1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

সবার ইনোভেটিভ হওয়ার দরকার নেই।

হতাশ লোকের সমাগম পৃথিবীব্যাপী। জ্ঞান, অর্থ, প্রতিপত্তি, মেধা ইত্যাদির বৈষম্য যত দিন যাচ্ছে তত বাড়ছে। আশ্চর্যজনকভাবে দেখা যাচ্ছে ক্ষুদ্র একটি অংশের হাতেই (৭ থেকে ৮ শতাংশ) সারা দুনিয়ার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ প্রতিপত্তি। হতাশার মূল এটিই। হতাশাগ্রস্ত মানুষকে কাজে লাগানোর জন্য, তাদের ভেতরের গুণাবলিকে অনুপ্রেরণা দিয়ে বের করে আনার জন্য একশ্রেণীর নেতৃত্ব অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, যাতে আগামী বিশ্ব সফেদ জায়গায় পৌঁছতে পারে।

কেউ কেউ তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়। সফলতাকে জয় করতে পারে। কিন্তু কয়জন তা পারে? আর বেশির ভাগ মানুষ তা পারে না কেন? উন্নত বিশ্বে মানব উন্নয়নের প্রচেষ্টার তরিকা ভিন্নতর এবং বাস্তবমুখী, তাদের প্রচেষ্টায় সফলতার হারও অনেক বেশি। তার পরেও খুব বেশি মানুষ অন্যের বক্তব্য শুনে নিজেকে হতাশার ধূম্রজাল থেকে বের করে আনতে পারে না, কারণ হতাশাগ্রস্তমাত্রই বোঝে তার যন্ত্রণাটা কী।

আর যে নেতৃত্ব এ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তারা তথাকথিত সফল। তাদের মূল অনুপ্রেরণাদায়ী কথন হচ্ছে— ‘be extra ordinary, take a hard ride and get the pick of the success.’ আমাদের দেশে হতাশাগ্রস্ত লোক গিজ গিজ করছে। সবচেয়ে দুঃখজনক, এ দেশের উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের বিরাট অংশ অন্ধ এক প্রলয়ে যেন বসবাস করছে।

এদের মানসিকভাবে শক্তিশালী করার জন্যও কাজ করে যাচ্ছেন অনেকেই। তাদের কেউ মোটিভেশনাল স্পিকার, কেউ প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদবিধারী এবং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে খুব সফল। মোটিভেশনাল স্পিকাররা অনুপ্রেরণার পাশাপাশি তাদের উপার্জনের একটা দিক হিসেবেও এটিকে বেছে নিয়েছেন। বক্তব্য দেয়ার একটি জাদুকরি শিল্প তাদের মধ্যে আছে।

জেনে অবাক হই, তাদের অনেকের ৩ ঘণ্টার আয় আমাদের দেশের অনেক প্রফেশনালের সারা মাসের আয়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু পদবিধারীদের অনেকেরই বিষয় আলাদা, কথায় তাদের যত আলোর ঝলকানি, ভেতরটা তাদের আরো বেশি অন্ধকার। আমাদেরও উপায় নেই।

চাকরি বাঁচিয়ে রাখার বা নিজেকে তথাকথিত পরিবেশে টিকিয়ে রাখার জন্য বক্তারা না যত হিপোক্রেট, আমরা তার চেয়েও বেশি হিপোক্রেসি করি। যাহোক, যে বিষয় আমার মূল কথন, তারা সবাইকে এক্সট্রা অর্ডিনারি হওয়ার জন্য যে ছবক দেন, তার বেশির ভাগ বিশ্ব বা আমাদের দেশের সফল মানুষদের উপমা দিয়ে।

নিজেদের অতীত কর্মযজ্ঞ, নিজেদের গুণগানও করেন এবং সেগুলোকে অন্যেরা সফলতার বৈশিষ্ট্য হিসেবে নিলে সফলতার পাহাড় ডিঙাবেন, এমন গ্যারান্টিও থাকে। যদিও এ সফল ব্যক্তি কখনই স্বীকার করেন না, তাদের কত ধরনের অনুকূল পরিবেশ এবং তাদের টেনে তোলার কত লোক ছিল; যা অন্যদের ভাগ্যে জোটে না। আমার প্রশ্ন, এ বিশ্বসংসারে এক্সট্রা অর্ডিনারি বলে কি কিছু আছে?

যদি থাকে, কতজন তা হতে পারে? যদি ১০ ভাগ ধরি, বাকি ৯০ জন কি অন্ধকারেই থাকবে? নাকি এক্সট্রা অর্ডিনারি হওয়ার জন্য, জীবনে সফল হওয়ার জন্য কামড়াকামড়ির এক মহাসড়কে হুড়াহুড়ি চলবে? সফলতা কী? কতজন সফল ব্যক্তি শুরু থেকেই সফল এ বিশ্বে? বিশ্বের বর্তমান ও অতীতের সফলরা অকপটে বলে গেছেন তারা অনেক ক্ষেত্রে অসফল হয়েই অন্য ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন অর্থাৎ সব সাফল্যের ভেতরে কোনো না কোনো অসফলতার বসবাস আছেই।

আমাদের অনেকে আছেন, যারা ভাবেন তারা জীবনের শুরু থেকেই সফল। তাদের আয়নার সামনে দাঁড়াতে বলেন, নিজেরাই বুঝবেন এবং বোঝেনও কত ক্ষেত্রে ব্যর্থতার গড়াগড়ি খেয়ে একসময় দাঁড়াতে পেরেছেন কোনো এক সফল পাটাতনে।

অন্য বিষয়টি হচ্ছে, এক্সট্রা অর্ডিনারিদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, তারা অসফলতাকে মানতে শেখেন না। জয়ের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাদের মধ্যে এক ধরনের অহমি মগজ তৈরি করে, কখনো এক্সটার্নালিটির কারণে অসফল হলে তাদের আর ক্রেন দিয়ে টেনেও দাঁড় করানো যায় না। সাধারণরা প্রত্যাশাচ্যুত হলেও হতাশাকে জয় করতে পারলে আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

সে কারণেই আমার শেয়ারিং হচ্ছে, আল্লাহতায়ালা জন্মের পর সব মানুষের মধ্যে অজস্র গুণাবলি দিয়ে দেন। দেশ, অর্থনীতি, কৃষ্টির পার্থক্যের কারণে অনেকেরই সেগুলো পরস্ফুিটিত হয় আবার অনেকের অধরা থেকে যায়।

আমরা যদি এক্সট্রা অর্ডিনারি হওয়ার গল্প বাদ দিয়ে প্রজন্মকে তার যে বিষয়ে ইচ্ছাশক্তি প্রবল সে কাজটিকে সাধারণভাবে শুরু করতে পারার অনুপ্রেরণা জোগাই এবং তারা অনুপ্রাণিত হয়ে এ সাধারণ কাজ বা বিষয়টিকে আস্তে আস্তে শ্রম ও প্রচেষ্টা দিয়ে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে, সাধারণ কাজটাকেই একটু আলাদা করে তুলতে পারে তাহলে একদিন তাদের অতি সাধারণ শুরুটাই অসাধারণে রূপান্তর হবে।

অতি অসাধারণভাবে কাজ শুরু করার তরিকার চেয়ে সাধারণ একটি কাজ, যা হয়তো আরো অনেকেই করছেন, তাকেই অন্যদের চেয়ে একসময় আলাদা একটা রূপ বা গড়ন দিতে পারাও সার্থকতা এবং সফলতা। ইনোভেটিভ সবার হওয়ার দরকার নেই। বাংলার বুকে নতুন সৃষ্টির অধিকারী জনবলের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন। বাকিদের বেশির ভাগই আখের ছোবলা চিবিয়ে রস বের করেই বক্তব্য দিয়ে আর ভাগ্যকে সাথী করেই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাই বলে কি আমাদের এ দেশ থেমে আছে? নিশ্চয়ই না।

সাধারণরাই অসাধারণ প্রচেষ্টায় এ দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ‘পাঠাও’ কোনো এক্সট্রা অর্ডিনারি কাজ নিয়ে যাত্রা করেনি। তারা যে কাজ শুরু করেছিল তা এরই মধ্যে আরো অনেকে করছেন। তারা সফল অতি সাধারণ কাজটি ক্রমান্বয়ে অসাধারণ এক ব্যাপ্তিতে নিয়ে এসেছেন বলেই।

আমি যখন ব্যাংকে কাজ করতাম তখন আমার এক ব্যাংকের শাখার বাইরে এক কর্নারে বসে এক মুচি জুতার কাজ করতেন। একদিন দেখি তিনি কোথাও থেকে চামড়া জোগাড় করে দুই জোড়া জুতা বানিয়েছেন। জুতাটা আমার খুব পছন্দ হওয়ায় তাকে আমার পায়ের মাপে দুই কালারের দুটি বানিয়ে দেয়ার বিশেষ অনুরোধ করেছিলাম।

আমি যেহেতু ২৯ বছর করপোরেট আঙিনায় ছিলাম, জুতার পছন্দে আমার ঘাটতি থাকার কথা নয়। আজো সেই জুতা জোড়া আমার চোখে ভাসে। এখন তার ভাগ্য যদি কখনো সুপ্রসন্ন হয়, তাকে কেউ আর মুচি বলবে না। মুচি থেকে সফল জুতা ব্যবসায়ী বলে সেলফি তুলে নানা স্ট্যাটাস দেয়ার লোকের অভাব হবে না।

লিডারশিপকে আমরা অনেক সময় বোঝার চেষ্টা করি এমন করে, যা একটি সত্তা, যা পুরো পরিধিকে নিয়ন্ত্রণে আনে সবল নেতৃত্ব দিয়ে। যেমন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, নেতা ইত্যাদি গোছের কিছু। লিডারশিপ পজিশনাল। আপনার অবস্থানে আপনার কাজটুকুর লিডারও আপনি হতে পারেন। আপনার এ নেতৃত্ব যদি ট্রান্সফর্ম করতে পারেন আরো অনেকের মাঝে, আপনি সফল।

আপনার সফলতার গীতিকাব্য কেউ বলুক আর না বলুক, আমার মূল্যায়ন হচ্ছে অতি অসাধারণ হওয়ার প্রচেষ্টার চেয়ে সাধারণটিকে অসাধারণে রূপান্তর করার চেষ্টাই বুঝি উত্তম। আসুন, আমরা সে ধরনের অনুপ্রেরণাও পরের প্রজন্মকে দেয়ার চেষ্টা করি। লেখক: সাবেক ব্যাংকার তথ্যসূত্র: বনিকবার্তা।

More News Of This Category