1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

খেলাপী লিবার্টি গ্রুপের ৪০০ কোটির ব্যাংকঋণ!

লিবার্টি গ্রুপের কাছে আটকে আছে বিভিন্ন ব্যাংকের ৪০০ কোটি টাকা। ব্যবসার উদ্দেশ্যে ঋণ সুবিধা নিলেও দীর্ঘদিন ধরে তা পরিশোধ করছে না প্রতিষ্ঠানটি। লিবার্টি গ্রুপকে প্রদত্ত ঋণের তুলনায় জামানত কম থাকায় পাওনা অর্থ আদায়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।

ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামভিত্তিক লিবার্টি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে গার্মেন্টস খাতে ব্যবসা করছে। প্রথমদিকে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ব্যবসার ক্রমেই প্রসার ঘটিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বাড়িয়েছে সম্পত্তির পরিমাণও। কিন্তু ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা ও সম্পদ বাড়ালেও কয়েক বছর ধরে লিবার্টি গ্রুপ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছে না।

ব্যবসার অর্থ সরিয়ে সম্পদ গড়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেয়ার কৌশল নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর আগে বহুবার বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ ওঠে লিবার্টি গ্রুপের বিরুদ্ধে।

গ্রুপটি গত আড়াই বছরে কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে শুল্ক কর্মকর্তাদের অভিযোগ। এ অভিযোগে লিবার্টি গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৩৫টি মামলা করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লিবার্টি গ্রুপের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ৪০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। বন্ডের মামলা জটিলতা ও আগের মতো রাজস্ব ফাঁকি দিতে না পারায় ব্যবসা অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মোহাম্মদ ইলিয়াছ।

সূত্রমতে, লিবার্টি গ্রুপের অন্যতম পাওনাদার ওয়ান ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ওয়ান ব্যাংকের পাওনা ১০০ কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকের চান্দগাঁও শাখা থেকে লিবার্টি পলি ও লিবার্টি অ্যাকসেসরিজের নামে এ ঋণ নেয় গ্রুপটি।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখার তথ্যমতে, ২০১৪ সালে ওয়ান ব্যাংক চান্দগাঁও শাখার পথচলা শুরু। ওই বছরই বড় অংকের এ ঋণ নেয় লিবার্টি গ্রুপ। শুরুতে ব্যাংকের সঙ্গে ভালো ব্যবসা করলেও পরে ব্যাংকের টাকা পরিশোধে গড়িমসি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে লিবার্টি গ্রুপের কাছে ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকার বেশি আটকে রয়েছে, যা মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ঋণ বিতরণের সময় লিবার্টি গ্রুপের ব্যবসার পরিধি ও ব্যাংকিং লেনদেনের ভলিউম বিবেচনায় ঋণ দেয়া হয়েছে। ফলে ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নেয়া হয়নি। ঋণের মান খারাপ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার টাকা ফেরত না দিলে আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ পাওনা আদায় কঠিন হয়ে যাবে। কারণ গ্রুপটির যে পরিমাণ সম্পত্তি বন্ধক রয়েছে, তা বিক্রি করে পাওনার সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ আদায় করা সম্ভব হবে।

২০০৪ সাল থেকে লিবার্টি গ্রুপের সঙ্গে ব্যবসা করছে এবি ব্যাংক স্টেশন রোড শাখা। গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ আমদানির এলসি করতে বিভিন্ন সময়ে ঋণ সুবিধা নেয় লিবার্টি গ্রুপ। প্রথমদিকে সন্তোষজনক লেনদেন করলেও কয়েক বছর ধরে ঋণের টাকা পরিশোধ করছে না গ্রুপটি। বর্তমানে লিবার্টি গ্রুপের কাছে ব্যাংকটির ১২০ কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, লেনদেনের বিশ্বস্ততায় বড় অংকের ঋণ পেলেও প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার সে বিশ্বাস ভঙ্গ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের কোনো কিস্তি পরিশোধ করছে না লিবার্টি গ্রুপ। পাওনার বিপরীতে ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির বন্ধক রাখা সম্পত্তির পরিমাণ খুবই অল্প। তাই পাওনা আদায় নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।

এবি ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও স্টেশন রোড শাখার ব্যবস্থাপক মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, লিবার্টি গ্রুপের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। নতুন করে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ব্যবসা করছি না। তবে আগে যে ঋণ নিয়েছেন তা ফেরত দিচ্ছেন না প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার। ঋণ আদায়ে বার বার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর পরও কাজ না হলে আইনি পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

লিবার্টি গ্রুপের কাছে ৭০ কোটি টাকার বেশি আটকে আছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার। শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রুপটির ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। কয়েক বছর ধরে ব্যাংকের পাওনা দিতে বেশ গড়িমসি করছে প্রতিষ্ঠানটি। বছর খানেক আগে ব্যাংকের ঋণগুলো রিশিডিউল করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময় পরপর যে কিস্তি পরিশোধের কথা তাও দিচ্ছে না তারা। ফলে গ্রুপটির ঋণের অবস্থা আবারো খারাপ হয়ে গেছে। এভাবে চললে খুব শিগগিরই আমাদের আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

এছাড়াও লিবার্টি গ্রুপের কাছে মেঘনা ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার প্রায় ১০ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক কদমতলী শাখার প্রায় ১০ কোটি টাকা এবং এনসিসি ব্যাংক ও কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বড় অংকের পাওনা রয়েছে।

মেঘনা ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলাম বলেন, পাওনার বিপরীতে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত সম্পত্তি বন্ধক রয়েছে। তার পরও প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অবস্থা ভালো না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

লিবার্টি গ্রুপের প্রধান কার্যালয় আগ্রাবাদের আইয়ুব ট্রেড সেন্টারে। এ গ্রুপের কারখানাগুলোর মধ্যে লিবার্টি অ্যাকসেসরিজের অবস্থান নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায়। লিবার্টি পলির ঠিকানা ইপিজেড। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে লিবার্টি গ্রুপের কর্ণধার মো. ইলিয়াছের নিজ গ্রাম ফতেয়াবাদে।

লিবার্টি গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ ইলিয়াছ সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের পরিচালক। গার্মেন্টস ও শিপিং ব্যবসা খাতে গ্রুপটির ১৪টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে রাজস্ব ফাঁকির মামলা ও ব্যাংক ঋণ আটকে যাওয়ার পর বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই বন্ধ রয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের তথ্যমতে, গত আড়াই বছরে বন্ড সুবিধায় আনা ১০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে লিবার্টি গ্রুপের বিরুদ্ধে। এ সময়ে লিবার্টি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

রফতানির শর্তে আমদানি করা কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত লিবার্টি গ্রুপের মালিকানাধীন আট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ লিবার্টি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে।

এছাড়া চিটাগং কার্টন লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৬ কোটি টাকা, নিউ কার্টন প্যাকের বিরুদ্ধে ৬ কোটি, এমি অ্যাকসেসরিজ বিডি প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৩ কোটি, লিবার্টি পলি জোন বিডি লিমিটেডের বিরুদ্ধে ২ কোটি, সানরাইজ অ্যাকসেসরিজের বিরুদ্ধে আড়াই কোটি টাকা, লিবার্টি অ্যাকসেসরিজ (বিডি) লিমিটেডের বিরুদ্ধে দেড় কোটি টাকা ও ইমতি পলি অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের বিরুদ্ধে ১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকের ঋণ ফেরত না দেয়ার বিষয়ে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় লিবার্টি গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ ইলিয়াছের সঙ্গে। কিন্তু গত দুই দিনে বেশ কয়েকবার তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কল করেও তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

তথ্যসূত্র: বনিকবার্তা ডটকম।

More News Of This Category