৭ কেজি পলিথিন থেকে ৫ লিটার পেট্রোল ও আধা লিটার ডিজেল উৎপাদন সম্ভব।

মানুষের যান্ত্রিক জীবনে জায়গা দখল করেছে পলিথিন ও প্লাস্টিক। পলিথিনের স্থায়িত্ব বেশি। সহজে পচন ও পুড়িয়ে ফেলা সম্ভব হয় না। সহজেই পলিথিনে বহন করা সম্ভব। কিন্তু কাজ শেষে পলিথিনের স্থান হয় ডাস্টবিনে। আর সেই পরিত্যক্ত পলিথিনকে কাজে লাগিয়েছেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার ৫৫ বছর বয়সী ইদ্রিস আলী।

পলিথিনকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাজে লাগিয়ে তা থেকে তৈরি করেছেন জ্বালানি পদার্থ, গ্যাস ও ফটোকপি মেশিনের কালি। ইদ্রিস আলীর বাড়ি উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে। ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। অভাবের কারণে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে নেমে পড়েন জীবনযুদ্ধে। নিজের জমাজমি বলতে কিছুই নেই।

শ্বশুরের দেয়া সামান্য জমিতে মাটির বাড়ি। সংসারে পাঁচ ছেলেমেয়ে। তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা কৃষিসহ অন্যান্য কাজ করেন। স্ত্রী নুরজাহান বিবি গৃহিণী। জীবিকার তাগিদে ইদ্রিস আলী কখনও ভ্যান চালিয়েছেন আবার কখনও করেছেন কৃষিকাজ। এছাড়া ইলেকট্রনিক মিস্ত্রি, সাইকেল মেরামতেরও কাজ করেছেন।

সর্বশেষ ভটভটি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। স্বল্প শিক্ষিত এ মানুষটি তার প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছেন জ্বালানি তেল ও বিদ্যুত সংযোগ ছাড়াই ওয়েল্ডিং বা ঝালাই মেশিন। তার এ প্রতিভাকে এক নজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করছেন এলাকার সব বয়সী নারী-পুরুষ। তার এ উদ্ভাবন এলাকাজুড়ে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তার এ প্রতিভা বিকশিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন এলাকাবাসী।

পলিথিন থেকে শুধু জ্বালানি তেলই নয়, বিদ্যুত সাশ্রয়ী ওয়েল্ডিং মেশিনও (ঝালাই মেশিন) তৈরি করছেন তিনি। ১২ ভোল্টের তিনটি ড্রাইসেল (শুষ্ক) ব্যাটারি দিয়ে তৈরি এ মেশিনে প্রায় ৫০টি স্টিক ঝালাই করা সম্ভব। নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এ মেশিনটি তৈরিতে খরচ পড়েছে প্রায় ৪২ হাজার টাকা। ইদ্রিস আলী বলেন, বাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা ময়লা পলিথিন পোড়াতে গিয়ে আমি লক্ষ্য করি পোড়া পলিথিন থেকে টপটপ করে পানির মত কিছু ঝরে পড়ছে।

এ ধরনের একটি ভিডিও আমি ইউটিউব চ্যানেলে দেখেছি। বিষয়টি নিয়ে গত তিন মাস ধরে ভাবছি। এরপর সেই ভাবনাকে আমি বাস্তবে রূপদান করি। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে বাজার থেকে তেলের একটি বড় টিনের ড্রাম (ব্যারেল), একটি মাঝারি প্লাস্টিকের ড্রাম, ছোট দুটি কন্টেইনার, প্রায় ১৫ ফুট স্টিলের সরু পাইপ ও কয়েক হাত প্লাস্টিকের ফিতা কিনে কাজ শুরু করি।

প্রথম প্রথম সামান্য সমস্যা হলেও তা শুধরে নিয়ে আমি সাফল্য লাভ করেছি। তিনি বলেন, নোংরা ও পরিত্যক্ত পলিথিন ১০ টাকা কেজি করে টোকাইদের কাছ থেকে কিনে নেন। এরপর বিশেষ প্রক্রিয়ায় পলিথিনগুলো টিনের ড্রামে ভরে প্রায় আধাঘণ্টা ড্রামের নিচে খড়ি দিয়ে জ্বাল দেন।

এরপর ড্রাম থেকে নির্গত গ্যাস স্টিলের পাইপ দিয়ে এসে প্লাস্টিকের ড্রামের মধ্যে রাখা পানিতে ঠা-া হয়ে পেট্রোল ছোট কন্টেইনারে জমা হচ্ছে। ৭ কেজি পলিথিন থেকে প্রায় ৫ লিটার পেট্রোল জাতীয় পদার্থ, আধা লিটার ডিজেল বের করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।

এ পেট্রোল ইতোমধ্যে মোটরসাইকেলে জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে ৬০ টাকা লিটার হিসেবে বাজারজাত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। তবে টাকার অভাবে আধুনিক যন্ত্র কেনা সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

বিকেলে ইদ্রিস আলীর এ উদ্ভাবন দেখতে তার বাড়িতে কৌতূহলী শিশু, নারী ও পুরুষের ভিড় দেখা গেছে। অনেকে তার এ উদ্ভাবনে বিস্ময় প্রকাশ করেন। উপজেলার আইওরপাড়া গ্রামের ফারুক হোসেন জানান, পলিথিন পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে।

সেই পলিথিন পুড়িয়ে ইদ্রিস আলী জ্বালানি তেল উৎপাদন করছেন। এতে করে একদিকে যেমন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে পরিবেশ। অন্যদিকে উৎপাদিত হচ্ছে জ্বালানি তেল। তার প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিকভাবে এর উৎপাদন শুরু করা যেতে পারে। এ জন্য সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

SHARE