সবার আগে মানুষ চিনতে হবে

ক্রিস গার্ডনার একজন আমেরিকান উদ্যোক্তা৷ গৃহহীন অবস্থা থেকে নিজের চেষ্টায় গড়ে তুলেছেন তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গার্ডনার রিচ অ্যান্ড কোম্পানি। তাঁর জীবনী অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘দ্য পারস্যুট অব হ্যাপিনেস’ বিশ্বব্যাপী তুমুল প্রশংসিত হয়েছে। ২০০৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে’তে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে ক্রিস গার্ডনার এই বক্তব্য দেন।

প্রথমেই আমি তোমাদের সঙ্গে যে কথাটা ভাগাভাগি করে নিতে চাই, সেটা হলো জীবনে তোমাদের সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটার মোকাবিলা করতে হবে, সেটা হলো মানুষ। সেসব মানুষ, যাদের সঙ্গে বা যাদের জন্য তুমি কাজ করবে, তারা সব সময়ই চাইবে তোমাকে তোমার কাছ থেকে সরিয়ে রাখতে। আজকের মতো জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে তারা তোমাকে শিখিয়ে দেবে কী বলতে হবে, আর কীভাবেই বা তা বলতে হবে। সেদিন তোমাদের উচিত হবে, বিনয়ের সঙ্গে তাদের প্রত্যাখ্যান করা, এতে তোমাদের ভালো হবে।

আমি আজকের বক্তৃতার জন্য প্রথম পছন্দ ছিলাম না, হয়তো দ্বিতীয় পছন্দও না। কিন্তু সম্ভবত আমিই একমাত্র ব্যক্তি, যে তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছি। একই সঙ্গে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়ে তোমাদের কাছে আসতে পারতাম। তোমাদের আমন্ত্রণ পাওয়ামাত্রই আমি তাতে সাড়া দিয়েছিলাম।

তোমাদের অনেকে হয়তো জানো না, যখন ১৪ মাসের একটি শিশুকে ব্যাকপ্যাকে নিয়ে আমি কাজ করতাম৷ আমি ও আমার ছেলে তখন অনেক দিন এই ক্যাম্পাসে ঘুমিয়েছি। সে অবস্থান থেকে উঠে এসে আজকে যখন আমি এই মঞ্চে বক্তব্য দিচ্ছি৷ মনে হচ্ছে, আজকে যেন আমারও সমাবর্তন হচ্ছে।

আরও অনেক কথা বলার আগে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই সেসব মা-বাবা ও আত্মার আত্মীয়দের, যাঁদের জন্য আজকে তোমরা এখানে। জীবনের বড় সাফল্যগুলো কেউ একা অর্জন করতে পারে না। আজকে তোমাদের প্রত্যেকে এখানে পৌঁছাতে পেরেছ, কেননা চলার পথে তোমাকে কেউ না কেউ সাহায্য করেছিল।

আমি বিশেষ করে ধন্যবাদ জানাতে চাই আমার মতো সিঙ্গেল মা-বাবাকে। সেসব বাবাকে যাঁরা সন্তানের জন্য মা হয়েছেন এবং সেসব মাকে যাঁরা পালন করেছেন বাবার দায়িত্ব। আমাদের জীবনে সবচেয়ে ভালো কিছু হলো, আমাদের মা-বাবা। কিন্তু তাঁরা ছাড়াও তোমার সাফল্যের পেছনে নিশ্চয় অন্য কোনো ব্যক্তির অনুপ্রেরণা আছে।

কোনো একসময়ে কেউ হয়তো তোমাকে বিশ্বাস করেছিল, তোমার মধ্যে অনন্ত সম্ভাবনা দেখেছিল, তোমাকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছিল। সে ব্যক্তি তোমার ছোটবেলার শিক্ষক হতে পারেন, হাইস্কুলের কাউন্সিলর হতে পারেন অথবা হতে পারেন অতিসাধারণ একজন কর্মচারী। তুমি গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করো।

ই-মেইল কোরো না, মেসেজ পাঠিয়ো না, ফোন কোরো না—তাঁর সামনে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরো, তাঁর সঙ্গে হাসো, তাঁর হাত ধরে কাঁদো; তোমার ভালো লাগবে। আর যাঁরা বলেছিল তোমাকে দিয়ে হবে না, তুমি পারবে না; তাঁদের গিয়ে জিজ্ঞাসা করো তোমার সম্পর্কে এখন তাঁদের কী অভিমত।

আমি যখন নিজের ভাবনাগুলোকে সাজিয়ে নিচ্ছিলাম তোমাদের সামনে উপস্থাপন করার জন্য, আমি ভাবছিলাম তোমাদের জায়গায় আমি হলে কী শুনতে চাইতাম। দেশের অর্থনীতির অবস্থা, ওয়াল স্ট্রিটের হালচাল নাকি চাকরির বাজারের খবর? না, এর কোনোটিই আমি জানতে চাইতাম না।

আমি জানতে চাইতাম একজন আমেরিকান হিসেবে আমাদের স্বপ্নের কথা, পূর্বপ্রজন্ম যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এ দেশের জন্য কাজ করেছেন তার কথা। আমি জানতে চাইতাম যে আমাদের চেক ইন অ্যাকাউন্টের ব্যালান্সের চেয়ে আমাদের জীবনের ভারসাম্য অধিক জরুরি। জীবনে প্রার্থনার চেয়ে প্রশংসা অনেক বেশি দরকারি।

আমি চাইতাম যাতে সমাবর্তন বক্তা আমাদের বলেন, বস্তুর আড়ালে নিজেকে ঢেকে রাখাটা বোকামি৷ কারণ, আমাদের একসময় ফিরে আসতে হবে পরিবার ও পরিজনদের কাছে। আমি তোমাদের জানাতে চাই যে তুমি কী করো, সেটা দিয়ে নিজেকে বিচার কোরো না । নিজের মোট আর্থিক সম্পদ দিয়ে মানবিক শক্তির তুলনা টেনো না। তোমার চারপাশে তুমি অনেক জিনিস দেখতে পাবে, কিন্তু জেনে রেখো সুখী হওয়ার জন্য তোমার এর কোনোটিরই প্রয়োজন নেই।

তোমাদের জন্য এটাই আমার স্বপ্ন, যার ভিত্তি প্রোথিত আছে অতীতে, এটা বর্ণিত হচ্ছে বর্তমানে কিন্তু এর লক্ষ্য সুদূর অতীত ঘিরে। তোমরা আজকে বৃহৎ এক পৃথিবীতে পা রাখতে যাচ্ছো। তোমরা যা-ই করো না কেন, সব সময়ই সুখের সন্ধান করো। সুখী হও। সবাইকে ধন্যবাদ। তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

SHARE