1. editor@islaminews.com : editorpost :
  2. jashimsarkar@gmail.com : jassemadmin :

চিন্তা শক্তির সঠিক প্রয়োগে ব্যবসা সফল!

ব্যবসার পূর্বশর্ত হচ্ছে পুঁজি, সেই ব্যবসা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা এবং ব্যবসার ধরন। এই তিনটি বিষয় যখন এক মেরুতে এসে দাঁড়ায়, তখনই ব্যবসাটি সফলতার মুখ দেখবে বলে আমি বিশ্বাস করি। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে বাংলাদেশের মতো দেশে নতুন ব্যবসা শুরু করার পেছনে সমস্যা যেমন রয়েছে, পাশাপাশি সম্ভাবনাও রয়েছে একই মাত্রায়। যে লোকটি ব্যবসা শুরু করতে চায়, প্রথমে তার প্রয়োজন পুঁজি।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে দেখা যায়, আপনার পুঁজি নেই কিন্তু ব্যবসার ধরনটি নতুন এবং বাজারে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, তখন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে পুঁজি দিয়ে সাহায্য করার মতো। এটাকে উন্নত বিশ্বে ‘আইডিয়া ল্যাব’ বলে। বাংলাদেশে আমার জানা মতে এভাবে ব্যবসা শুরু করার নজির হাতেগোনা দু’একটি মাত্র।

প্রতিটি নতুন ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে লোকসানের বিষয়টি সবার আগে চলে আসে। মুদ্রার দু’পিঠের মতো ব্যবসার লাভ ও লোকসান রয়েছে। আর এভাবে নতুন আইডিয়ার মাধ্যমে আরেকজনের কাছ থেকে পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করারও ঝুঁকি আছে। কথা হচ্ছে, কে নেবে এই ঝুকি? কারণ দিন যত গড়াবে প্রতিযোগিতাও সেই পরিমাণে বাড়বে।

অর্থনীতি সমৃদ্ধ হতে থাকলে প্রতিযোগিতার হার বেড়ে যায়। উন্নত বিশ্বে এই ঝুঁকি নিতে অনেককে দেখা যায়। উভয় পক্ষই সমান মনোযোগী থাকে। কারণ এক দিনেই কোনো ব্যবসা দাঁড়িয়ে যায় না। এর জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় তো লাগবে। একজন উদ্যোক্তা এই ধারায় একটি ব্যবসা শুরু করতে পারেন। কিন্তু আমাদের এখানে এই চর্চা সেই পরিমাণে গড়ে ওঠেনি।

নিজস্ব পুঁজির মাধ্যমে স্বাভাবিক ব্যবসার যে প্রক্রিয়া আমাদের দেশসহ বিশ্বের নানা দেশে চালু আছে, সেভাবে যদি কেউ ব্যবসা শুরু করতে চায়, তাহলে প্রথম শর্তটি হচ্ছে সেই ব্যবসা সম্পর্কে তার পূর্ণ স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি। পাশাপাশি যিনি উদ্যোক্তা তার যদি একটি ভালো টিম থাকে, বিভিন্ন দিকে যারা তাকে সহযোগিতা করবে, তাহলে সেই ব্যবসা অল্প সময়ে সফলতার মুখ দেখবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় একটি ভালো টিম অনেকের না-ও থাকতে পারে।

সে ক্ষেত্রে ব্যবসা উদ্যোক্তারই অনেক দিক সামাল দিতে হবে। ব্যবসার প্রধান দিকগুলো এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো প্রকার লাভের কথা চিন্তা না করে ব্যবসার কথা মাথায় রেখে আপনাকে পরিশ্রম করে যেতে হবে পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত। এ সময় ছুটির দিন বলে আপনার জীবনে কিছু থাকবে না। এই বিষয়গুলো দেখেছি আমার বাবা নিতুন কুণ্ডুর কাছ থেকে।

একটি উদ্যোগ কীভাবে সফল ব্যবসায় রূপান্তরিত হয় তার প্রমাণ তিনি নিজে। গত কয়েকদিন আগে একটি সিনেমা দেখেছিলাম, ব্যবসায় পরিশ্রম এবং সাধনার বিষয়ে ওই ছবি থেকে কয়েকটি লাইন আমি স্মরণ করতে চাই। পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যবসায়ী তার তরুণ অধস্তন কর্মকর্তাকে বলছেন ‘যখন অফিসের টেবিল বিছানা হয়ে যায়, অফিস ঘর হয়ে যায় এবং শরীরের রক্ত পানি হয়ে যায়; তখন একটি ব্যবসা দাঁড়ায়।’ যতক্ষণ না এটা হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমার মনে হয় না কোনো ব্যবসা সফলতা লাভ করবে।

স্বল্প পুঁজি নিয়ে তরুণ উদ্যোক্তা যারা ব্যবসা শুরু করতে চায়, প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের তরফ থেকে সেভাবে তেমন কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায় না। বিদ্যুৎ, গ্যাস, টেলিযোগাযোগ, রাস্তা-ঘাট, অবকাঠামোসহ নানা দিক দিয়ে প্রাথমিক অবস্থায় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

কারণ আমাদের এখানে অনেক কিছুই চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল। সে ক্ষেত্রে ব্যবসার ধরনের ওপর নির্ভর করবে সমস্যা কোন দিক দিয়ে হতে পারে। ব্যবসা যদি ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদনমুখী হয় তবে সেখানে বিদ্যুৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর যদি সার্ভিস ওরিয়েন্টেড বা সেবামূলক হয় সে ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ খুব একটা প্রভাব বিস্তারক না হলেও গুরুত্বপূর্ণ দিক।

এভাবে ব্যবসার ধরন হিসাব করে সমস্যার দিকগুলো চিহ্নিত করা যায়।তরুণ উদ্যোক্তাদের পুঁজিকেন্দ্রিক যে সমস্যা রয়েছে, ব্যাংক বা বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিয়ে তা সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু ব্যাংক বা এসব বিনোয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে অনেকে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এমন নজির আছে এবং বিষয়গুলো সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা না থাকার ফলে অনেকে এদিকে এগিয়ে আসে না।

আমি যদিও এ বিষয়ে কোনো বিশেষজ্ঞ নই, তবে আমার মনে হয় তরুণ উদ্যোক্তাদের এসব প্রতিষ্ঠান খুব সহজেই সহযোগিতা করতে পারে। ব্যাংক যদি তাদের বিনোয়োগকৃত অর্থের বিনিময়ে ব্যবসার মালিকানা সমানভাবে কিংবা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ভাগ করে নেয় উদ্যোক্তার সঙ্গে তবে আমার মনে হয় বিষয়টি তখন অনেক সহজ এবং লাভবান হয়ে উঠবে দু’পক্ষের জন্য।

ব্যাংকগুলো যদিও কোনো ব্যবসার অংশীদারিত্ব গ্রহণ করতে চায় না কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত লাভ এবং লোকসানের বিষয়টি দু’পক্ষ যদি ভাগ করে নেয় তখন একটি ব্যবসা অল্পতে চালু হয়ে যেতে পারে। কারণ ব্যবসার লোকসান তো শেষ পর্যন্ত কেউই চায় না। আর ব্যাংকের মতো কোনো প্রতিষ্ঠান যদি পেছনে থাকে তাহলে সেই ব্যবসা অবশ্যই সফলতার মুখ দেখবে।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটা একটা ভালো পৃষ্ঠপোষকতা হতে পারে। অটবির শুরু এবং এর পথচলা ক্রমান্বয়ে যেভাবে বেড়েছে তার পেছনে অবশ্যই একটি নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি হলেন আমার বাবা নিতুন কুণ্ডু। অটবি আর আমার জন্ম একই বছরে। আমি দেখেছি কী করে আমার বাবা নিজ সন্তানের মতো করে পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে, পরিশ্রম ও সততার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে একটি ব্যবসাকে সফলতা দান করেছেন। আমি প্রথম দিককার উদ্যোক্তা নই।

বর্তমানে যেসব সমস্যার সম্মুখীন আমি হচ্ছি, তার চেয়ে অনেক বেশি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। আগেই একটি কথা বলেছি, ব্যবসার সফলতার পেছনে পরিশ্রম বিষয়টি আগাগোড়া জড়িয়ে আছে। আমি দেখেছি আমার বাবাকে। সকাল বেলা যখন আমি স্কুলে যেতাম তখন হয়তো তিনি ঘুমাচ্ছেন। বিকেল বেলা স্কুল থেকে ফিরে এসে রাতে যখন ঘুমাতে যেতাম তখন পর্যন্ত তিনি অফিস থেকে ফিরে আসেনি।

এভাবে দেখা গেছে সপ্তাহে এক দিনও দেখা হয়নি তার সঙ্গে আমার। ছুটির দিনগুলোতে হয়তো দেখা হতো। সেটাও আবার নিয়মিত নয়। এভাবে পরিশ্রম করলে যে কোনো ব্যবসা নিশ্চয় সফল হবে।ব্যবসায় সফলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আপনাকে আপনার ব্যবসার কিছু ‘কি লিডার’ তৈরি করতে হবে। ব্যবসার শুরুর দিকে হয়তো আপনাকেই সব দিক সামাল দিতে হবে; যে কথাটি একটু আগে বললাম। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে সেটা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না।

তাই সব দিক সামাল দেওয়ার জন্য আপনাকে বাছাই করতে হবে আপনার ব্যবসার স্বার্থেই কোন লোকগুলো আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অটবির পরিধি যখন থেকে ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল আমার বাবাও এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। এবং নব্বইয়ের দশকের দিকে তিনি এই কাজগুলো করতে লাগলেন। ‘কি লিডার’দের তিনি বাছাই করে নানা দিক গুছিয়ে আনতে লাগলেন।

আমি অটবির সঙ্গে যোগদান করি ২০০১ সালে। অর্থাৎ আমার যোগদানের প্রায় দশ বছর আগে এই প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং বর্তমানেও আমরা এভাবে কাজ করে যাচ্ছি। কোম্পানিকে যদি একটি প্রতিষ্ঠানে রূপদান করতে না পারেন তবে কখনই তা বড় কিছু হতে পারবে না। পাশাপাশি আপনার চিন্তা, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা আপনার সহকর্মীদের কাছে স্বচ্ছ হতে হবে এবং কী উপায়ে তারা আরও বেশি উৎসাহ লাভ করবে কাজের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো নিয়েও ভাবা উচিত।

ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং বড় করতে চাইলে এর কোনো বিকল্প নেই বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশে ব্যবসার সফলতা বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে অনেক বেশি। একটি নতুন ব্যবসা শুরু করার মাধ্যমে সে ব্যবসায় সফল হওয়ার মতো যথেষ্ট সুযোগও রয়েছে। কারণ বাংলাদেশ আয়তনের দিক থেকে ছোট হলেও ভারত ও চীনের মতো অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত বর্ধনশীল দুটি দেশের মাঝামাঝি অবস্থান করছে।

আমরা বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী। বর্তমানে দুটি সমুদ্রবন্দর আছে, আরও সমুদ্রবন্দর হতে পারে। প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন – গ্যাস, তেলের জোগান আছে, যদিও পরিমাণে তা অনেক কম কিন্তু অনেক দেশের তো সেটাও নেই। আপনার পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মিয়ানমার থেকেও আপনি চাইলে তাদের সম্পদ ব্যবহার করতে পারেন। আমাদের দেশ সমভূমি অঞ্চল। এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো।

চাইলে দেশের যে কোনো প্রান্তে অল্প সময়ে যেতে পারছেন। আমাদের দেশের মানুষ একই ভাষায় কথা বলছে। অনেক দেশে ভাষা একটি বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ দেশের নানা প্রান্তে নানা ভাষার প্রচলন। এ ছাড়াও আমাদের দেশ আয়তনের তুলনায় অধিক জনসংখ্যা দ্বারা সমস্যাগ্রস্ত হলেও এর কিছু সুবিধাও আছে। যেমন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই উন্নত এখানে।

এর কারণ হচ্ছে অল্প বিনিয়োগে আপনি অধিক মানুষকে সেবা দিতে পারছেন, যেটা বিশ্বের অনেক দেশে সম্ভব হচ্ছে না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমাদের রাজনৈতিক অবস্থা যদিও স্থিতিশীল নয় কিন্তু আমরা গত বিশ বছর যাবৎ গণতন্ত্রের চর্চা ধরে রেখেছি। এবং আমাদের স্বাধীনতার বয়স মাত্র চলি্লশ বছর। চলি্লশ বছর এমন কোনো বেশি সময় নয় যে আপনি আশাহত হবেন বাংলাদেশকে নিয়ে।

বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় বাংলাদেশকে আগামী দিনের একটি অন্যতম প্রধান দেশ হিসেবে ধরা হচ্ছে। এবং সামগ্রিক উন্নয়ন চিত্রে আমরা অনেক উন্নত দেশের সমান অবস্থানে আছি। এত কিছুর পর বাংলাদেশকে নিয়ে আশাবাদের অনেক কিছুই আছে। ব্যবসার দিক থেকে বলা যায়, একটি নতুন ব্যবসা শুরু করতে চাইলে যদি পূর্ণ এবং স্বচ্ছ ধারণা থাকে তবে পরিশ্রমের দ্বারা সে ব্যবসায় অবশ্যই সফলতা লাভ করা সম্ভব। তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

More News Of This Category