1. [email protected] : editorpost :
  2. [email protected] : jassemadmin :

খরচ যেন না বাড়ে, খরিদ করাতে ব্যবসার লাভ

যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৯৩ সালে আমি ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আনোয়ার গ্রুপে যোগদান করি। তবে ছোটবেলা থেকেই বাবা (আনোয়ার হোসেন) আমাকে একটু একটু করে ব্যবসা শিখিয়েছেন। বিদেশে পড়াশোনার ফাঁকে দেশে ছুটিতে এলে বাবা আমাকে কারখানায় নিয়ে যেতেন।

বাবা ঘুরতে বেশ পছন্দ করতেন। পুরো বাংলাদেশ ওনার নখদর্পণে ছিল। কোন গলিতে কার দোকান, তাঁর মোটামুটি মুখস্থ ছিল। প্রতিদিন তিনি কারখানায় যেতেন। আমি সঙ্গে থাকলে বলতেন, ‘আমি আমার লোকজনকে দেখে রাখলে তারা আমার কারখানা দেখে রাখবে। আমি তো আসব আধা ঘণ্টা-এক ঘণ্টা, বড়জোর দুই ঘণ্টা। মিল তো থাকবে ওদের হাতে। ফলে ওদের দেখে রাখবা।’

দেশের সেরা একজন শিল্পপতির ঘরে বেড়ে উঠেছি আমরা চার বোন ও তিন ভাই। তবে কোনোরকম চাকচিক্যের মধ্যে বাবা আমাদের বড় করেননি। টাকাপয়সা ওড়ানোর মতো কোনো বিষয় আমাদের মাথায় ঢুকতে দেননি। সাংঘাতিক শক্তভাবে তিনি (বাবা) আমাদের ভাইবোনকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি প্রায়ই একটা উপদেশ দিতেন, ‘পড়ালেখা করবা। আর কিছু না পারো, অন্তত মাস্টারি করে খাইতে পারবা।’

ছোটবেলায় যখন দেশে থাকতাম, তখন বিদেশ থেকে বাবার যত চিঠি আসত, আমি তা পড়ে শোনাতাম। টেলেক্স পড়ে শোনাতাম। অনেক সময় তিনি আমাকে দিয়ে চিঠি লেখাতেন। বাবা কারখানার খরচ বোঝাতেন—‘এখানে জায়গায় খরচ বেশি হচ্ছে, ওখানে জায়গায় খরচ কম হচ্ছে। সব সময় খেয়াল রাখবা, খরচ যেন না বাড়ে।

খরিদ করাতেই তোমার লাভ।’ মূলত বাবার সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে আধা ব্যবসায়ী হয়েছি আমি। ছুটিতে এসে বাবার ঋণপত্র খুলতাম। এটি আমাকে বেশ সাহায্য করেছে। ১৯৬৮ সালে বাবা টেক্সটাইল কারখানা করেন। সেখানেই প্রথম মালা শাড়ি তৈরি হয়। সেই শাড়ির জনপ্রিয়তা ছিল অন্য রকম। তখন কোনো বাড়িতে মালা শাড়ি ছাড়া বিয়েই হতো না। পত্রিকা ও টেলিভিশনে মালা শাড়ির বিজ্ঞাপন যেত।

সেই বিজ্ঞাপন করতেন সে সময়কার শীর্ষ অভিনেতারা। বাবা ব্র্যান্ডিং বিষয়টা খুবই ভালো বুঝতেন। তাঁর কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা ছিল না। বোধ হয় ক্লাস ফোর–ফাইভ পর্যন্ত পড়েছেন। দাদা মারা যাওয়ার পর অল্প বয়সে ব্যবসার হাল ধরতে হয়েছিল। তবে ব্যবসায় যেসব বিষয় তিনি চর্চা করতেন, আজকাল তেমনটাই আমরা বিভিন্ন বই পড়ে শিখি।

বাবার ব্যবসায়িক জীবনের সফলতার পেছনের রহস্য জানতে চান অনেকে। আমি মনে করি, দাদির প্রতি অসম্ভব শ্রদ্ধা বাবাকে এতদূর নিয়ে এসেছে। দাদি যেটা বলতেন, তাঁর ওপরে কোনো কথা বলতেন না। আমি ছোটবেলায় বেশ দুষ্টু ছিলাম। মারটার খাওয়ার মতো পরিস্থিতি হলেই দাদির কাছে চলে যেতাম। একবার বাবা আমাকে মার দিলেন। তখন আমার বয়স ১২-১৩ বছর। বাবার ৪০ বছর।

আমার খেয়াল আছে, আমাকে মার দেওয়ার জন্য দাদি বাবাকে কান ধরতে বললেন। দাদি তাঁকে দশবার ওঠালেন–বসালেন। ৪০ বছরের একটা মানুষ কিন্তু তাঁর ছেলের সামনে কান ধরে ওঠবস করলেন। কারণ, মায়ের আদেশ। কোনো দিনই দাদিকে সালাম না দিয়ে বাড়ি থেকে বের হতেন না।

বাবা প্রায়ই একটা উপদেশ দিতেন, ‘কালকের কাজ আজকে। আজকের কাজ এক্ষুনি। অফিস থেকে যখন যাবা, তখন টেবিল খালি করে দিয়ে যাবা। তুমি এক মানোয়ার একটা কাগজে সই না করলে হয়তো ৫০০ লোকের বেতন হবে না। নয়তো একটি মেশিন চলবে না।’ উপদেশটি মেনে চলার চেষ্টা করি। বাবা শ্রমিকদের সঙ্গে খুব কথা বলতেন। সব সময় কাজটি করতে পারি না। তবে মাঝেমধ্যে চেষ্টা করি।

রাতের বেলা আমরা তিন ভাই একসঙ্গে ফুটবল খেলি। আমাদের বাচ্চারা বিদেশে পড়ে। তারা দেশে ফিরলে আমরা একসঙ্গে ফুটবল খেলি। মাঝেমধ্যে আমি রান্না করি। সব ভাইবোন আসে। আমরা এখনো একই বাসায় থাকি। আমার ভাইয়েরা আমাকে জিজ্ঞেস না করে কোনো কাজ করে না।

কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে একসঙ্গে বসে আলোচনা করি। হোয়াটসঅ্যাপে আমাদের তিন ভাইয়ের একটি গ্রুপ আছে। নাম, ব্রাদার্স ইউনিয়ন। সেখানেই আমরা সব বিষয়ে বার্তা আদান–প্রদান করি। কারণ আমরা জানি, যোগাযোগ কমে গেলেই দূরত্ব তৈরি হয়। তথ্যসূত্র: প্রথমআলো।

More News Of This Category