1. editor@islaminews.com : editorpost :
  2. jashimsarkar@gmail.com : jassemadmin :
সফলতার গল্প :

১০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে বাধ্য করা হবে!

আর মাত্র দুই মাস পরই ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে প্রথম সেমিস্টারে ক্লাস শুরুর কথা ছিল ১৯ বছর বয়সী তিয়ানু ফ্যাংয়ের। চীনের এই নাগরিক এখন নিশ্চিত নন, তিনি এখানে পড়তে পারবেন কিনা। গত সোমবার ঘোষিত এক আইন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান শুধুই অনলাইন-ভিত্তিক হয়ে গেলে ফ্যাংয়ের মতো যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া ১০ লাখেরও বেশি বিদেশী শিক্ষার্থীকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে। যারা স্বেচ্ছায় যাবে না, তাদের যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে বাধ্য করা হবে।

নভেল করোনাভাইরাস মহামারীতে যুক্তরাষ্ট্রে ২৯ লাখ মানুষ আক্রান্ত আর ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এমন পরিস্থিতির কারণে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা দিয়েছে, তারা সব কোর্স অনলাইনে নেবে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো ক্যাম্পাসে ক্লাস নেয়ার পরিকল্পনা করছে। যদিও দেশটিতে করোনাভাইরাস কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসছে না বলে তাদের খুব বেশিদূর এগোনো নিয়েও রয়েছে সংশয়। মঙ্গলবার ঘোষিত খবরে বলা হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে রেকর্ড ৬০ হাজার মানুষের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশী শিক্ষার্থীদের মধ্যে অর্ধেকই এশিয়ার। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি চীনের। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে বৈরি এ দেশের ৩ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষার্থী ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে ভর্তি হয়েছেন। এ সময় ভারত থেকে ২ লাখ ২ হাজার, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ৫২ হাজার, সৌদি আরব থেকে ৩৭ হাজার, কানাডা থেকে ২৬ হাজার, ভিয়েতনাম থেকে ২৪ হাজার, তাইওয়ান থেকে ২৩ হাজার, জাপান থেকে ১৮ হাজার, ব্রাজিল থেকে ১৬ হাজার ও মেক্সিকো থেকে ১৫ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রেই মাধ্যমিক স্কুলে পড়াশোনা করা ফ্যাং চলতি বছরের শুরুর দিকে ফিরে আসেন চীনে। এখন তিনি গ্র্যাজুয়েশনে ক্লাস শুরুর জন্য দেশ ছাড়বেন, এমনই সময় যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ঘোষণায় তৈরি হয়েছে জটিলতা। গত দুই সপ্তাহে যারা চীনে ছিল তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় তার পরিকল্পনা ছিল, চীন থেকে কম্বোডিয়া গিয়ে সেখানে দুই সপ্তাহ কাটানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লাইট ধরবেন। পরিস্থিতি এখন আরো কঠিন। স্ট্যানফোর্ডের পরিকল্পনা এখন এরকম-ক্যাম্পাসে থাকা শিক্ষার্থীরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবে, আর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরতে পারবে শরত ও গ্রীষ্মে। তার মানে, প্রথম সেমিস্টারটি দূরে থেকেই পড়তে হবে ফ্যাংকে এবং ওই সময় তাকে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যেতে হবে।

দেশে ফেরাটাও চ্যালেঞ্জিং। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট খুব কমই আছে, আর চীনে এ মুহূর্তে বাইরে থেকে আসা কাউকে থাকতে হবে দুই সপ্তাহের কোয়ারেন্টিনে। ফ্যাং এখন ভাবছেন, চীনে থেকেই পড়ে তিনি ৬০ হাজার ডলার খরচ করবেন কিনা। এটা করলেও তিনি ক্ষুতিগ্রস্ত হবেন। কেননা এতে সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়ার অভিজ্ঞতা তিনি পাবেন না, যেটা সচরাচর ক্যাম্পাসেই সম্ভব।

২৯ বছর বয়সী চীনা শিক্ষার্থী চেন না’র ওপর এ মুহূর্তে অন্তত নতুন নিয়মের প্রভাব পড়ছে না। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে দুই বছর মেয়াদী মাস্টার্স ডিগ্রীর মাঝ পথে রয়েছেন তিনি, যেখানে শরত সেমিস্টার শুরু হলে তার ক্লাস হবে অনলাইন ও অফ-লাইনে। যদিও এ বিশ্ববিদ্যালয়টির সম্ভাবনা আছে শুধুই অনলাইনে চলে যাওয়ার, যেমনটি ছিল মার্চে। এ নিয়ে চেন না, ‘আমি এ নিয়ে অবিরত ভাবছিই। নিজেকে ক্ষমতাহীন ও অসহায় লাগছে। এখানে বৈধভাবে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব আমি।’

ক্লাস শুধুই অনলাইনে চলে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় পাল্টানোও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হবে না, কেননা অন্য খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়েই ‘ইন্টেরেক্টিভ টেলিকমিনিকেশনস প্রোগ্রাম’ পাবেন তিনি। তার বদলে তিনি বরং দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন। তাও ব্যয়বহুল। নিয়ম পরিবর্তনের খবরটি যখন শুনেছেন তখন কেমন যেন নিজেকে অচেতন লেগেছে চেনের। অনেকগুলো আন্তর্জাতিক ইস্যু মিলেই আজ তার মতো শিক্ষার্থীর জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

গত মাসে যেমন নিউইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্সের খবরে বলা হয়, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার চীনা শিক্ষার্থীর ভিসা বাতিলের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এপ্রিলে রিপাবলিকান সিনেটর টম কটন পরামর্শ দেন, চীনা শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পড়ার সুযোগ দেয়া উচিত নয়। এছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে ইমিগ্রিশনেও বড় পরিবর্তন এনেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা অনেক দেশের নাগরিকদের সেখানে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।

এ নিয়ে চেন বলেন, ‘এখানে আমাদের কিছু করার নেই এবং একটি সময় এসব রাজনৈতিক খেলার কাছে আমাদের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হবে। এখানে নিজের রাজনৈতিক মর্যাদা সম্পর্কে আমি জানি, আমি একজন বিদেশী। অন্যদের সঙ্গে বৈরিতা সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা দেখি না। কিন্তু নিজেকে অসহায় লাগছে, এটা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে।’

বিপদে পড়া এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে অনেকেরই বাড়ি ফেরা হতে পারে দূরূহ কাজ। বিপার্টিজান পরিসি সেন্টারের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ক্রস-বর্ডার পলিসির পরিচালক থেরেসা কার্ডিনাল ব্রাউন বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ইস্যু হলো, এসব দেশের অনেকেই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে বলে, তারা বাড়ি ফিরতে পারবে না। কাজেই তখন তারা কী করবে? অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এটি একটি প্রহেলিকা।’

যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদেশি শিক্ষার্থী ভারতের। এই দেশেও সাধারণ ফ্লাইট বন্ধ আছেম, যদিও প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত ফ্লাইট এখনো চলছে। বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে কেবলই তৃতীয় বর্ষ সম্পন্ন করা মৈত্রী পারসনা পড়েন বুফালো ইউনিভার্সিটিতে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে বাধ্য হলে তিনি জানেন না কীভাবে ভারতে ফিরবেন। গুজরাটের ২২ বছর বয়সী এ শিক্ষার্থী জানেন না তার পরবর্তী ক্লাসগুলো অনলাইনে না অফ-লাইনে হবে। পারসনা জানান, এ মুহূর্তে ভারতে যাওয়ার কোনো ফ্লাইট নেই। তবে তিনি আশাবাদী, আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের ফেরাতে ফ্লাইটের ব্যবস্থা করবে ভারত সরকার।

সোমবারের সিদ্ধান্তটা শুধু শিক্ষার্থীদেরই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। অলাভজনক ‘ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন’ এর তথ্যমতে, ২০১৮ সালে চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে ২৫ বিলিয়ন ডলার। এখন শিক্ষার্থীরা যদি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে বাধ্য হন তবে তারা সেখান থেকে বহু দূরে অবস্থান করে নিশ্চয়ই টিউশন ফি দিতে চাইবেন না।

দিল্লিভিত্তিক কোচিং সেন্টার ও কনসালেন্টি ফার্মের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক নিকোলাস হেন্ডারসন মনে করেন, নতুন নিয়ম চালু হয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত হবে নিজেদের নীতিতে পরিবর্তন এনে হাইব্রিড মডেলে শিক্ষার্থীদের রাখতে সাহায্য করা। তার কথায়, ‘আমি মনে করি কভিড আমাদের দেখিয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করতে চায়।’ এরপরও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আসায় ভবিষ্যতে হয়তো বিদেশি শিক্ষার্থীরা এ দেশে পড়তে যেতে আগ্রহ দেখাবেন না। সূত্র: সিএনএন

More News Of This Category