষস্থানে রয়েছে। সীতাকুণ্ডের বড় কুমিরায় তাদের বিশাল কারখানা রয়েছে।

জিপিএইচের কারখানায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি: জিপিএইচ ইস্পাত ২০০৮ সালে সীতাকুণ্ডে স্বয়ংক্রিয় কারখানায় ইস্পাত উৎপাদন শুরু করে। এই কারখানায় উৎপাদিত বিলেট বাংলাদেশ থেকে প্রথম শ্রীলঙ্কায় রপ্তানি হয়েছিল। এরপর ভারতের কয়েকটি রাজ্যে কারখানাটির তৈরি রডও রপ্তানি হয়। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে এক দশকের মধ্যে এই কোম্পানি ইস্পাত খাতে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে গ্রুপটি।

প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সীতাকুণ্ডের কুমিরায় নতুন কারখানায় এ মাসে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস এবং উইনফ্লেক্স নামের পদ্ধতিতে এই কারখানায় রড উৎপাদিত হবে। খুব দ্রুত সময়ে সর্বোচ্চ পরিশোধিত রড তৈরি করা যাবে এই পদ্ধতিতে। এই কারখানার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে প্রাইমেটাল টেকনোলজিস।

তাদের ওয়েবসাইটে বলা হয়, রড তৈরিতে বিশ্বে প্রথম ‘উইনলিংক ফ্লেক্স’ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে কারখানাটিতে। কোয়ান্টাম আর্ক ফার্নেস ব্যবহারে কারখানাটি বিশ্বে তৃতীয়। রড উৎপাদন শুরু হলে ইস্পাত খাতের তৃতীয় শীর্ষ উৎপাদনক্ষমতার কারখানা হবে এটি। নতুন, পুরোনো কারখানাসহ কোম্পানির বার্ষিক রড উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে প্রায় ১০ লাখ টনে।

বায়েজিদে বেলজিয়ামের প্রযুক্তিতে উৎপাদন: ইস্পাত খাতে দ্বিতীয় প্রজন্মের কোম্পানি বায়েজিদ স্টিল। নব্বই দশকের উদ্যোক্তা আবু বকর চৌধুরীর হাত ধরে যাত্রা শুরু। চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বরে উৎপাদন শুরু হয় কারখানাটিতে। ২০০১ সালে কোম্পানিটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে রড উৎপাদন করে। রড উৎপাদনে ২০১০ সালে বেলজিয়ামের টেমকোর প্রযুক্তি ব্যবহার হয় কারখানাটিতে।

বেলজিয়ামের মান নির্ণয়কারী সংস্থা সিআরএমের সনদপ্রাপ্ত বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান এটি। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চশক্তির রড উৎপাদন করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির বিলেট তৈরির একটি এবং রড তৈরির একটি কারখানা রয়েছে। নিজেদের কারখানার চাহিদা পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ইস্পাত কারখানায় বিলেট সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। কোম্পানির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, তাদের বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ১ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন।

আরএসআরএম: দ্বিতীয় প্রজন্মের কোম্পানি হিসেবে ১৯৮৬ সালে উৎপাদন শুরু করে রতনপুর স্টিল রি–রোলিং মিলস বা আরএসআরএম। কোম্পানির ইস্পাত কারখানা চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী রোডে। প্রায় দুই লাখ টন রড উৎপাদনক্ষমতা রয়েছে কারখানাটির। হাতিরঝিল, মিরপুর–বনানী উড়ালসড়কসহ বড় প্রকল্পে রড সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সীমা স্টিল: ১৯৯১ সালে জাহাজ ভাঙা দিয়ে শুরু হয় কোম্পানির ব্যবসা। ২০০৩ সাল থেকে ইস্পাত পণ্য রড উৎপাদনে যুক্ত হয় সীমা অটোমেটিক রি–রোলিং মিলস। সীতাকুণ্ডে অবস্থিত কোম্পানির কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ৬০ হাজার টন।

বিলেটও তৈরি করে বন্দর স্টিল: বন্দর স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএসআই) কারখানাটি নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে অবস্থিত। এটি ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত। তারা বিলেট ও রড তৈরি করে। এ ছাড়া ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী তারা প্লেইন বারও তৈরি করে। বন্দর স্টিল নাম হলেও প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের গায়ে বিএসআই লেখা থাকে। এর মানে হলো, বিএসআই তাদের ব্র্যান্ড নাম।

দেশে যে কয়েকটি অটোমেটেড রি-রোলিং মিল বা ইস্পাত কারখানা আছে, তার মধ্যে বিএসআই একটি। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা ৫০ লাখ সাইক্লিক লোডের ভূমিকম্পসহনীয় ইস্পাত উৎপাদন করে। তাদের পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফ্যাটিগ পরীক্ষিত। সাশ্রয়ী মূল্যে নিজেদের বাজারের সেরা রড বলে দাবি করে বন্দর স্টিল। ঢাকার কুড়িল ফ্লাইওভার, হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বন্দর স্টিল ব্যবহৃত হয়েছে বলে ওয়েবসাইটে দাবি বিএসআইয়ের। বিএসআইয়ের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় ঢাকার বিজয়নগরে।

১৯৬৮ সাল থেকে রহিম স্টিল: রহিম গ্রুপের ব্যবসা শুরু হয় ১৯৫৮ সাল থেকে। তাদের এখন সাতটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। রহিম স্টিলের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৮ সালে। ওই বছর তারা প্রথম রি-রোলিং মিল প্রতিষ্ঠা করে। তখন ৪০ গ্রেডের রড তৈরি হতো। বাড়তি চাহিদা দেখে তারা ১৯৭৬ সালে দ্বিতীয় কারখানা করে। এরপর বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগ করেছে, নতুন ইস্পাত পণ্য এনেছে।

ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের নভেম্বরে রহিম গ্রুপ ফেরো সিলিকন পণ্য রপ্তানি শুরু করে। রহিম গ্রুপ ৫০০টিএমটি বার, হট রোলড প্লেট, বিলেট, শ্যাফট রাউন্ড বারসহ বিভিন্ন ধরনের ইস্পাত পণ্য উৎপাদন করে। দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু, মেঘনা-গোমতী সেতুসহ বিভিন্ন প্রকল্প তাদের রড দিয়ে তৈরি হয়েছে। রহিম স্টিলের দাবি, তারা দেশে প্রথম অধিক ভূমিকম্পসহনীয় রড নিয়ে এসেছে। তথ্যসূত্র: প্রথমআলো।

More News Of This Category